কৌশিক রায় ★ সাশ্রয় নিউজ, পাটনা : বিহারে মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা জোরদার করতে বড় পদক্ষেপ নিল নীতীশ কুমার সরকার। সোমবার ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার -এর মাধ্যমে আরও ২৫ লক্ষ মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার টাকা করে পাঠানো হয়েছে। ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’ (Mukhyamantri Mahila Rozgar Yojana) -এর অধীনে এই আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর। এক দিনেই প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এই খাতে। রাজ্য সরকারের দাবি, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের মহিলাদের ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে উৎসাহ দেওয়া এবং তাঁদের স্বনির্ভর করে তোলা। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে নীতীশ সরকার ঘোষণা করেছিল, প্রত্যেক পরিবারের এক জন মহিলাকে ১০ হাজার টাকা করে প্রাথমিক মূলধন দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা ছোট ব্যবসা, গৃহভিত্তিক উৎপাদন বা পরিষেবা শুরু করতে পারেন। সেই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় এ বার আরও ২৫ লক্ষ মহিলা উপকৃত হলেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছিলেন। তখনই ঘোষণা করা হয়, বিহারের মহিলাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও উদ্যোক্তা মানসিকতা বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত এক কোটি ৮১ লক্ষ মহিলা ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। নতুন কিস্তি যুক্ত হওয়ায় উপভোক্তার সংখ্যা আরও বেড়ে গেল। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘মহিলাদের হাতে নগদ সহায়তা পৌঁছে দিয়ে তাঁদের আত্মনির্ভর করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে বড় ব্যবসায় রূপান্তরের পথ খুলে দিতে এই প্রকল্প কার্যকর।’ প্রশাসনের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মহিলারা এই অর্থ ব্যবহার করছেন সেলাই, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, দুগ্ধ উৎপাদন, ক্ষুদ্র মুদি দোকান বা গৃহভিত্তিক শিল্পে। গত মাসেই নীতীশ কুমার ঘোষণা করেছিলেন, যাঁরা এই প্রাথমিক ১০ হাজার টাকা ব্যবহার করে ব্যবসা শুরু করবেন এবং ছ’মাসের মধ্যে লাভজনক কার্যক্রম দেখাতে পারবেন, তাঁদের অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই অর্থ এককালীন নয়, ধাপে ধাপে প্রদান করা হবে। প্রথম ছ’মাসের আর্থিক লেনদেন, বিক্রির পরিমাণ ও লাভের হিসাব পর্যালোচনা করে পরবর্তী সহায়তা মঞ্জুর করা হবে। ব্যবসা সফল হলে ভবিষ্যতে আরও আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনাও খোলা থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, ‘ক্ষুদ্র ঋণ বা অনুদান প্রকল্প তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সঙ্গে প্রশিক্ষণ, বিপণন সহায়তা ও আর্থিক সচেতনতা যুক্ত থাকে।’ রাজ্য সরকার জানিয়েছে, স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে, যাতে প্রকৃত উপভোক্তারাই সুবিধা পান। এই প্রকল্প ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও কম নয়। জন সুরজ দলের প্রধান প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor) অভিযোগ তুলেছেন, ‘ভোটের আগে এই ধরনের আর্থিক অনুদান মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ বিরোধীদের একাংশের দাবি, সরাসরি নগদ সহায়তার মাধ্যমে ভোটব্যাঙ্ক শক্ত করার চেষ্টা করছে সরকার। যদিও শাসকদলের বক্তব্য, এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনার অংশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ (Lakshmir Bhandar) প্রকল্প চালু হওয়ার পর মহিলাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাড়া মিলেছিল। বিহারেও সেই মডেলের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মত তাঁদের। ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ জোটের সাফল্যের পেছনে মহিলাদের সমর্থন বড় ভূমিকা নিয়েছিল বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’ সেই সমর্থন আরও দৃঢ় করতে সহায়ক হয়েছে বলেও অনেকে মনে করছেন।উল্লেখ্য যে, গ্রামীণ বিহারের এক উপভোক্তা জানান, ‘এই টাকায় আমি ছাগল পালন শুরু করেছি। যদি ব্যবসা ভাল চলে, তা হলে অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকা পেলে বড় পরিসরে কাজ বাড়াতে পারব।’ অন্য এক মহিলা বলেন, ‘প্রথমবার নিজের নামে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা এল। আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।’
অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে, ২৫ লক্ষ মহিলার হাতে ১০ হাজার টাকা করে পৌঁছনো মানে বাজারে বিপুল তরল অর্থের সঞ্চালন। ক্ষুদ্র উদ্যোগ বাড়লে স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙ্গা হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, যথাযথ মনিটরিং না হলে প্রকল্পের সুফল সীমিত হতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিহারে মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নে ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’ এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে। প্রাথমিক ১০ হাজার টাকার পর ব্যবসা দাঁড়ালে অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি প্রকল্পটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। আগামী দিনে এই উদ্যোগ কতটা স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এবং রাজ্যের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : First woman TTE Darjeeling Toy Train, Sarita Yolmo Darjeeling Himalayan Railway | ১৪৫ বছরের ইতিহাসে প্রথম মহিলা টিটিই! দার্জিলিং হিমালয়ান রেলে গোর্খা-কন্যা সরিতা ইয়োলমোর নজির, গর্বিত পাহাড়




