সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতার প্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে পেট্রোল-ডিজেলের (Fuel) দাম বাড়লেও ভারতে তুলনামূলকভাবে সীমিত বৃদ্ধি হয়েছে বলে সামনে এসেছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। ইরান (Iran) ও আমেরিকা (United States) -এর সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় বিশ্ব তেল সরবরাহে বড়সড় চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যেখানে বহু দেশ জ্বালানির দাম ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে, সেখানে ভারতে চার ধাপে মোট বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ টাকা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে ধাক্কা লাগে। মার্চের মাঝামাঝি থেকেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি বাজারে। ভারত, যার জ্বালানির প্রায় ৮৮ শতাংশই আমদানি নির্ভর, সেই দেশেও চাপ তৈরি হয়। তবু দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অয়েল মার্কেটিং সংস্থাগুলি (Oil Marketing Companies) দাম অপরিবর্তিত রাখার চেষ্টা চালায়। অবশেষে ১৫ মে প্রথম দফায় পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়। এরপর ১৯ মে, ২৩ মে এবং সর্বশেষ ২৫ মে, এই চারটি ধাপে ধাপে মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। মোট বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.৫ টাকা। তুলনায় বিশ্ববাজারে বহু দেশেই এই সময়ের মধ্যে ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানির দাম বেড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union) -এর ২৭টি দেশে বর্তমানে পেট্রোলের গড় দাম লিটার প্রতি প্রায় ১৭৯ টাকা এবং ডিজেলের গড় দাম প্রায় ১৮৪ টাকা। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলিতেও জ্বালানির দাম ১৫০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। ভারতের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান (Pakistan) ও নেপাল (Nepal) -এ পেট্রোলের দাম ইতিমধ্যেই ১৩৫ টাকা প্রতি লিটার ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের দেশ শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka), মায়ানমার (Myanmar) এবং ফিলিপিন্স (Philippines)-এও জ্বালানির দাম ১৩০ টাকার উপরে উঠে গিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের মূল্যবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। যদিও এই সিদ্ধান্তের ফলে তেল বিপণন সংস্থাগুলির উপর আর্থিক চাপ বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্বের যেসব দেশে জ্বালানির দাম ভারতের তুলনায় কম, সেগুলির বেশিরভাগই সরাসরি তেল উৎপাদনকারী দেশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রভাব সেখানে তুলনামূলকভাবে কম পড়ে। এছাড়া কিছু দেশে জ্বালানির উপর করের হারও অনেক কম, যা দাম কম রাখতে সাহায্য করে। ভারতে জ্বালানির দামের ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করে কেন্দ্র ও রাজ্যের কর কাঠামো। বিভিন্ন রাজ্যে আলাদা আলাদা সেস ও ভ্যাট (VAT) ধার্য থাকায় একই সময়ে দেশের বিভিন্ন শহরে পেট্রোল-ডিজেলের দাম ভিন্ন হতে দেখা যায়। এই করের প্রভাবেই অনেক ক্ষেত্রে খুচরো স্তরে জ্বালানির দাম বাড়ে।
হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক তেল পরিবহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানির উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে কোনও অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। তবু তুলনামূলকভাবে সীমিত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের উপর চাপ কিছুটা কম রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পরিবহণ খরচেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়ে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির এই বিষয়টি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির উপরই অনেকটা নির্ভর করছে আগামী দিনের জ্বালানি মূল্য। হরমুজ প্রণালী কবে খুলবে, সংঘাত কতদিন চলবে, এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অনিশ্চিত। তাই ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে জল্পনা অব্যাহত। ভারতে আপাতত সীমিত বৃদ্ধি হলেও পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আরও পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আপাতত বিশ্বপরিস্থিতির তুলনায় দেশের মূল্যবৃদ্ধি অনেকটাই কম, সেটাই সামনে আসছে সাম্প্রতিক তুলনামূলক চিত্রে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi cabinet meeting 2026 | মন্ত্রিসভায় মোদীর তিন দিশা: জ্বালানি সঙ্কটের সতর্কবার্তা, দ্রুত প্রশাসন ও ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ লক্ষ্য সামনে




