সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: শনিবার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড-এ বিশাল জনসমাবেশে উপস্থিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পাশাপাশি দলীয় সভা থেকে তিনি রাজ্যের শাসকদলকে নিশানা করে বলেন, ‘বাংলার মা নিঃস্ব, মাটি লুণ্ঠিত, মানুষ চলে যাচ্ছে। এ বার তৃণমূলকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।’ তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের সময় এসে গিয়েছে এবং রাজ্যের মানুষ সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। দিনের শুরুতে কলকাতায় সরকারি কর্মসূচীতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে তাঁর পাশে ছিলেন রাজ্যের নতুন রাজ্যপাল আর.এন.রবি (R. N. Ravi)। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাতে গৌর-নিতাইয়ের মূর্তি তুলে দেন। এই কর্মসূচী থেকেই প্রধানমন্ত্রী প্রায় ১৮,৭০০ কোটি টাকার একাধিক অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ঘোষণা ও উদ্বোধন করেন। বন্দর ও পরিবহণ খাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সূচনা করেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে হলদিয়া ফক কমপ্লেক্স (Haldia Dock Dock Complex) -এর পাঁচ নম্বর বার্থের সংস্কার প্রকল্পের উদ্বোধন, যা পরিবেশবান্ধব উপায়ে দ্রুত পণ্য পরিবহণে সহায়ক হবে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি খিদিরপুর ডক (Kidderpore Dock) -এর সংস্কার কাজেরও সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও একাধিক রেল প্রকল্পের ঘোষণাও করা হয়।
আরও পড়ুন : মোবাইল রিচার্জের দাম ঊর্ধ্বমুখী: ভারতে বাড়ছে ডিজিটাল খরচের চাপ, বিপাকে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার
সরকারি কর্মসূচী শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যান ব্রিগেডের দলীয় সভায়। সেখানে উপস্থিত বিপুল জনসমাগমকে উদ্দেশ্য করে তিনি বাংলায় বক্তব্য শুরু করেন। ‘আমার প্রিয় পশ্চিমবঙ্গবাসী, আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে প্রণাম’ এই অভিবাদন দিয়ে তিনি বক্তৃতা শুরু করেন। চারদিকে মানুষের ঢল দেখে তিনি বলেন, ‘যেখানেই চোখ পড়ছে, সেখানেই মানুষ। এই দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ।’ সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়ে সরব হন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ‘বাংলায় জঙ্গলরাজ কায়েম হয়েছে। রাজ্যের প্রতিটি প্রান্ত থেকে আওয়াজ উঠছে, বিজেপি সরকার চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাল আপনাদের সবাইকে চোর বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলার মানুষ জানেন আসল চোর কারা।’ প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে এবং বিরোধীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘কুর্সি বাঁচানোর জন্য নির্মম সরকার সব রকম হাতিয়ার ব্যবহার করছে। কোথাও গাড়ি আটকে দেওয়া হয়েছে, কোথাও সেতু বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এত কিছু করেও মানুষের ঢল আটকানো যায়নি।’
রাজ্যের উন্নয়ন প্রসঙ্গেও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, রাজ্যে বিজেপি সরকার না থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ‘আজও প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধন হয়েছে। বাংলার উন্নয়নের জন্য কেন্দ্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ,’ বলেন তিনি। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নরেন্দ্র মোদী বলেন, ‘এখানকার সরকার যুবকদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়েছে। বাংলার যুবক-যুবতীরা ডিগ্রি পাচ্ছেন না, চাকরিও পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে অন্য রাজ্যে চলে যেতে হচ্ছে।’ তাঁর অভিযোগ, ‘প্রথমে কংগ্রেস, তারপর বাম এবং এখন তৃণমূল- প্রত্যেকেই নিজেদের স্বার্থে রাজ্যকে ব্যবহার করেছে। উন্নয়ন থমকে গিয়েছে।’ চাকরি দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘তৃণমূল সরকার প্রকাশ্যে চাকরি বিক্রি করেছে। যুবকদের স্বপ্ন ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর দাবি, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যের যুবকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং রাজ্যের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে। কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়েও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্প সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে দেওয়া হচ্ছে না। ‘কাটমানি না দিলে প্রকল্প এগোয় না। গরিবদের পাকা বাড়ি, বিশুদ্ধ জল, সবই আটকে রাখা হয়েছে,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, চা-বাগানের শ্রমিকরাও বহু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই সভায় বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কৃষকদের সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। সম্প্রতি পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় একজন আলুচাষীর আত্মহত্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি ও খারাপ রাজনীতির জন্য কৃষক থেকে মধ্যবিত্ত, সকলের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।’ নারী নিরাপত্তা ইস্যুতেও রাজ্য সরকারকে নিশানা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মা-বোনেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি ফিরতে বলা হচ্ছে মেয়েদের।’ তাঁর দাবি, বিজেপি ক্ষমতায় এলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। সন্দেশখালি ও আরজি কর হাসপাতাল সংক্রান্ত বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে নরেন্দ্র মোদী বলেন, ‘সেই ঘটনাগুলো মানুষ ভোলেনি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তাদের রক্ষা করা হয়েছে।’ বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘এ বারের নির্বাচন শুধু সরকার বদলের নয়, বাংলার আত্মাকে বাঁচানোর নির্বাচন।’ তাঁর কথায়, ‘মানুষ যখন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ইতিহাস বদলে যায়। আজ ব্রিগেডে মানুষের উপস্থিতি সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভয়, কাটমানি এবং দুর্নীতিমুক্ত নতুন বাংলা গড়ার সময় এসেছে। পরিবর্তনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের জনগণের জয় হোক।’
ছবি : সংগৃহীত




