পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন – ভোট পর্ব ১
মোথাবাড়িকান্ড ঘটার পর বেশ কিছু জিনিস বা প্রমাণ সামনে এসেছে যা চমকে দেওয়ার মতো। যারা এই বিচারাধীন ভোটার ছিলেন তারা যে প্রমাণ বা প্রয়োজনীয় কাগজ দাখিল করেছিলেন দেখা গিয়েছে, সেই ফর্মে বেশ কিছু ভুল থাকার জন্য এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন থাকে, কে বা কারা এই বিচারাধীন ভোটারদের হয়ে ফরম ফিলাপ করলেন বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ফিলাপ করেছিলেন? তাদের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল যারা ফিলাপ করেছিলেন? এ কোনও গভীর চক্রান্ত নয়তো? শুধু চক্রান্ত নয় দেশবিরোধী চক্রান্ত? একে অপরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়া? আমাদের সব থেকে বড় স্তম্ভ বিচার ব্যবস্থা সেখানে আঘাত করানো ইচ্ছাকৃতভাবে এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা? কোন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করা হয়নি তো? লিখেছেন অগ্নি প্রতাপ

গণতন্ত্রের সব থেকে বড় উৎসব বলা হয় ভোট দান। আর এই ভোটকে নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক দল গুলোর মধ্যে থাকে এক উন্মাদনা। আমাদের দেশে আইনে দেশের নাগরিকদের মোট তিনবার ভোটের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ১)স্থানীয় স্তরে পঞ্চায়েত/পৌরসভা, ২) রাজ্য পরিচালনার জন্য বিধানসভা, ৩) দেশ পরিচালনার জন্য লোকসভা। সর্বক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেয়াদ হল পাঁচ বছর। এই বছরের মধ্যে নাগরিকরা যে সকল ব্যক্তিবর্গ বা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি করা ব্যক্তিদের নির্বাচিত করেন পরেরবার অর্থাৎ পাঁচ বছর মেয়াদ পূরণের পর আবার সেই সকল ব্যক্তিবর্গ বা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন কি না তা ঠিক করেন দেশের নাগরিক। এই পাঁচ বছর সময়কালে প্রত্যেক নাগরিকই চায় যে তাদের যে চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, নিয়োগ প্রক্রিয়া, কৃষিজ পণ্য, আয় উন্নতি ইত্যাদি পরিষেবাগুলো যেন ঠিক ঠিক ভাবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু আমাদের দেশ মহান ভারত বর্ষ স্বাধীনতার পর থেকে আজও সরকারিভাবে যে সকল অর্থ বা উদ্যোগ সাধারণ নাগরিকদের জন্য স্থির করা শতকরা একশ ভাগের মধ্যে দেখা গেছে খুব বেশি হলে কুড়ি শতাংশ সাধারণ নাগরিকদের কাছে এসে পৌঁছায়। তারপরও সাধারণ মানুষ সমস্ত কিছু মেনে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং বিশ্বাসের উপর ভর করে জনপ্রতিনিধি ঠিক করেন। সারা ভারতবর্ষেই খুব কম জনপ্রতিনিধি দেখা যায় যারা মানুষের জন্য নিজের সমস্ত কিছুই আত্মত্যাগ করেছেন। সমস্ত জন প্রতিনিধি কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় মনোনীত হয়ে থাকেন অথবা পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করেন আর রাজনৈতিক দলগুলি সমষ্টির বিচারে সরকার স্থাপন করেন।
২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন হতে যাচ্ছে মোট দুই দফায়। প্রথম দফা ২৩ এ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফা ২৯ এ এপ্রিল। এবারে বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মনে উন্মাদনা আছে ঠিকই কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ খুবই কম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এত বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে যা আগে কখনোই এই বিধানসভা ভোটকে কেন্দ্র করে চোখে পড়েনি। তার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে সবথেকে বড় চর্চিত যেটা তা হল SIR (Special Intensive Revision) অর্থাৎ বাংলায় “বিশেষ নিবিড় সংশোধন”। বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে ঘিরে যেভাবে একটার পর একটা ঘটনা ঘটে চলেছে এই পশ্চিমবঙ্গে যা কখনওই কোনও অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। এর জন্য সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের মেলবন্ধন এবং মানসিক বন্ধনের প্রয়োজন ছিল যা আজকের দিনে দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে। ২০০২ সালে শেষ এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন হয়েছিল আর ২০২৬ সালে ২০০২ সালের ভোটার লিষ্ট অনুযায়ী ভিত্তি করে সম্পর্কের বিচারে এবং ভিন্ন দেশ থেকে আসা নাগরিকত্বের ভিত্তিতে ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ।
গত ২ এপ্রিল শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বিচারপতিদের ওপর হামলার ঘটনা নজির বিহীন ভাবে ভৎসনা করেন এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে ৬ এপ্রিলের মধ্যে ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট শীর্ষ আদালতে জমা করার জন্য আদেশ জারি করেন এবং সেই মতো জাতীয় নির্বাচন কমিশন জাতীয় সুরক্ষা এজেন্সিকে (NIA) সম্পূর্ণ ঘটনার তদন্তভার তুলে দেন।
এই সমস্ত প্রক্রিয়া জাতীয় নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়ে থাকে। এই সংশোধনের ফলে মৃত ব্যক্তি, স্থানান্তরিত ব্যক্তি, একাধিক জায়গায় নাম থাকা এবং সর্বোপরি প্রতিবেশী দেশ থেকে আগত নাগরিকদের নামের ঝাড়াই বাছাই হল প্রকৃত উদ্দেশ্য। ভারত সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশ থেকে আগত সকল শরণার্থীদেরই নাগরিকত্ব প্রদান সঙ্গে ভোটাধিকার। বিশেষ নিবিড় সংশোধন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ছাড়াও আরও চারটি রাজ্যে চালু হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ওই চারটি রাজ্য বাদ দিলে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। লড়াইটা এখন রাজ্য সরকার এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই গড়িয়েছে শীর্ষ আদালত পর্যন্ত আর শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের রায় অনুযায়ী এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজে যুক্ত হয়েছেন বিচারকমন্ডলী। শুধু তাই নয়, জমে থাকা অমীমাংসিত জাতীয় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক চিহ্নিত বিচারাধীন ভোটার সংশোধন করতে শুধু রাজ্যের বিচারপতিরা যুক্ত হননি হয়েছেন পার্শ্ববর্তী রাজ্যের ও বিচারপতিরা। শীর্ষ আদালতের আদেশে এবং উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিচারপতিরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন সময়ের মধ্যে যাতে করে সমস্ত কিছু নিষ্পত্তি করা যায়।
এর মাঝে চলছে রাজনৈতিক দলের দোষারোপের পালা আর সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে একশ্রেণীর মানুষকে খেপিয়ে তোলা। যার পরিণতি মালদহ জেলার কালিয়াচকে মোথাবাড়ি বিডিও অফিসে সাতজন বিচারপতি বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন বিচারাধীন ভোটার মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য আর ঘটে যায় এক ভয়ানক এবং গণতন্ত্রের পক্ষে ভীষণ ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক এবং লজ্জাজনক ঘটনা বিচারকদের প্রায় ১৬ ঘণ্টার বেশি আটকে রেখে বিশাল জনসংখ্যায় একশেণীর মানুষের জমায়েত এবং পরিণতি গভীর রাতে ওই দিন অর্থাৎ ১ এপ্রিল তারিখ রাতে বিচারপতিদের ওপর বাঁশ, ইট ও পাথর দ্বারা আক্রমণ।
কিন্তু সবার মনে প্রশ্ন একটাই, জমায়েত যখন হচ্ছিল তখন পুলিশ কি ভূমিকা পালন করেছিল? এক ঘন্টা দু ঘন্টা নয় প্রায় ১৬ ঘণ্টা তাহলে পুলিশ বা প্রশাসন ব্যর্থ কেন হল? আইবি ডিপার্টমেন্ট কী করছিল? পশ্চিমবঙ্গে যেখানে পাড়ায় পাড়ায় সিভিকদের দ্বারা সমস্ত খবরা-খবর পুলিশ বা আই বি ডিপার্টমেন্টে যায় তাহলে এই ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় কেন? বিচারপতিরা যখন বুঝতে পারেন যে আস্তে আস্তে জমায়েত বাড়ছে তখন তারা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারপরও ব্যবস্থা গ্রহণ নয় কেন? ঘটনার ৫ দিন আগে এই বিচারপতিরাই চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, তাদের ওপর আক্রমণ হতে পারে তাহলে সেই মতো ব্যবস্থা গ্রহণ নয় কেন? যেখানে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি এবং উচ্চ আদালতে প্রধান বিচারপতি বারংবার প্রশাসনকে জানানোর পরও এই অরাজকতা এবং নক্কার জনক পরিস্থিতি সামাল না দিয়ে বিচারকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া এই দায় কার?
প্রশ্ন তো উঠবেই কারণ বারংবার দেখা গিয়েছে শাসক ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসন প্রায়শই নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়ে গেছে। পুলিশ প্রশাসনকে নিয়োগ প্রশ্ন উঠছে যে যাদের দায়িত্ব আইনকে রক্ষা করা তারা আইন ভঙ্গকারীকে কি করে তারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন? এই পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যে যদি বিচারপতিদের ওপর আক্রমণ আসে তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কি হবে?
গত ২ এপ্রিল শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বিচারপতিদের ওপর হামলার ঘটনা নজির বিহীন ভাবে ভৎসনা করেন এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে ৬ এপ্রিলের মধ্যে ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট শীর্ষ আদালতে জমা করার জন্য আদেশ জারি করেন এবং সেই মতো জাতীয় নির্বাচন কমিশন জাতীয় সুরক্ষা এজেন্সিকে (NIA) সম্পূর্ণ ঘটনার তদন্তভার তুলে দেন। তবে হ্যাঁ তদন্ত চলছে, তদন্ত চলবে, তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়বে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থাকবে যে, সত্যিকারে স্থানীয় প্রশাসন কী এই তদন্তে সাহায্য করবে নাকি পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সমস্ত কিছুই তদন্তকারীদের কাছে লুকিয়ে যাওয়া বা তদন্ত স্বার্থে সমস্ত প্রমাণ লোপাট করা এগুলোও চলতে থাকবে? এই মোথাবাড়িকান্ড ঘটার পর বেশ কিছু জিনিস বা প্রমাণ সামনে এসেছে যা চমকে দেওয়ার মতো। যারা এই বিচারাধীন ভোটার ছিলেন তারা যে প্রমাণ বা প্রয়োজনীয় কাগজ দাখিল করেছিলেন দেখা গিয়েছে, সেই ফর্মে বেশ কিছু ভুল থাকার জন্য এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন থাকে, কে বা কারা এই বিচারাধীন ভোটারদের হয়ে ফরম ফিলাপ করলেন বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ফিলাপ করেছিলেন? তাদের উদ্দেশ্যই বা কী ছিল যারা ফিলাপ করেছিলেন? এ কোনও গভীর চক্রান্ত নয়তো? শুধু চক্রান্ত নয় দেশবিরোধী চক্রান্ত? একে অপরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়া? আমাদের সব থেকে বড় স্তম্ভ বিচার ব্যবস্থা সেখানে আঘাত করানো ইচ্ছাকৃতভাবে এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা? কোন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করা হয়নি তো? পশ্চিমবঙ্গে মোট বুথের সংখ্যা ৮০ হাজারের বেশি। এই কাজে নিযুক্ত বুথ লেভেল অফিসার (BLO) নিজের দায়িত্ব নিজের প্রতি, নিজের রাজ্যের প্রতি এবং সর্বোপরি দেশের প্রতি সততার সঙ্গে পালন করেছেন? এছাড়াও নির্বাচন কাজে যুক্ত সমস্ত রাজ্য সরকারি আধিকারিক নিজের প্রতি, রাজ্যের প্রতি, দেশের প্রতি সর্বোপরি সংবিধানের নেওয়া শপথ বাক্যের অক্ষরে অক্ষরে সঠিকভাবে পালন করেছেন তো? হ্যাঁ, সাধারণ মানুষ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবাসী আজকের দিনে এই প্রশ্নই করবেন আর এটাই স্বাভাবিক কারণ যদি বিচারকদের ওপর এইরকম নির্মম বর্বর প্রাণনাশের হামলা এই দেশের মাটিতে একটি রাজ্য যার নাম পশ্চিমবঙ্গ সেখানে সংঘটিত হয় তাহলে বুঝতে হবে আগামী দিন গণতন্ত্র এবং দেশের জন্য যা খুবই ভয়ানক এবং মর্মান্তিক।


