West Bengal Assembly Election 2026 | ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন – ভোট পর্ব ৫

SHARE:

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের দাবিতে জুনিয়র ডাক্তাররা টানা কর্মবিরতি আন্দোলন পালন করেন। এবং মহিলা চিকিৎসকের হত্যার প্রতিবাদে মেয়েরা রাত দখল আন্দোলনের ডাক দেয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এতটাই তীব্রতা ছিল যে শুধুমাত্র এই পশ্চিমবঙ্গেই নয় তথা ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি শহরে এবং ভারতবর্ষের বাইরেও বিদেশে চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করে এক নজিরবিহীন আন্দোলনে গর্জে ওঠেন। লিখেছেন: অগ্নি প্রতাপ 

৫.

২০২৪ সালে ১৮ তম লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রবাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি বিগত ১০ বছরের সাফল্য যেমন বলা তেমন কাজ (৩৭০ ধারা বাতিল, তিন তালাক বাতিল, জিএসটি, রাম মন্দির নির্মাণ) এককভাবে ৪০০ কেন্দ্রে জয়ের বার্তা নিয়ে দেশবাসীর কাছে ভোট দেওয়ার আবেদন রাখে। প্রথম দিকে ৪০০ কেন্দ্রে জয় লাভ সহজ মনে হলেও কিন্তু হিসাব মিলানো যায়নি। বহু বিশেষজ্ঞই বলেছিলেন, গত ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি এককভাবে ৩০৩ টি লোকসভা কেন্দ্রে জয়লাভ করেছিলেন তার থেকে অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি কেন্দ্র ২০২৪ সালে জয়লাভ করবে। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসতেই লক্ষ্য করা যায়, ভারতীয় জনতা পার্টি এককভাবে ২৪০ টি কেন্দ্র জয়লাভ করে এবং তাদের জোট সঙ্গী (NDA) একত্রিত ভাবে সরকার গঠনের ২৯৩ টি সংখ্যা অতিক্রম করে। এবং তৃতীয় বারের জন্য ভারতীয় জনতা পার্টি এবং জোট সঙ্গী (NDA) কেন্দ্রে সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বার মাননীয় নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী শপথ গ্রহণ করেন।

এই লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জনতা পার্টির তরফ থেকে বারংবার অভিযোগ তোলা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী -এর নেতৃত্বে ভারত বর্তমানে নতুন ভারত অর্থাৎ আত্মনির্ভর ভারত হিসেবে সারা পৃথিবীর কাছে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে বিদেশী শক্তি অর্থাৎ ভারত বিরোধী শক্তি তা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। তার জন্য তারা বিভিন্নভাবে এই নির্বাচনে মোদীজির নেতৃত্বে তৃতীয়বার যাতে সরকার গড়তে না পারে সেই চেষ্টাই বিভিন্নভাবে করে গিয়েছেন। আর এর জন্য বিরোধীদের কটাক্ষ করতে তারা বারংবার সংবাদমাধ্যমে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি।

এই ২০২৪ সালে জুলাই মাসে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে কোটা সংস্কার ছাত্র আন্দোলন যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশে গণ অভ্যুত্থানের রূপ নেয় আর এখান থেকেই ভারতীয় জনতা পার্টির করা অভিযোগ সমস্ত দেশবাসীর মনে দাগ কাটে। বিশেষ করে ভারতের সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব ভারতের একমাত্র প্রবেশদ্বার রাজ্য এই পশ্চিমবঙ্গ। এমনিতেই বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে শাসক বিরোধী তরজা সারা বছর চলতেই থাকে অবৈধ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে। ভারতীয় জনতা পার্টির রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বারংবার সোচ্চার হয়েছেন এই রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অবৈধ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশের মদত এবং অবৈধভাবে রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড বানিয়ে নিজেদের ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। আবার অন্যদিকে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের পাল্টা দাবী, সীমান্ত হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর অধীনে অতএব দায়ভার তাদের। বিরোধীদের দাবি ২০০৫ সালে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ করতে কাগজপত্র ছিঁড়ে সংসদে স্পিকারের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে ফেলেন এবং তিনি পদত্যাগ করেন। আর বর্তমান দিনে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবার পর অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকে কেন্দ্রীয় সরকার এবং সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ব্যর্থতা বলে সরব হয়েছেন এমনকী এই দাবীতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছেন। বিরোধীদের কটাক্ষ এটা মাননীয়ার দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই না।

বাংলাদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনুস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর বাংলাদেশে সংখ্যা লঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে নেমে আসে নির্মম অত্যাচার। সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে হত্যালীলা, ধর্ষণ, লুটপাট। কাতারে কাতারে মানুষ সীমান্তে উপস্থিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের এই ভয়ানক পরিস্থিতি বিশেষ করে সীমান্তবর্তী রাজ্য বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতবর্ষ জুড়ে মানুষ প্রতিবাদ জানাতে থাকে। এমনকী ভারত সরকারের তরফ থেকেও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও বিশেষভাবে নজর দেওয়ার জন্য সংখ্যালঘুদের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে থাকে। অন্যদিকে, একটি বিশেষ সম্প্রদায় বাংলাদেশের নির্বাচিত শেখ হাসিনার সরকার ও ভারত সরকারকে নিয়ে এই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বিনা বাঁধায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। যা নিয়ে বিরোধী দল পাল্টা প্রতিবাদ করায় সাধারণ মানুষ বিরোধী দল এবং বিরোধী নেতার প্রতিবাদকে সাধুবাদ জানায়।

এইরকম একটা বীভৎস পরিস্থিতির মধ্যে কলকাতার বুকে আর জি কর মেডিকেল কলেজ হসপিটালে ৯ ই আগস্ট ২০২৪, ৩১ বছর বয়সী পিজিটি মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা সারাদেশে তোলপাড় পড়ে যায়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চিকিৎসকদের আন্দোলন যা আগে কখনওই মানুষ চোখে দেখেননি। প্রাথমিকভাবে কলকাতা পুলিশ এই তদন্ত করলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে নির্দেশে সিবিআইকে তদন্তভার দেওয়া হয়। মূল অভিযুক্ত সিভিক ভলেন্টিয়ার সঞ্জয় রায় গ্রেফতার হওয়া এবং হাসপাতাল সংক্রান্ত এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে যা শুনে শুধু পশ্চিমবঙ্গবাসীরাই নয় সারা দেশের মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যায়। বিরোধীরা সুর চড়াতে থাকে শাসক যোগ-এর অভিযোগ তুলে। ১৫ আগস্ট ২০২৪ রাতে দুষ্কৃতীদের দ্বারা আর জি কর হাসপাতলে জরুরি বিভাগ এবং মৃতদেহ যেখান থেকে উদ্ধার হয়েছিল সেমিনার হল ব্যাপক ভাঙচুর এবং অনেক প্রমাণ নষ্ট করে দেওয়া হয়। বিরোধীরা একযোগে সরাসরি তদন্ত চলাকালীন তৎকালীন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের নেতৃত্বে তদন্তে গাফিলতি এবং প্রশাসনের মদতেই এই নক্কার জনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ করতে থাকেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের দাবিতে জুনিয়র ডাক্তাররা টানা কর্মবিরতি আন্দোলন পালন করেন। এবং মহিলা চিকিৎসকের হত্যার প্রতিবাদে মেয়েরা রাত দখল আন্দোলনের ডাক দেয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এতটাই তীব্রতা ছিল যে শুধুমাত্র এই পশ্চিমবঙ্গেই নয় তথা ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি শহরে এবং ভারতবর্ষের বাইরেও বিদেশে চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করে এক নজিরবিহীন আন্দোলনে গর্জে ওঠেন। এমনকী মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পদত্যাগ দাবি করা হয়। আগস্ট ২০২৪, একটি সমাবেশের মধ্য দিয়ে নবান্ন অভিযানের ডাক দেয়া হয়। এই নবান্ন অভিযানের উদ্যোক্তা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ ছাত্র সমাজ এবং বিরোধীদল ভারতীয় জনতা পার্টি। এই সমাবেশ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় -এর পদত্যাগের দাবীকে কেন্দ্র করে। এই সমাবেশে আগত বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ জল কামান এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় পুলিশের ওপর বিক্ষোভকারীরা ইট পাথর নিক্ষেপ করলে উভয় পক্ষ বেশ কিছুজন আহত হন। এই পুলিশী আক্রমণের ফলে বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি ২৮ আগস্ট ২০২৪ রাজ্যে ১২ ঘন্টা বন্ধের ডাক দেয়। এই ঘটনায় দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এবং প্রত্যেকটি বিরোধী দল রাস্তায় এসে প্রতিবাদ আন্দোলন শাসকের ভীত নাড়িয়ে দেয়। আন্দোলনের চাপে শাসককে বাধ্য করা হয় পুলিশ কমিশনারকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু যে বিচারের আশায় জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষ থেকে বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দল আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন আজও সবাই অপেক্ষায় আছেন সেই বিচারের আশায় যে একদিন তিলোত্তমা নিশ্চয়ই ন্যায্য বিচার পাবে এবং প্রকৃত যারা দোষী তাদের শাস্তি হবেই। 🍁 (চলবে)

আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Election 2026 | পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন – ভোট পর্ব ১

Sasraya News
Author: Sasraya News