সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গুয়াহাটি: ‘এক দেশ, এক নিয়ম’ এই নীতিকে সামনে রেখে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code) কার্যকর করার পথে আরও এক ধাপ এগোল অসম (Assam) সরকার। সোমবার রাজ্য বিধানসভায় এই সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ পেশ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য একক আইন প্রবর্তনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে দেখা হচ্ছে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই বিষয়টি এবার বাস্তবায়নের পথে। ভারতের সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির উল্লেখ থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত আইন চালু রয়েছে। সেই প্রথা বদলে একক আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে অসম সরকার। সূত্রের খবর, মঙ্গলবারই এই বিল নিয়ে বিধানসভায় ভোটাভুটি হতে পারে। চলতি বছরের নির্বাচনী প্রচারে ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party) প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ক্ষমতায় ফিরলে এই বিধি চালু করা হবে।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) আগেই জানিয়েছেন, ‘এই আইন কার্যকর হলে বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্দিষ্ট করা হবে এবং মহিলাদের পারিবারিক সম্পত্তিতে সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে।’ পাশাপাশি বহুগামিতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথাও উঠে এসেছে এই প্রস্তাবে। অর্থাৎ, একাধিক বিবাহের প্রথা আইনের চোখে আর বৈধ থাকবে না। এই সিদ্ধান্ত সমাজের বিভিন্ন স্তরে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আওতায় লিভ-ইন সম্পর্ককেও আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে বিয়ে ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের আইনি স্বচ্ছতা বাড়বে বলে প্রশাসনিক মহলের ধারণা। আইন প্রণয়ন হলে ভবিষ্যতে পারিবারিক বিরোধ মেটাতেও একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হবে।
এই আইনের আওতা থেকে আদিবাসী সম্প্রদায়কে বাইরে রাখা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘আদিবাসীদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি-নীতি বজায় থাকবে, তাদের উপর এই বিধি প্রয়োগ করা হবে না।’ উল্লেখ্য, অসমের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২.৪৫ শতাংশ আদিবাসী। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা প্রায় ৩৪.২২ শতাংশ, ফলে এই আইনের প্রভাব রাজ্যের সামাজিক পরিসরে বড়সড় আলোচনা তৈরি করেছে। উল্লেখ্য, ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরাখণ্ড (Uttarakhand) এই আইন কার্যকর করে প্রথম রাজ্য হিসেবে নজির গড়ে। এর পর মার্চ মাসে গুজরাট (Gujarat) একই পথে হাঁটে। মধ্য প্রদেশেও (Madhya Pradesh) এই বিষয়ে খসড়া তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে গোয়াতে (Goa) বহুদিন ধরেই আলাদা সিভিল কোড চালু রয়েছে, যা অনেক সময় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় স্তরে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি সামনে রাখা হয়েছিল, তার মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি অন্যতম। এর আগে রাম মন্দির নির্মাণ এবং সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ (Article 370) বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে গোটা দেশে একযোগে এই বিধি কার্যকর করার ক্ষেত্রে এখনও নানা জটিলতা রয়েছে, কারণ এটি সংবেদনশীল সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়গুলির সঙ্গে জড়িত।
অসমে এই উদ্যোগ কার্যকর হলে রাজ্যের আইনি ও সামাজিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে নারীর সম্পত্তির অধিকার, বিবাহের নিয়ম এবং পারিবারিক সম্পর্কের আইনি স্বীকৃতির ক্ষেত্রে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। একই সঙ্গে বহুগামিতা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত সমাজে নতুন আলোচনা উস্কে দিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির একাংশ এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তাদের মতে, ধর্মীয় বৈচিত্র্যের দেশে একক আইন প্রবর্তনের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, একক আইন সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে এবং আইনি জটিলতা কমাতে সাহায্য করবে।
আইনটি কার্যকর হলে নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনের নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। বিয়ে থেকে শুরু করে উত্তরাধিকার, সব ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নানা প্রথার পরিবর্তন ঘটতে পারে। এখন নজর রয়েছে বিধানসভায় ভোটাভুটির দিকে। বিলটি পাস হলে অসম হবে দেশের অন্যতম রাজ্য যেখানে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হবে। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অন্য রাজ্যগুলিকেও একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Assam Visit 2026 | অসমে উন্নয়নের মেগা ঝড়! ৪৭,৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, উত্তর-পূর্বে রেল-সড়ক-গ্যাস অবকাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত



