Sasraya News, Sunday’s Literature Special | 19th April 2026, Sunday | Issue 108 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার | সংখ্যা ১০৮

SHARE:

সম্পাদকী

ন এই এক শব্দের ভিতরেই মানুষের সমগ্র জগৎ গুটিয়ে থাকে। বাইরে যে, পৃথিবী আমরা দেখি তা আসলে ভেতরের প্রতিফলন। সেই ভেতরের আয়নাই আমাদের মানসিকতা। মানুষ তার মন দিয়েই বাঁচে। হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে, ভেঙে পড়ে, আবার নতুন করে গড়ে ওঠে। স্বপ্ন দেখে। মন সমগ্র অস্তিত্বের ভাষা শেখা। মানসিকতা তৈরি হয় সময়, অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক আর পরিবেশের অদৃশ্য বুননে। একেকজন মানুষ একেক রকমভাবে পৃথিবীকে দেখে। কেউ একই ঘটনায় আশার আলো খুঁজে পায়। কেউ বা অন্ধকারে ডুবে যায়। এই পার্থক্যের মূলেই রয়েছে মন। আমরা প্রায়ই ভাবি। পরিস্থিতি আমাদের গড়ে তোলে। অথচ সত্যি হলো, আমাদের মানসিকতাই পরিস্থিতিকে অর্থ দেয়। একটুখানি ব্যর্থতা কারও কাছে শেষ। আবার কারও কাছে শুরু। এ পার্থক্য বাইরের মনে অদৃশ্য অন্তরের। এই সময় সমাজে মানসিকতার সংকট যেন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। দ্রুততার যুগে আমরা সবকিছুই তাড়াহুড়োয় পেতে চাই সাফল্য বা স্বীকৃতি ও ভালোবাসা। কিন্তু এটাই সত্য যে মন তার নিজস্ব ছন্দে চলে। তাকে জোর করে তাড়ানো যায় না। ফলে ভেতরে জমতে থাকে অস্থিরতা উদ্বেগ একাকিত্ব। মানুষের ভিড়ের মাঝেও মানুষ একা হয়ে যায়। কারণ উল্লেখ করলে বলতে হয় যে, সে নিজের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে। নিজের মনের সঙ্গে কথা বলা। নিজেকে শোনা এই সহজ কাজগুলোই আজ সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।তবুও আশার জায়গা আছে। মনকে চেনা মানেই তাকে বদলানোর প্রথম পদক্ষেপ। যখন মানুষ নিজের ভয়, দুর্বলতা, আশা-আকাঙ্ক্ষা সবকিছুকে স্বীকার করতে শেখে তখন তার মানসিকতা ধীরে ধীরে পরিণত হয়। তখন সে বুঝতে পারে মনের শক্তি দ্বারা নমনীয় হওয়া, ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ানো।

একটি সুস্থ মানসিকতা মানুষকে সফল করে তাকে মানবিকও করে তোলে। আজ প্রয়োজন এমন এক সমাজ যেখানে মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে ঠিক শারীরিক সুস্থতার মতোই। যেখানে মানুষ বিচার ও বোঝাপড়ার আশা করতে পারবে। যেখানে দুর্বলতা সৃষ্টি হয় বরং তা থেকেই শক্তি খোঁজার পথ তৈরি হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম পৃথিবী পৃষ্ঠা বেঁচে থেকে নিজের ভেতরের অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই। মনকে জানার যাত্রা কখনো শেষ হয় না। প্রতিদিন একটু একটু করে আমরা নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করি। আর সেই আবিষ্কারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্য। মানুষ তার মনকেই গড়ে ভাঙে । আবার সেই মনই মানুষকে গড়ে তোলে। এ এক অদ্ভুত খেলা। শরীরকে শুদ্ধ করে মন। মন স্থির রেখে নিজের ওড়া কে পরিষ্কার করে শান্তির পথ পরিষ্কার করতে পারে।

 

 

🍂মহামিলনের থা

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
বিনা তপস্যায় শাস্ত্রে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। অপ্রবিষ্ট স্থূলবুদ্ধি সংসারভিলাষী বুদ্ধির বিভ্রমে এককে অন্য বুঝে অনর্থ করবে বলে শাস্ত্র প্রত্যক্ষভাবে উপদেশ করেন নাই। কিন্তু সবই বলা আছে। জনসঙ্গ ত্যাগ করে তপস্যা করলে সব স্বতঃই স্ফূর্ত্ত হতে থাকে। ধ্যান ব্যতীত কিছুতেই সত্যলাভ হয় না। নাম করতে করতে আপনা আপনি ধ্যান উপস্থিত হয়। যে আমার ধ্যান করে, আমি তার ধ্যান করি। ভারত যুদ্ধের পর হস্তিনায় একদিন আমি ব্রাহ্মমুহূর্ত্তে ধ্যান করছি দেখে রাজা যুধিষ্ঠির বললেন— “হে অমিতবিক্রম! অদ্য এ কি আশ্চর্য্য দেখছি,তুমি ধ্যানে প্রবৃত্ত হয়েছো! হে লোকাশ্রয়! ত্রিলোকের মঙ্গল তো? হে ধার্ম্মিকপ্রবর পুরুষোত্তম! তুমি ক্ষর অক্ষরকর্ত্তা এবং অকর্ত্তা। তুমি অনাদি-নিধন এবং তুমিই আদ্য-পুরুষ। আমি তোমার শরণাগত ভক্ত অবনতমস্তকে প্রণাম করছি,তুমি এ ধ্যানের প্রকৃত কারণ কি প্রকাশ করে বল।”

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

আমি ঈষৎ হাস্যসহকারে বললাম, —“মহারাজ, প্রশান্তোন্মুখ হুতাশনের ন্যায় শরশয্যাগত পুরুষ-শার্দ্দূল ভীষ্ম আমার ধ্যান করছেন, সে নিমিত্ত আমিও তদগতচিত্ত হয়েছিলাম।”
যে কেহ তোমার ধ্যান করে, তুমি তার ধ্যান কর?

হাঁ। তুই নাম কর্, আমিই তোকে ধ্যান দিব, তুই আমায় ধ্যান করে আমাতে প্রবেশ করবি।

দেখ, তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করে।

কি মূর্ত্তিতে দেখতে চাস্?

তা আমি জানি না।

তুই কি মূর্ত্তি দেখবি, তুই জানিস্ না তো কে জানবে?

তুমি।

বেশ, তুই নাম কর্; বল্— কৃষ্ণ কৃষ্ণ; বল্— ব্রজনাথ, বল্ তোর যা ভালো লাগে, সেই নামে আমায় ডাক।

জয় ব্রজনাথ জয় জয় ব্রজনাথ।
জয় ব্রজনাথ জয় জয় ব্রজনাথ॥

শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী (বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)  

 

 

🍂ফিরেড়া | দ্য
চমকে উঠি আমাকেও যেতে হবে শুনে। উপায় নেই চলেছি ভিতরের দিকে। ঘরের মধ্যে বসে আছেন তিনি। একটি মহান ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল আভায় সেই ঘর ভরে উঠেছে। শীর্ণ তপঃক্লিষ্ট রূপ, মাথায় জটা, চোখে মধুর শান্ত হাসি। প্রথম দর্শনে ভরসা পাই, মনে হয় অতি আপনজনের মধুর সান্নিধ্যে এসেছি। তবু শঙ্কর কার্তিক বাবুর আড়ালে ই থাকি। কিন্তু ঘরে ঢুকতে ই ওদের ছেড়ে ঠাকুর আমাকে মিষ্টি হাসি ভরা চোখে চেয়ে প্রশ্ন করেন — “এ্যই তুই পালালি কেন রে?”

 

নম্র নমস্কা

শ্রীশ্রী ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব
শক্তিপদ রাজগুরু

ন তারিখের হিসাব আমার ঠিক আসে না। বেশ কয়েক বৎসর আগেকার ঘটনা তখন কোলিয়ারি জাতীয়করন করা হয়নি। আসানসোলের উষাগ্রাম অঞ্চলে আমার প্রিয়জন জোড় জানকী কোলিয়ারির মালিকদের অন্যতম শঙ্করনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলোয় বেশ জমিয়ে আছি কয়েকদিন। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে বের হই দিনভর তার গাড়িতেই ঘুরি রাত্রিবাস করি আসানসোলে, লাঞ্চ খাই দুর্গাপুর ক্লাবে, চা পান করি পান্ডবেশর এরিয়ার জোড় জানকী কোলিয়ারির বাংলোয়, আড্ডা জমাই সন্ধ্যায় আসানসোল ক্লাবে, রাতে এসে ‘বডি’ রাখি উষাগ্রাম বাংলোয়।
এ হেন যাযাবর জীবনে হঠাৎ খবরটা পৌছলো ঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ এসেছেন পানাগড় পার হয়ে বনের ধারে সোমেশ্বর মঠে। খবরটা এলো বিচিত্র কারনে। শঙ্কর নাথ এর কোলিয়ারিতে একজন নতুন বাঙালি ম্যানেজার নিতে চায় শঙ্কর, তরুণ উৎসাহী ম্যানেজার ব্রহ্মপদ বাবু (ব্রহ্মপদ বক্সী, ঠাকুর এর কৃপাধন্য সন্তান) ও আসতে আগ্রহী, তিনি তখন রয়েছেন ঘুসিক দামড়া কোলিয়ারি তে। নতুন কর্মস্থলে আসার আগে তাঁর গুরুদেব সীতারামদাসজীর অনুমতি নিতে চান।

হেসে উঠলেন বাবা। সহজ সরল শিশুর সেই স্বর্গীয় হাসি। আমাকে দেখে আমার ডানহাতটা ধরে ফেলে বললেন, “চশমা খোল”। চশমাটা খুলতেই তিনি ডানহাতের অঙ্গুষ্ঠ দিয়ে দুই ভ্রূর মাঝখানে স্পর্শ করে কপালের দিকে টেনে দিলেন। একটি নিমেষের ঘনিষ্ঠ স্পর্শে সারা দেহমনে কি চাঞ্চল্য – সাড়া এনেছিল আজও অনুভব করতে পারি। একটি মূহুর্ত আমার চেতনায় আজও পরম স্মরণীয় হয়ে আছে।
আমি বিভ্রান্ত স্তব্ধ। একটি অপূর্ব শিহরণ সঞ্চারিত সারা দেহমনে। সেই অনুরনন যেন আমাকে কি নতুন চেতনায় প্রদীপ্ত করে দিল।

তিনি ই খবরটা দেন যে ঠাকুর এসেছেন কাছেই।
হঠাৎ আমার ও কৌতুহল হয় — চলো শঙ্কর, এত কাছে এসেছেন যদি দর্শন পাই তাঁর। শঙ্কর ও হঠাৎ পুন্যলোভী হয়ে সায় দেয় — ঠিক আছে চলুন। পরদিন সকালে শঙ্করের গাড়িতে সস্ত্রীক ব্রহ্মপদ বাবুর সঙ্গে আমি, শঙ্কর আর শঙ্করের কোলিয়ারির রঞ্জিত কন্ট্রাকটার কার্তিক বাবু ও চললাম সোমেশ্বর মঠের উদ্দেশ্যে।

পানাগড় থেকে সোঁয়াই ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তর। মনে পড়ে শীতের শেষে মহুয়া গাছের পাতা ঝরে ডালে এসেছে ফুলের কুঁড়ি, শালবনে হলুদ ঝরাপাতার দিন, কিছু গাছে কিশলয়ের ইশারা। প্রান্তর পার হয়ে জঙ্গল মহলের শুরু। বিস্তীর্ণ শালবন এর বাইরে গড়ে উঠেছে সোমেশ্বর মঠ। সেখানে তখন ঐ অঞ্চলের মানুষের মেলা বসে গেছে।
আকাশে বাতাসে হরিনাম সংকীর্তনের সুর। ঠাকুর এর প্রথম দর্শন মেলে দূর থেকেই। একটা খোলা গরুর গাড়িতে চেপে দীর্ঘ জটাধারী একটি হাস্যমুখর মানুষ কে নিয়ে বের হয়েছে আশ্রমিকরা তাঁকে জমি দেখাতে।
কিন্তু দেখে মনে হল আশ্রমের সম্পদ দেখাতে যাঁকে নিয়ে বের হয়েছেন ওরা — তিনি তুচ্ছ সম্পদকে মাটির ডেলার মত মনে করে ই ওদিকে নজর না দিয়ে ভক্তদের নিয়ে মাতোয়ারা।
ব্রহ্মপদবাবু ঠাকুরকে দেখে সাষ্টাঙ্গ প্রনাম করেন, আমরা তখন দর্শনার্থীদের লাইনে ভীড় জমিয়েছি, বিরাট লাইন।
এর মধ্যে ফুল মালার দোকান ও বসে গেছে। হাতে ফুলমালা নিয়ে লাইনে এগোচ্ছি। আমাদের দলনেতা কার্তিক বাবুই অভিজ্ঞ ব্যক্তি, ধম্মটম্ম করেন, তাঁর পিছনে শঙ্কর তারপর আমি, আমার পরে ও অগনিত নারী পুরুষ। শঙ্করের কোলিয়ারির কম্পাস বাবু ও দেখলাম সস্ত্রীক লাইনে আছেন। ঠাকুর বসে আছেন। ভক্তরা ফুল দিয়ে প্রনাম করে যাচ্ছে, একে ওকে দু একটা কথা ও বলছেন –হাসছেন। কার্তিক বাবু তাঁকে প্রণাম করতে ই তাঁকে বললেন — তুই?
কার্তিক বাবু জানান — ব্রাহ্মণ। — সন্ধ্যা আহ্নিক করিস? প্রশ্ন করেন ঠাকুর। কার্তিক বাবু এলেমদার লোক। জানান তিনি — হ্যাঁ করি।
এবার মোক্ষম জেরা — সন্ধ্যার মন্ত্র বল। পিছনে দাঁড়িয়ে এবার ঘাবড়ে গেছি। ওসব পাট তো কবে তুলে দিয়েছি উপনয়নের পরই। বিন্দু বিসর্গ মনে নেই। ওদিকে এলেমদার ধার্মিক কার্তিক বাবু গড় গড় করে মন্তর বলে চলেছেন। ঠাকুর ও খুব খুশি হয়ে বলেন –বাঃ বামুনের ছেলে ওসব করবি। তারপরেই শঙ্করের পালা। আশেপাশে রয়েছেন ব্রহ্মপদ বাবু ও মঠের দু চারজন মাতব্বর। তাঁরা এ ফাঁকে ঠাকুর এর সঙ্গে কোলিয়ারি মালিক শঙ্কর বাবুর পরিচয় করিয়ে ব্রহ্মপদ বাবুর ওখানে চাকরির অনুমতি করিয়ে নেবেন। তাঁরা ও তৈরি কিন্তু শঙ্কর প্রণাম করতেই ঠাকুর ধরেছেন প্রশ্ন।
তুই —
শঙ্কর জানায় –ব্রাহ্মণ। ভক্তদের ওর পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা ও করে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ঠাকুর শুধোন — পেঁয়াজ রসুন খাস? শঙ্কর ঘাড় নাড়ে — খাই। হু — সন্ধ্যা আহ্নিক করিস? ঠাকুর প্রশ্ন করেন। শঙ্কর জানায় — না।
তারপর ই ঠাকুর কড়াস্বরে বলেন — বামুনের ছেলের কোনও পাটই রাখিসনি, মরে কুকুর হতে হবে রে।
মঠের কোনও এক মাতব্বর বাবাকে কাতর কণ্ঠে বলেন। ওকে উদ্ধার করুন বাবা–।
ঠাকুরের হাতে তখনও শঙ্করের হাতখানা, এহেন ব্যাপার দেখে আমি তো আর নেই। একই পাপে পাপী। গতরাত্রে অপবিত্র মাংস তখনও উদরে, সন্ধ্যা আহ্নিকের নামগন্ধ জানি না, এরপর আমাকে ধরে ধোবি ধোলাই হবে। সুতরাং ইতি কর্তব্য স্হির করে নিয়েছি। হাতের ফুলমালা রইল তক্তাপোষে, আমি তখন লাইন ছেড়ে সটান রাইট এবাউট টার্ন — হু ক্যান রান।

একেবারে বাইরে এসে মহুয়া গাছের নীচে বসেছি, ভিতরে কি হচ্ছে জানি না। কিছুক্ষণ পর শঙ্কর ফিরে এল, মুখ চোখ তামাটে — গুম হয়ে এসে একটা শিকড়ের ওপর বসে চাপা স্বরে অনুযোগ করে, –“কি বিশ্রী কান্ড হোল বলুন তো। ছিঃ ছিঃ আমাদের সার্ভেয়ার বাবুর সামনে এত সব কি বললেন ঠাকুর। এখন ব্রহ্মপদ বাবুকে আমার ওখানে আসতে ই দেবেন না বোধ হয়”।
ভাবনার কথা। কার্তিক বাবু আশ্বাস দেন খাস বীরভূমী ভাষায় –“এত ভাবছেন কেনে, ম্যানেজারের আবার অভাব। আসানসোলের হাটে গেয়ে ম্যানেজার দেখে লিয়ে আসবো।”
হাটেবাজারে ম্যানেজার পাওয়া যায় আমার জানা ছিল না। কার্তিক বাবু জানালেন আসানসোলের অভিজাত হোটেলের বার লাউঞ্জে নাকি ম্যানেজার পাওয়া যায়। ওটাই ওঁদের আড্ডা।
বসে আছি। বোধ হয় শুন্য হাতে ফিরে যেতে হবে। মনে মনে স্মরণ করি ঠাকুরকে। তিনি এতবড় অবিচার করবেন তা মনে হয় না।
অনুমান সত্যি! চুপচাপ বসে ভাবছি দেরি হয়ে যাচ্ছে ফিরতে হবে। হঠাৎই একজন সেবক কে এইদিকে আসতে দেখে চাইলাম। তিনি বললেন — “আপনাদের বাবা ডাকছেন।” হয় তো ব্রহ্মপদ বাবুই কিছু বলেছেন। মরীয়া হয়ে শঙ্কর উঠেছে বৃক্ষমূলের আসন থেকে, সে আর কার্তিক বাবু চলেছে, সেবক আমাকে দেখিয়ে বলেন –” গেরুয়া পাঞ্জাবী পরা বাবাকেও যেতে বলেছেন।”।
চমকে উঠি আমাকেও যেতে হবে শুনে। উপায় নেই চলেছি ভিতরের দিকে। ঘরের মধ্যে বসে আছেন তিনি। একটি মহান ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল আভায় সেই ঘর ভরে উঠেছে। শীর্ণ তপঃক্লিষ্ট রূপ, মাথায় জটা, চোখে মধুর শান্ত হাসি। প্রথম দর্শনে ভরসা পাই, মনে হয় অতি আপনজনের মধুর সান্নিধ্যে এসেছি। তবু শঙ্কর কার্তিক বাবুর আড়ালে ই থাকি। কিন্তু ঘরে ঢুকতে ই ওদের ছেড়ে ঠাকুর আমাকে মিষ্টি হাসি ভরা চোখে চেয়ে প্রশ্ন করেন — “এ্যই তুই পালালি কেন রে?” জানাই যদি অভয় দেন তাহলে বলি!
— বল!
এবার স্বীকার করি সব অক্ষমতা, দীনতা, তথাকথিত সভ্য সমাজের মানুষের যন্ত্রণার কথাই বলি।
ব্রাহ্মণ কুলে জন্মেছি এতে আমার হাত ছিল না, সস্তায় মুখোরোচক খাদ্য হিসেবে পেঁয়াজ ইত্যাদি খাই, পেটের ধান্দায় সংসারের চাপে সকল থেকে রাত্রি দশটা অবধি ঘানি গাছে ঘুরি। সন্ধ্যা আহ্নিকও করি না। অভ্যাসও হারিয়ে গেছে। বকুনি খাবো এত লোকের সামনে তাই লজ্জায়, ভয়ে লাইন ছেড়ে পালিয়ে ছিলাম।
হেসে উঠলেন বাবা। সহজ সরল শিশুর সেই স্বর্গীয় হাসি। আমাকে দেখে আমার ডানহাতটা ধরে ফেলে বললেন, “চশমা খোল”। চশমাটা খুলতেই তিনি ডানহাতের অঙ্গুষ্ঠ দিয়ে দুই ভ্রূর মাঝখানে স্পর্শ করে কপালের দিকে টেনে দিলেন। একটি নিমেষের ঘনিষ্ঠ স্পর্শে সারা দেহমনে কি চাঞ্চল্য – সাড়া এনেছিল আজও অনুভব করতে পারি। একটি মূহুর্ত আমার চেতনায় আজও পরম স্মরণীয় হয়ে আছে।
আমি বিভ্রান্ত স্তব্ধ। একটি অপূর্ব শিহরণ সঞ্চারিত সারা দেহমনে। সেই অনুরনন যেন আমাকে কি নতুন চেতনায় প্রদীপ্ত করে দিল।
তারপর স্নেহভরে বলেন –বোস। ঘরে বহু মানুষ। কিন্তু আমাকেই বলে চলেছেন। ওরে সাহিত্যের পথ সত্য শিব সুন্দরের সাধনার পথ। তিনি নিজে এক মহাজীবন রসের রসিক, মহান সাহিত্য স্রষ্টা। তাঁর চেতনায় প্রতিভাত নব জীবন বোধ ভারতের সনাতন ধর্ম, বেদ উপনিষদ – মহা জ্ঞানী সিদ্ধপুরুষ। তাঁর দৃষ্টিতে আলোকিত জীবন বোধের একটি অমৃত অধ্যায়ই তিনি যেন বর্ণনা করে গেলেন। শোনালেন নন্দনতত্বের অমেয়বাণী।
সব বোঝার অনুভব করার মত শক্তি আমার নেই, তবু যা বুঝেছিলাম তা দৈববাণীর মতই মনে হয়েছিল।
প্রায় আধ ঘণ্টা কথা বলার পর বললেন শঙ্কর কে দেখিয়ে — “তোরা ব্রহ্মপদকে নিয়ে যেতে চাস?
শঙ্কর এতক্ষণে ভরসা করে এগিয়ে আসে– “হ্যাঁ বাবা “। ঠাকুর বললেন — ভালোবাসতে পারবি তো? আদরে রাখতে পারবি তো? যা নিয়ে যা।
কোলিয়ারিতে ব্রহ্মপদ বাবুর আসা মঞ্জুর হয়ে গেল। আমাদের কিছু বলতে হয়নি। বাবা অন্তর্যামী, তিনিই বিধান দিয়ে দিলেন। হাসি মুখে বলেন — “প্রসাদ নিয়ে যাবি।” প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম। মনে তখন নিবিড় এক প্রশান্তি। মনে হল যা পেলাম তার তুলনা নেই। কি এক অপূর্ব আনন্দে সারা মন তৃপ্ত। ফিরে এলাম সকলে দলবেঁধে পূণ্য দর্শনের পর। 🍂

তথ্যসূত্র : এখন যেরকম (নিরপেক্ষ সংবাদ সংস্কৃতি পাক্ষিক, বড়দিন সংখ্যা), প্রচ্ছদ নিবন্ধ : “ওঙ্কারনাথ প্রসঙ্গে”, প্রধান সম্পাদিকা — শীলা সেন। প্রকাশ কাল : ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৮২।

 

 

🍂ধারাবাহিক পন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

২৬.

অক্ষরের আড়ালে সুর

হোস্টেল থেকে বাড়ি ফেরার অভিজ্ঞতা অনীকের কাছে কখনওই নিছক স্থানান্তর ছিল না; বরং একধরনের অন্তর্গত সরে আসা—নিজের এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে ধীরে, প্রায় অচেতনভাবে চলে যাওয়া। ট্রেনের কামরায় বসে থাকতে থাকতে সে বারবার টের পায়, মানুষ যে-দূরত্ব অতিক্রম করে তা কেবল মানচিত্রে মাপা যায় না; তার ভেতরেও একটি অদৃশ্য দূরত্ব কমে বা বাড়ে, যার হিসাব রাখা যায় না কোনও ক্যালেন্ডার বা ঘড়িতে।
সেদিন বিকেলের আলো জানালার কাঁচে এসে লেগে ছিল এমনভাবে, যেন আলো নিজেই ক্লান্ত। দূরের মাঠগুলো ক্রমশ ফাঁকা হয়ে আসছিল, মাঝেমধ্যে ছোট স্টেশন, যেখানে নামা-ওঠার তাড়াহুড়োর মধ্যেও কিছু মানুষ স্থির, যেন তারা কোথাও যায় না, বরং একই জায়গায় থেকে যায় বছরের পর বছর। হকারের গলা ভেসে আসছিল, “চা… কফি…” সেই চেনা সুর, যা ভ্রমণের অংশ হয়ে গিয়েছে বহুদিন। পাশের সিটে বসে থাকা লোকটির ফোনালাপ, অন্য প্রান্তের কারও হাসি, কোথাও শিশুর কান্না সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সঙ্গীত তৈরি হচ্ছিল, যার মধ্যে কোনও কেন্দ্র নেই, তবু একটি ছন্দ আছে।

কণ্ঠে কোনও অতিরঞ্জন নেই, একধরনের সংযত প্রবাহ। সোমদত্তা শুনছিলেন, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন অন্য কোথাও, অতীতের কোনও স্তরে। যেন এই সুর তার ভেতরে পুরনো কোনও দরজা খুলে দিচ্ছে।
গান শেষ হলে মা বললেন,
—এই লাইনটা আবার গা।
অনীক গাইল। লক্ষ্য করল, এই নির্দিষ্ট লাইনে মায়ের মুখের রেখা বদলে যায়। সেখানে এমন এক আবেগের ছায়া, যা সে পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
রাত গভীর হলে জল খেতে উঠে সে দেখল, ঘরের আলো জ্বলছে।

অনীক জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি বাইরে থেমে থাকছিল না। সে অনুভব করছিল, তার ভেতরে কিছু বদলেছে। কলেজের দিনগুলো, গান, অচেনা মানুষের প্রশংসা, ভিডিওর ছড়িয়ে পড়া এসবই যেন জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহের অংশ, অথচ তাদের মধ্যে দিয়ে অজান্তেই তৈরি হয়েছে নতুন এক অভ্যন্তরীণ পরিসর। আগে গান ছিল ব্যক্তিগত, এখন তা প্রকাশ্য; আগে অনুভূতি ছিল নিজের। এখন তা শেয়ারযোগ্য। এই পরিবর্তন তাকে পুরোপুরি স্বস্তি দেয় না, আবার অস্বস্তিও তৈরি করে না; বরং একধরনের নিরপেক্ষতা তৈরি করে, যা তাকে নিজের কাছেই কিছুটা অচেনা করে তোলে।
এই অচেনা হওয়ার মধ্যেই হঠাৎ একটি নাম ভেসে ওঠে, তিতাস।
নামটি উচ্চারণ না করলেও তার ভেতরে তার প্রতিধ্বনি তৈরি হয়। সম্পর্কটির কোনএ নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, বন্ধুত্ব? আকর্ষণ? নাকি তার থেকেও সূক্ষ্ম কিছু? তবু এটুকু নিশ্চিত, এই উপস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার নয়। এই প্রথম সে অনুভব করে, বাড়ি ফেরার আনন্দের পাশাপাশি একটি অস্বস্তিও কাজ করছে। কারণ এবার তার সঙ্গে একটি অনুচ্চারিত সত্যও ফিরছে।
স্টেশনে নামার সময় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। প্ল্যাটফর্মের আলো জ্বলছে, মানুষের ভিড় তীব্র, শব্দ ঘন। তবু এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই একটি পরিচিতির বোধ আছে, এই শহর তার নিজের, অন্তত স্মৃতির দিক থেকে। প্রতিটি মোড়, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি গন্ধ তার ভেতরে জমে আছে বহুদিন ধরে।
অটোয় বসে বাড়ির দিকে যেতে যেতে সে হঠাৎ মায়ের কথা ভাবল, সোমদত্তা। মা কেবল একটি সম্পর্ক নয়, একধরনের নীরব উপস্থিতি। তার ভেতরে এমন একটি স্তর আছে, যা সবসময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু অনীকের অনুভূতিতে স্থায়ীভাবে থেকে যায়। সে জানে, মায়ের জীবন কেবল তার জানা অংশ দিয়ে গঠিত নয়; সেখানে আরও কিছু আছে, যা অপ্রকাশিত।
দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে পায়ের শব্দ। দরজা খুলে মা দাঁড়ালেন।
এক মুহূর্ত, সময় স্থির।
তারপর সেই পরিচিত, সহজ, অথচ গভীর উচ্চারণ,
—এসেছিস!
এই দুটি শব্দের ভেতরে যে অনুভূতি থাকে, তা বিশ্লেষণযোগ্য নয়। অনীক ব্যাগ নামানোর আগেই মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। এই আলিঙ্গন কোনও নাটকীয়তার দাবি করে না; তবু এর মধ্যে এমন এক আশ্রয় আছে, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
—এত শুকিয়ে গেছিস কেন?
—খাবার ভাল না।
—মিথ্যে কথা। ঠিকমতো খাস না।
এই কথোপকথন বহুবারের পুনরাবৃত্তি, তবু প্রতিবারই নতুন, কারণ এর ভেতরে থাকে অদৃশ্য যত্নের পুনর্নবীকরণ।
ঘরে ঢুকতেই সেই অপরিবর্তিত বিন্যাস, বইয়ের তাক, টেবিলের উপর ছড়ানো খাতা, জানালার পাশে রাখা চশমা। যেন তার অনুপস্থিতি ঘরের সময়কে থামিয়ে রেখেছে।
রাতের খাবারের আগে কথাবার্তা ধীরে ধীরে গভীর হল।
—কলেজ কেমন?
— চলছে।
—বন্ধু-বান্ধব?
—আছে।
—গান?
এই প্রশ্নে অনীক অল্প হাসল।
— গান তো আছেই।
মায়ের চোখে হালকা আলো ফুটল।
—ভিডিও দেখেছি।
অনীক বিস্মিত।
— তুমি দেখেছ?
— তুমি দেখেছ?
—আমার ছাত্রীরা দেখিয়েছে।
কণ্ঠে সংযত গর্ব, যা প্রকাশ্যে নয়, তবু স্পষ্ট।
—তোর গলায় বদল এসেছে।
—কেমন?
—আগে সুর ছিল। এখন অভিজ্ঞতা ঢুকেছে।
এই বাক্য অনীককে থামিয়ে দিল। কারণ এটি শুধু প্রশংসা নয়, একটি গভীর পর্যবেক্ষণ। সে বুঝল, মা তাকে কেবল শুনছেন না, পড়ছেন।
গিটার হাতে নিয়ে বসতেই মা সামনে এসে চুপচাপ বসলেন। ঘরের আলো নরম, বাইরের রাত ধীরে ঘনীভূত।
অনীক গাইতে শুরু করল।
তার কণ্ঠে কোনও অতিরঞ্জন নেই, একধরনের সংযত প্রবাহ। সোমদত্তা শুনছিলেন, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন অন্য কোথাও, অতীতের কোনও স্তরে। যেন এই সুর তার ভেতরে পুরনো কোনও দরজা খুলে দিচ্ছে।
গান শেষ হলে মা বললেন,
—এই লাইনটা আবার গা।
অনীক গাইল। লক্ষ্য করল, এই নির্দিষ্ট লাইনে মায়ের মুখের রেখা বদলে যায়। সেখানে এমন এক আবেগের ছায়া, যা সে পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
রাত গভীর হলে জল খেতে উঠে সে দেখল, ঘরের আলো জ্বলছে।
মা জানালার পাশে বসে আছেন।
হাতে একটি চিঠি।
এই দৃশ্য এতটাই স্থির যে মুহূর্তটি প্রায় অবাস্তব মনে হয়। কাগজটি পুরনো, হাতের লেখা। মায়ের আঙুলে সামান্য কাঁপন।
অনীক দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকে। অক্ষরগুলো পড়তে পারে না। কিন্তু মায়ের চোখের জল স্পষ্ট। এই কান্না দুঃখের নয়। আনন্দেরও নয়। একধরনের অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি, আনন্দমাখা বিষাদ।
মা ধীরে চিঠিটি ভাঁজ করেন, চোখ মুছেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
অনীক সরে আসে।
তার ভেতরে প্রশ্ন জমে ওঠে, মায়ের জীবনে এমন কী আছে যা সে জানে না? এই চিঠি কি অতীতের কোনো অসমাপ্ত সম্পর্ক? কোনও স্মৃতি, যা মুছে যায়নি?
বিছানায় শুয়ে তিতাসের কথা মনে পড়তেই তার দ্বিধা তীব্র হয়। সে এখনও বলেনি। কীভাবে বলবে? কোন ভাষায় বলবে? মা কীভাবে গ্রহণ করবেন?
এই প্রশ্নগুলোর ভেতরেই হঠাৎ সে বুঝতে পারে, বিলম্ব জটিলতা তৈরি করে।
পরদিন দুপুরে রান্নাঘরের শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে ভাষা খুঁজছিল। কিন্তু প্রস্তুত বাক্যগুলো মাথা থেকে উধাও হয়ে গেল। হঠাৎ, অপ্রস্তুতভাবে, নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে ফেলল, ‘মা, তোমার একজন ছাত্রীকে আমি ভালবেসে ফেলেছি।’
শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সময় যেন স্থির হয়ে গেল। রান্নাঘরের শব্দ থেমে গেল। মা ধীরে তাকালেন। চোখে বিস্ময় নয়, গভীর অনুসন্ধান।
–আ আমার ছাত্রী?
এই তিনটি শব্দের মধ্যে ছিল না কোনও সরাসরি প্রতিক্রিয়া, ছিল একধরনের মাপজোখ। অনীকের বুক ধুকপুক করছে। কিন্তু এখন আর ফেরার পথ নেই। একটি স্বীকারোক্তি ঘরের ভেতর ঝুলে রইল অদৃশ্য, অথচ ভারী, যার প্রতিক্রিয়া এখনও উচ্চারিত হয়নি।🍁 (ক্রমশ:)

 

 

 

🍂অনুবাদ | কবিতা

 

অপেক্ষা

ইয়াং চি-চু

চিরকাল অপেক্ষা
একটি বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা
একটুখানি সন্ধ্যার আলো
ভোরের সূর্যোদয়ের জন্য অপেক্ষা
রাত নামার পর পোকামাকড়ের ডাকের জন্য অপেক্ষা

আমি সময়ের স্বাধীনতার মধ্যে নিছক খেলায় মেতে থাকি
কল্পনা করি—-
স্বাধীনতা হারিয়ে গেলে
সময় কী তখনও আমার পাশে থেকে
খেলবে?

অপেক্ষা
কোনও শেষ নেই, তবু আবার ছুটে চলা
তুমি একসময় মন দিয়ে পড়েছিলে যে তত্ত্ব
সেগুলো উল্টে-পাল্টে দেখা

স্বাধীনতা একটি দূরের শব্দ
আমাদের সময়ে
সহজেই মোড়ক খুলে, বড় কামড়ে রুটি খাওয়ার মতো
এতটাই সহজ

ভাষান্তরঃ সংবেদন শীল

 

 

🍂ধারাবাহিক পন্যাস |
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী

১৩.

সুনয়না দি

সারারাত তিথি চোখের পাতা এক করতে পারেনি। শ্বেতাম্বরীর যে কী হয়েছে, কে জানে?
বমি করল কয়েকবার আর কেমন যেন ওর শরীরের ভেতরে একটা অস্বস্তি হচ্ছে বুঝতে পারছে তিথি। একটু শরীর খারাপ হলে তিথিকে ওর পাশ থেকে নড়লে চলবে না একবার চোখ খুলবে আর একবারটি থেকে থেকে দেখবে। তিথি কে দেখে আবার মাথাটা নামিয়ে দেবে। একেবারে বাচ্চা, ঠিক বুবুনও এরকম করে।

তিথি বুঝতে পারছিল ব্যাপারটা নিয়ে কিছু একটা ঘোট বাঁধানোর চেষ্টা করছে!
জানি না, অনেকের দু’টো নাম থাকতেই পারে তবে ও তো বলেছে আমাদের কাছে সুনয়না আমার শাশুড়ি আবার তাকে সু বলে ডাকে। হয়ে গেল আর একটা নাম।

সাড়ে তিনটের সময় একবার চোখের পাতাটা এক হয়েছিল কিন্তু সাড়ে চারটেয় অ্যালার্ম বাজতে ঘুম থেকে উঠে পড়ল। শ্বেতাম্বরীকে দেখল, না ঠিক শুয়ে আছে তবে একবার চোখ খুলে দেখে নিয়েছে। তিথি ওয়াশরুমে গেল তারপর ফ্রেশ হয়ে রাধা গোবিন্দের ভোগ চাপাল। ব্রাহ্ম মুহূর্তে এবার পুজো করল। ব্রাহ্ম মুহূর্তে পুজো করা নাকি খুব ভাল। পুজো করে কিছু চাল, গম নিয়ে ছাদে গেল, ছাদে গিয়ে সেগুলো ছিটিয়ে দিল পায়রাদের জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই পায়রাগুলো মিষ্টি সুর তুলে বক বককম বকবকম আওয়াজ করে খেতে শুরু করল। অনেকক্ষণ ওদের খাওয়ার দৃশ্য দেখল অন্যকে খাইয়ে কি যে পরিতৃপ্তি তিথি সেটা ভাল বুঝতে পারল। ছাদের থেকে নদী দেখা যায়। নদীর দিকে তাকিয়ে নদীর পাড়ের গ্রামটাকে যেন মনে হল আজকে অনেক বেশি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ঠিক আস্তে আস্তে কমতে শুরু করেছে শীতের কুয়াশা আর গ্রামগুলোকে দেখল তার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখেনি। চাদর সরিয়ে সোনালী সূর্যমুখী রোদ্দুর তার আলো বিলিয়েছে। চারিদিকে তার ছটায় চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পৃথিবীর চারপাশটা একটু দেখে নিল ভাল করে। পাশের বাড়ির ছাদে সুরঞ্জনা পায়চারি করছে। হঠাৎ চোখাচোখি হতে বলল,
—আজকে খুব তাড়াতাড়ি ছাদে দিদি।
একটু হেসে তিথি বলল,
—হ্যাঁ গো।
সুরঞ্জনা একটু হাসল,
—তা তুমি কি মর্নিং ওয়াকটা ছাদেই সেরে নাও।
—ওই আর কি মনের সান্তনা।
—তা বেশ বেশ বেশ।
—কি আর করব!
—সেদিন দেখলাম তুমি তোমার মেয়েকে নিয়ে বিকেলবেলায় বেরলে। কোথায় গেলে গো?
—ও গানের মাস্টার মশায়ের কাছে।
—তুমি ও শিখছ,
এক গাল হেসে সুরঞ্জনা বলল, —ওই আর কি!
—ভাল তো।
—কার কাছে শিখছ?
—ওই যে মিশ্র স্যারের কাছে
—উনি খুব ভাল গান শেখান। নিজেও তো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বিশেষজ্ঞ।
—হ্যাঁ তাই তো শুনেছি।
—মেয়েকে নাচে দিলে না কেন?
—দেব।
তবে আর দেরি কেন।
—আসলে দেখেছি ছোট থেকেও ওর নাচের প্রতি একটা ঝোঁক আছে।
—পুচকিটা এখন কি করছে? ঘুম থেকে উঠে গেছে।
—না না উঠে যাবে একটু পরে। যতক্ষণ ঘুমোয় ততক্ষণেই শান্তি।
—সে আর বলতে।
—বুবুন কেমন আছে ভাল আছে।
—বলছি দিদি তোমাদের বাড়ি নতুন কাজে লেগেছে, একটি বউ।
—হ্যাঁ।
ওকে কদিন দেখছি না তো।
মনে মনে ভাবছে, বাবা কে কার বাড়িতে কাজে লাগছে এসব খবর আছে সুরঞ্জনার কাছে। খুব কৌতূহলী মনে হচ্ছে যেন সুরঞ্জনাকে।
—না ওর শরীরটা একটু খারাপ।
–ওওও…
—কেমন বউটা?
যেরকম হয় কাজের বউয়েরা খারাপ নয় ভালই।
–এইসব বৌয়েরা আবার কাজ করবে কদিন দেখো।
—কেন এরকম বলছ?
এদের পোশাবে এসব করে।
কেন!
কিছুটা অবাক হয়ে যাচ্ছে তিথি!
—কি নাম?
—ওর নাম সুনয়না।
—সুনয়না ওদের যে কত নাম।
তিথি বুঝতে পারছিল ব্যাপারটা নিয়ে কিছু একটা ঘোট বাঁধানোর চেষ্টা করছে!
জানি না, অনেকের দু’টো নাম থাকতেই পারে তবে ও তো বলেছে আমাদের কাছে সুনয়না আমার শাশুড়ি আবার তাকে সু বলে ডাকে। হয়ে গেল আর একটা নাম। তিথি ব্যাপারটাকে হালকা করার চেষ্টা করছে।
—সে তুমি যাই বলো দিদি, এই মেয়ে সুবিধার হবে না
আমাদের কাজ করে, সাবিও তো ওকে হাড়ে হাড়ে চেনে। এরা বাজে এই মেয়ে বিয়ে করে আসে ভদ্রলোকের বাড়িতে।
তিথি কথা বাড়াতে চাইল না। সকাল সকাল মুডটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বলল,
—আমি আসছি গো, দেখি বুবুন উঠল কিনা।
—ঠিক আছে আমিও যাই আমার মেয়েটা উঠল কিনা অন্য একদিন কথা হবে দিদি।
তিথি আর কোনও কথা বলল না।
—তবে কথাটা মনে রেখ দিদি।
নিচে নেমেই ফোনের আওয়াজ শুনতে পেল
বাপরে পবিত্র কুম্ভকর্ণের মত ঘুমায়।
—হ্যালো…
—বৌদি আমি সুনয়না বলছি।
—হ্যাঁ বলো, এত সকাল সকাল…
—তুমি কাজের মেয়ে দেখে দিতে বলেছিলে না?
—হ্যাঁ।
—আমাদের পাড়ার একটা বউকে বলেছি ও-কাজ করবে ওকে নিয়ে যাব?
—হ্যাঁ নিয়ে এস।
—আজকে তুমি থাকবে?
—হ্যাঁ।
—ঠিক আছে।
—আজকে, কখন আসবে?
—তুমি বলো তোমার টাইম তোমার যে সুবিধা হবে সেই সময় যাব।
—তা বিকেলে এসো।
—আচ্ছা তোমার শরীর ঠিক আছে?
—ওই চলে যাচ্ছে।
-না না না নিজের প্রতি অবহেলা ক’রো না।
—খুব ভাল লাগল গো। তোমার কথাটা মনে রেখেছি কিন্তু, আমরা তো মেয়ে মানুষ কাজ তো করতেই হবে। কর্মই ধর্ম সেই ধর্ম তো করতেই হবে।
—ঠিক বলেছো সুনয়না।
আচ্ছা তাহলে ওই কথাই থাকল।
ঠিক আছে।🍁 (ক্রমশ:)

 

 

 

🍂বিতা 

 

শংকর ঘোষ -এর দু’টি কবিতা

ভোর

অন্ধকারের বুক চিরে আসে টুকরো নিঃশব্দ আলো,
মনে অজস্র না-বলা কথার ঢেউ।
তোমার নাম লিখে রাখি হৃদয়ে গোপন পাতায়,
সময়ের ধুলো এসে ঢেকে দেয়, মুছে যায় না।
চোখের কোণে জমে থাকা স্বপ্নেরা প্রশ্ন তোলে,
কেন এত দূরত্ব,এত কাছাকাছি অনুভব?
হাত বাড়ালেই যেন ছুঁতে পারি তোমার স্পর্শ,
কিন্তু বাস্তবের দেওয়াল দাঁড়িয়ে অবিচল।
যদি ভালোবাসা অন্তহীন যাত্রা,
তবে তুমি তার দিশারী, আমি পথহারা পথিক।
তাও হেঁটে যাই—- কারণ কোথাও একটি ভোর অপেক্ষায়,
যেখানে তুমি আর আমি মিলব, নিঃশব্দের আলোয়।

 

শেষ না হওয়া পথ

নিঃশব্দ রাতের গহীনে কিছু অচেনা স্বপ্ন
তাদের ভেতরেই খুঁজি হারিয়ে যাওয়া ছায়া।
সময় বারবার বলে সবই ফুরিয়ে যায় একদিন
তবু হৃদয় মানে না ধরে রাখে তোমারই মায়া।
দূর আকাশে জ্বলছে একাকী কোনও নক্ষত্র
তার আলোয় দেখি তোমারই নাম লেখা…
যত দূরেই যাও তুমি, তত কাছে টানে এই মন
অজানা কোনও বন্ধনে জড়িয়ে আছি অবিরতভাবে।
জীবন যদি হয় অনন্ত পথচলা
তুমি তার অদেখা শেষ প্রান্তের স্বপ্ন।
আমি শুধু হাঁটি হারাই আর খুঁজে পাই
কারণ ভালোবাসা কখনও থামে না শুধু বদলায় রূপ।

 

 

গায়ত্রী মিত্র -এর একটি কবিতা

ডুব 

রাতের গভীরে ডুবে গিয়ে খুঁজি চেনা স্পর্শ
তোমার নামের প্রতিধ্বনি বাজে নীরবতার সুরে
হৃদয়ের ভাঁজে লুকনো যত অপ্রকাশিত অনুভব
তারা আজও জেগে ওঠে তোমারই স্মৃতির নূরে
সময় থেমে থাকে না, কিছু মুহূর্ত থমকে যায়
যখন তোমার কথা আসে হঠাৎ বাতাসের ভেলায়
চোখের কোণে জমে থাকা অজস্র না-বলা গল্প
নীরবে ভেসে যায় অজানা দূরের মেলায়
প্রেম যদি হয় এক অচেনা আলো পথ
তাহলে তুমি তার নিভে না-যাওয়া দীপ্ত শিখা।
আমি শুধু ছুঁতে চাই সেই আলোকে নিঃশব্দে
কারণ তোমাতেই খুঁজে পাই আমার অস্তিত্বের পথ।

 

নয়ন সেনগুপ্ত -এর একটি কবিতা 

ভোর সাড়ে তিনটের ক্লান্তি

ভোর সাড়ে তিনটেয় চোখে লেগে আছে অঘুমের ছায়া
মনে জীবন্ত অদ্ভুত অজানা ব্যথা।
রাতের সাথে কথা বলতে বলতে হারিয়ে ফেলেছি সময়
ঘড়ির কাঁটা থেমে গিয়েছে যেন তোমারই অপেক্ষায়।
চোখ বুঁজলেই ভেসে উঠছে কিছু অসমাপ্ত দৃশ্য
কথারা জমে থাকে ঠোঁটের কোণে, বলতে পারি না কিছুই।
ঘুম আসে না শুধু স্মৃতিরা দরজায় কড়া নাড়ে
তোমার নামের প্রতিধ্বনি শুনি অথচ তুমি নেই কোথাওই।

এই শহর তখনও ঘুমিয়ে বাতাস নিঃশব্দে হাঁটে
আমি একা জেগে থাকি নিজের ভেতরের কোলাহলে।
যদি ভোর মানেই হয় নতুন কোনও শুরু
তবে কেন এ হৃদয় এখনও আটকে আছে পুরনো জ্বালায়?

জানি ; এই ক্লান্তিরও একদিন শেষ হবে
রোশনি ছুঁয়ে দেবে অবসন্ন এই মন
আর আমি আবার শুরু করব অভিনয়
যেখানে ঘুম আর স্বপ্ন মিলবে একই প্রহরে, কোনও এক ভোরে।

 

 

দীপঙ্কর বাগচী -এর তিনটি কবিতা 

মনে পড়ে 

তৃতীয়া, তোমার নামটা আজও উচ্চারণ করি নিঃশব্দে
যেন কেউ শুনে ফেললে ভেঙে যাবে এই ভেতরের গোপনতা।
তুমি ছিলে খুব সাধারণ, অথচ অসম্ভব প্রয়োজনীয়
যেন হঠাৎ বৃষ্টির পরে মাটির গন্ধ।

আমি তোমাকে কখনও বলিনি, থেকে যাও
কারণ জানতাম, থাকাও একধরনের মিথ্যে।
তুমি চলে গিয়েছিলে খুব সহজে,
আর আমি কঠিন হয়ে গিয়েছিলাম ভিতরে ভিতরে।
ভাবি, যদি আবার দেখা হয় হঠাৎ কোথাও
তুমি কি চিনতে পারবে আমাকে?
নাকি আমরা দু’জনেই ভান করব
কখনও কিছুই ছিল না আমাদের মধ্যে।

অজুহাত

তৃতীয়া, আমি আজকাল অনেক অজুহাত বানাই
নিজেকে বোঝানোর জন্য, তুমি ঠিক ছিলে।
ভালবাসা মানেই একসঙ্গে থাকা নয়
এই কথাটা শিখতে আমার অনেক সময় লেগেছে।
তোমার চোখে এক ধরনের ক্লান্তি ছিল,
যা আমি বুঝেও না বোঝার ভান করতাম।
কারণ সত্যিটা খুব সহজ ছিল
আমি তোমাকে ধরে রাখতে পারব না কোনওদিন।

তবু মাঝে মাঝে মনে হয়
আমরা যদি একটু অন্যরকম হতাম,
হয়ত আজও কোথাও
একই আকাশের নিচে বসে কথা বলতাম।

 

তৃতীয়ার কাছে 

তৃতীয়া, আমি মাঝে মাঝে তোমার কাছে ফিরে যাই
মনে, খুব গভীর কোনও জায়গায়।
যেখানে তুমি এখনও একইরকম আছ
আমার জন্যই অপেক্ষা করে।
এই বাস্তবে তুমি বদলে গেছ নিশ্চয়ই
হয়ত অন্য কারও সঙ্গে জীবন গুছিয়ে নিয়েছ
আমার ভেতরের তুমি কিন্তু একদম বদলায়নি,
সেই আগের মতোই থেকে গেছ।

এই ফিরে আসাটা আসলে পালানো নয়
এটা প্রয়োজন— নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার
কারণ তোমাকে হারিয়ে ফেলার পর
আমি আর আগের মতো নেই।

 

 

সুকৃতি সাহা -এর একটি কবিতা 

শেষবার, তোমাকে 

যদি এটাই শেষবার লেখা হয়,
তাহলে খুব বেশি কিছু আজ বলব না।
শুধু জানাতে চাই, তুমি ছিলে বলেই আমি
ভালবাসা শব্দটা বিশ্বাস করতে শিখেছিলাম।
তুমি না থাকলে হয়ত জীবনটা সহজ হত
কিন্তু এতটা সত্যি হত না কখনও।
তোমার চলে যাওয়া আমাকে ভেঙে দেয়নি
অন্যরকম করে তৈরি করেছে

কোনও অভিযোগ নেই, কোনও প্রশ্নও নয়
শুধু একটুখানি কৃতজ্ঞতা
যেখানে তুমি আছ, ভাল থেক,
আমি আমার মতো করে বেঁচে থাকব এখানেই।

 

 

কমল গুহ -এর তিনটি কবিতা

সম্পর্ক

প্রতিশ্রুতি দাওনি, আমিও চাইনি
কীভাবে যেন বাঁধা পড়ে গিয়েছিলাম সুতোয়।
আমাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল বিচ্ছেদ ছিল না

অদ্ভুত কাছাকাছি থাকা অস্বীকার করা যায় না।

কখনও মনে হতো তুমি আমারই অল্প একটু
আবার পরক্ষণেই বুঝতাম তুমি কারও নও সম্পূর্ণ।
এই দ্বন্দ্ব নিয়েই কেটে গেছে কত অনির্দিষ্ট সময়
অভিমান জমেছে অথচ অভিযোগ নেই।
মনে হয় যদি আরেকটু সাহসী হতাম
তাহলে কী গল্পটা অন্যরকম হতো?
কিংবা হয়তো অসম্পূর্ণতাই আমাদের ঠিকানা ছিল

সম্পূর্ণ হলে হয়ত বা এতটা সত্যি থাকত না।

 

 

চিঠি 

একটা চিঠি তোমার নামে
শেষ লাইনটা লেখা হয়নি
কী লিখব : থেকে যাও
না চলে যাও…
এই দুইয়ের মাঝখানে আটকে ছিলাম।

তুমি যদি বুঝতে যদি পড়তে সেই অর্ধেক কথাগুলো
কী ভীষণভাবে তোমাকে চেয়েছিলাম!

চিঠিটা পাঠানো হয়নি
ড্রয়ারের অন্ধকারেই পড়ে রইল

এখন মাঝে মাঝে খুলে দেখি
অক্ষরগুলো তাজা, শুধু তুমি নেই,
সম্ভবত কিছু ভালবাসা দেখানোর জন্য জন্য নয়
শুধু নিজের কাছে লুকিয়ে রাখার জন্যই জন্মায়

 

হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো 

একসময় খুব সহজে কথা বলতাম
দিনের ভেতর রাত ঢুকে পড়ত অজান্তেই

এখন কথা খুঁজে পাই না আর
শব্দগুলো যেন নিজে থেকেই দূরে চলে গিয়েছে…

তোমার বদল এটা বলা সহজ
কিন্তু আমিও কী আগের মতো আছি?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও তো অন্য কেউ হয়ে উঠি পুরোনো আমিটাকে খুঁজতে থাকি ভেতরে!

হয়ত এটাই নিয়ম!
সবকিছু ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাওয়া
কিছু স্মৃতি জেদ করে থেকে যায়
যেগুলো ভুলতে চাই, সেগুলোই বারবার ফিরে আসে…
আর আমরা ভান করি যে কখনও কিছুই হয়নি।

 

 

 

 

🍂গল্প
আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমি কি পারব? সমাজের এত নিয়ম, এত বাধা! সবকিছুর মাঝে আমি কি নিজের ভেতরের কণ্ঠটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব? আমি কি আমার চোখের আগুনকে জ্বালিয়ে রাখতে পারব?

চোখে আমার আগুন হাসে

তাহমিনা শিল্পী

বৈশাখ এলেই আমার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা জন্ম নেয়। এক অদৃশ্য ডাক কানে আসে। খুব চেনা, খুব পুরনো এক ডাক। সেই ডাকের উৎস খুঁজতে গেলে আমি ফিরে যাই এক বৈশাখী মেলায়। যে মেলা থেকে আমি একটি হাওয়াই মিঠাই রঙের পুতুল কিনেছিলাম। অপলক চোখে তাকিয়ে থাকা এক মেয়ে পুতুল।
পুতুলটা কথা বলতো না, হাসতো না, এমনকি ওর চোখের পাতা নড়তো না। অথচ মনে হতো, পুতুলটি নিঃশব্দে আমার সাথে কথা বলছে, আমার ভেতরের সব কথা শুনতে পাচ্ছে। আমি আদর করে পুতুলটিকে সবসময় বুকের কাছে জড়িয়ে রাখতাম। সময়ের কোনো এক অদৃশ্য ফাঁকে, সেই পুতুলটি হারিয়ে গিয়েছে! তারপর কত বছর কেটে গেছে। তবু পুতুলটির উপর আমার মায়া কাটেনি। প্রতি বৈশাখে আমি আবার একটি পুতুল কিনতে চাই, ঠিক আগের পুতুলটির মতন- হাওয়াই মিঠাই রঙের। বাদামী চুল, ডো করে ঝুঁটি বাঁধা। চোখে টানা কাজল, স্থির মণি। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। হাতে-পায়ে লাল নেইলপলিশ। পায়ে রূপালী নূপুর,কিন্তু তাতে কোনো ঝুমুর নেই। তাই শব্দ হয় না।
আমি জানি, এই শহরে কেউ পুতুল খোঁজে না। সবাই মানুষ খোঁজে। আর মানুষ খুঁজতে খুঁজতেই তারা নিজের ভেতরের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলে। বোধহয়, আমিই একমাত্র, যে মানুষ খুঁজি না, কেবল একটি পুতুল খুঁজি।

এখন আমার চোখ দু’টো অন্যরকম। স্থির না, জীবন্ত। চোখে আমার আগুন হাসে। সে হাসিতেই সকল অন্যায়ের, অবিচারের উত্তর লুকানো আছে। সেই আগুনেই প্রতিবাদের ঢেউ খেলা করে। আমি জোরালভাবে অনুভব করি, এটি শুধু একটি পুতুল নয়। সে আমার সেই অংশ, যাকে এতদিন সমাজ-সংসার চুপ করিয়ে রেখেছিল। যাকে এতদিন আমি চুপ করিয়ে রেখেছিলাম।

একদিন এক শপিং মলের একটি দোকানের ভিতর অনেকগুলো পুতুল সাজানো দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দোকানটা আধুনিক, রঙিন আলোয় ঝলমল করছে। কাঁচের শোকেসে সাজানো নানান রকম পুতুল। ভিতরে ঢুকে এক এক করে পুতুলগুলো দেখতে লাগলাম। সব পুতুলই সুন্দর। কোনটি হাসছে, কোনটি গান গাইছে, কোনটি আবার নাচছে। আমার একটিও পছন্দ হল না। আমি দোকানদারকে বললাম, আপনার কাছে এমন কোনো পুতুল আছে, যে হাসে না, কথা বলে না? একদম স্থির।
লোকটা একটু অবাক হয়ে তাকালো। বলল, মানে কি?
বললাম, মানে হচ্ছে আমি এমন একটি পুতুল খুঁজছি, যে পুতুলটি একদম চুপচাপ থাকবে। সব দেখবে, কিন্তু কোনো শব্দ করবে না। শুধু তাকিয়ে থাকবে।
লোকটা হেসে ফেলল, এমন পুতুল আজকাল কেউ কিনে?
আমি উত্তর দিলাম না। কারণ, আমার বলতে ইচ্ছে করলো না,এমন পুতুল কেউ কেনে না। শুধু আমি কিনতে চাই।

সেদিন রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হল, আমিই সেই পুতুলটা! চোখে, নাক, মুখ, চুল অবিকল পুতুলটির মতই। কিন্তু আমার চোখদুটো? ওগুলো কি জীবন্ত? নাকি চোখগুলোও সেই পুতুলটির মতো স্থির হয়ে গেছে?
আমি নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ।
হঠাৎ মনে হলো, কেউ যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
অনুভব করলাম, আমার ভেতরের পুতুলটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। পরের দিন আবার বের হলাম পুতুল খুঁজতে। এবার শহরের বাইরে, এক বাজারে গেলাম, যেখানে এখনও বিভিন্ন পুরনো জিনিস বিক্রি হয়।
বাজারের এক কোণে এক বৃদ্ধা বসে ছিলেন। তার সামনে কয়েকটি পুতুল। একটি পুতুল হুবুহু আমার হারিয়ে যাওয়া পুতুলটির মতই। আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি এগিয়ে গেলাম।
এই পুতুলটার দাম কত? আমি জিজ্ঞেস করলাম। বৃদ্ধা আমার দিকে তাকালেন। তার চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি!
বললেন, এই পুতুলটা সবার জন্য না। যারা নিজের ভেতরের পুতুলকে চিনতে পারে, শুধু তারাই এটি নিতে পারবে।
আমি কিছু বললাম না। শুধু পুতুলটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আপনি কি তাকে চিনতে পেরেছেন? বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন।
আমি ধীরে মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ।
বৃদ্ধা পুতুলটি এগিয়ে দিয়ে বললেন, তাহলে নিয়ে যান।
দাম কত? জানতে চাইলাম।
বৃদ্ধা বললেন, এই পুতুলের দাম টাকা দিয়ে হয় না।
আমি অবাক হলাম। বললাম, তাহলে নেব কী করে?
বৃদ্ধা বললেন, একটি কথা দিতে হবে। মানে প্রতিশ্রুতি।
বিস্ময়ে জানতে চাইলাম, কী কথা?
বৃদ্ধা জোরালভাবে বললেন, আপনি আর কখনও নিজের ভেতরের পুতুলটাকে চুপ করাবেন না।

আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমি কি পারব? সমাজের এত নিয়ম, এত বাধা! সবকিছুর মাঝে আমি কি নিজের ভেতরের কণ্ঠটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব? আমি কি আমার চোখের আগুনকে জ্বালিয়ে রাখতে পারব?
বৃদ্ধা, পুতুলটিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
আমি দ্রুত বললাম, পারব। আমি অবশ্যই পারব।
বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন। পুতুলটি আমাকে দিলেন। বললেন,
এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেই এই পুতুলটি অদৃশ্য হয়ে যাবে।
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম, আমাকে তো পারতেই হবে।
পুতুলটি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
রাতে তাকে আমার সামনে বসিয়ে রাখলাম। ও চুপচাপ তাকিয়ে আছে, ঠিক আগের মতোই। কিন্তু আজ একটু অন্যরকম। তার চোখে আলো জ্বলছে।

আমি পুতুলটিকে বললাম, তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছ?
কোনও উত্তর নেই।
আমি আবার বললাম, এখন থেকে আমি আর চুপ থাকব না। সব অন্যায়ে সরব হবো। আমার সম্মান আমিই রক্ষা করব।
ঠিক তখনই, ঘরের ভেতরে একটা হালকা বাতাস বয়ে গেল। পুতুলটির চুল সামাণ্য নড়ে উঠল।
আমি চমকে গেলাম। এটা কি সত্যি? নাকি আমার কল্পনা?
দিনগুলো বদলাতে শুরু করল। আমি আগের মতো আর চুপ থাকি না। যেখানে অন্যায় দেখি, যেখানে নিজেকে ছোট মনে হয়, সেখানেই কথা বলি, যৌক্তিকভাবে প্রতিবাদ করি।
সবাই অবাক হয়। বলে, তুমি এত বদলে গেলে কীভাবে?
আমি হাসি। চুপ থাকি, কোন উত্তর দিই না।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবার নিজের দিকে তাকালাম। এখন আমার চোখ দু’টো অন্যরকম। স্থির না, জীবন্ত। চোখে আমার আগুন হাসে। সে হাসিতেই সকল অন্যায়ের, অবিচারের উত্তর লুকানো আছে। সেই আগুনেই প্রতিবাদের ঢেউ খেলা করে। আমি জোরালভাবে অনুভব করি, এটি শুধু একটি পুতুল নয়। সে আমার সেই অংশ, যাকে এতদিন সমাজ-সংসার চুপ করিয়ে রেখেছিল। যাকে এতদিন আমি চুপ করিয়ে রেখেছিলাম।
এখন সে কথা বলে, আমার কণ্ঠে সে জেগে উঠেছে। আমার চোখে হেসে ওঠা আগুনে সে বেঁচে থাকছে।
আবার বৈশাখ এসেছে। এইবার আমি আর কোনও পুতুল কিনতে চাই না। আমি আমার পুতুলটাকে খুঁজে পেয়েছি। সে আমার ভেতরেই আছে। নীরব, অথচ আগুনের মতো শক্তিশালী। আমার ভেতরের পুতুলটা তাই জেগে থাকে, সবসময়। 🍁

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com 

বি: দ্রসমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরে পড়া’ বিভাগের লেখা  আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন