সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: নতুন সরকারের ঘোষণার পর থেকেই রাজ্য জুড়ে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ (Annapurna Yojana)। বিশেষ করে ৬০ বছর পেরোনোর পর এই প্রকল্পের সুবিধা মিলবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। অবশেষে সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নবান্ন (Nabanna) পরিষ্কার করে জানাল, নির্দিষ্ট বয়সসীমা পার হলেই সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে না, বরং অন্য একটি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে স্বয়ংক্রিয় ভাবে স্থানান্তর করা হবে।
রাজ্যের বিজেপি (Bharatiya Janata Party) সরকারের এই নতুন প্রকল্প আগামী ১ জুন থেকে কার্যকর হতে চলেছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) ক্যাবিনেট বৈঠকের পর প্রকল্পের রূপরেখা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা বাড়াতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ এই ঘোষণার পরই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, ৬০ বছর পার হলে কী হবে? সরকার জানিয়েছে, ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’-এর সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে বয়স ৬০ ছুঁলেই তাঁদের নাম স্বাভাবিক নিয়মে বার্ধক্যভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ, সুবিধা বন্ধ না হয়ে অন্য প্রকল্পে রূপান্তরিত হবে। এর জন্য আলাদা করে কোনও আবেদন বা দফতরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রশাসনিক স্তর থেকেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
সরকারি সূত্রে খবর, পূর্বে যারা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ (Lakshmir Bhandar)-এর সুবিধা পেতেন, তাঁদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না। পুরনো তথ্যভান্ডার থেকেই তাঁদের ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-য় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ফলে উপভোক্তাদের কাছে পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এক আধিকারিকের কথায়, ‘পুরনো ডাটাবেস ব্যবহার করেই দ্রুত এই প্রকল্প চালু করা সম্ভব হবে।’ যাঁরা আগে কোনও আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, তাঁদের জন্যও সুযোগ রাখা হয়েছে। ১ জুন থেকে চালু হতে চলা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা পোর্টাল’ (Annapurna Yojana Portal)-এ গিয়ে নতুন আবেদন করা যাবে। সেখানে আধার-সংযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য জমা দিলেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে।
এই প্রকল্পের পাশাপাশি প্রবীণ নাগরিকদের জন্যও বড় ঘোষণা করেছে সরকার। বর্তমানে যেখানে বার্ধক্যভাতা হিসেবে মাসে ১ হাজার টাকা দেওয়া হয়, তা বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী মহিলারা ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’-এর আওতায় ৩ হাজার টাকা পাবেন, আর ৬০ বছর পেরোলেই তাঁরা মাসে ২ হাজার টাকার বার্ধক্যভাতার সুবিধা পাবেন। এই ঘোষণার পর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিমধ্যেই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। বহু মহিলা মনে করছেন, মাসিক আর্থিক সহায়তা তাঁদের সংসারের খরচ সামলাতে সাহায্য করবে। এক উপভোক্তার কথায়, ‘নিজের নামে টাকা আসা মানে আলাদা একটা ভরসা তৈরি হওয়া।’ একই সঙ্গে প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যেও বার্ধক্যভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বস্তির সুর শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু, রাজনৈতিক মহলে এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। বিরোধী শিবিরের একাংশের দাবি, এত বড় আর্থিক প্রকল্প চালু করতে গেলে রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর চাপ পড়তে পারে। অন্য দিকে শাসকদলের বক্তব্য, এই ধরনের প্রকল্প মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকেও গতিশীল করে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, সরাসরি নগদ স্থানান্তর প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ ও শহুরে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির হাতে নগদের প্রবাহ বাড়ে, যা বাজারে চাহিদা বাড়াতে সাহায্য করে। তবে একই সঙ্গে রাজ্যের আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
এই মুহূর্তে রাজ্যের প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি কার্যকর করা এবং যাতে কোনও উপভোক্তা বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করা। পোর্টাল চালু হওয়া, ডাটাবেস হালনাগাদ করা এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যাচাই, একটি বড় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে সরকারকে। নবান্নের তরফে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে ১ জুন থেকেই প্রকল্পের টাকা উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে। কিন্তু, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে গেল এই ঘোষণার পর। ৬০ পেরোলেই সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে, এই আশঙ্কা আর থাকল না। বরং নতুন কাঠামোয় এক প্রকল্প থেকে অন্য প্রকল্পে স্বয়ংক্রিয় রূপান্তরের ব্যবস্থা রাখায় উপভোক্তাদের জন্য সুবিধাই বাড়ল বলে মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Annapurna Scheme, 7th Pay Commission WB | অন্নপূর্ণা যোজনা অনুমোদন, সপ্তম বেতন কমিশন গঠন, ডিএ নিয়ে সিদ্ধান্ত হল না মন্ত্রিসভার বৈঠকে



