Beach Sand Minerals India | ভারতের উপকূলেই লুকিয়ে ১,৩০৯ মিলিয়ন টন মূল্যবান খনিজ! রেয়ার আর্থ করিডোর গড়ে তুলতে বড় উদ্যোগ কেন্দ্রীয় সরকারের

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি : ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান খনিজ সম্পদের সন্ধান মিলেছে। দেশের বিভিন্ন সমুদ্রতটের বালিতে লুকিয়ে রয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ ভারী খনিজ, যেগুলি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, শিল্প ও জ্বালানি ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারতের উপকূলীয় বালিতে মোট প্রায় ১,৩০৯.৪২ মিলিয়ন টন ভারী খনিজ সম্পদের মজুত রয়েছে। এই তথ্য লোকসভায় লিখিত উত্তরে প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং পৃথিবী বিজ্ঞান মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী ‘ড. জিতেন্দ্র সিং (Dr. Jitendra Singh)’। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় রাজ্যে ‘বিচ স্যান্ড মিনারেলস (Beach Sand Minerals বা BSM)’ নামে পরিচিত মূল্যবান খনিজের বড় মজুত রয়েছে এবং এগুলিকে কাজে লাগাতে ভবিষ্যতে বড় শিল্প ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সরকারি সূত্রে খবর, এই খনিজ সম্পদের সন্ধান করেছে ‘অ্যাটমিক মিনারেলস ডিরেক্টরেট ফর এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড রিসার্চ (Atomic Minerals Directorate for Exploration and Research বা AMD)’। এই সংস্থাটি ‘পরমাণু শক্তি বিভাগ (Department of Atomic Energy বা DAE)’ -এর অধীনস্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সংস্থা। 

আরও পড়ুন : India China trade relations | ভারতের অনুরোধে ফের সার, খনিজ ও টানেল মেশিন রফতানি শুরু করবে চিন

AMD-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, ভারতের একাধিক উপকূলীয় রাজ্যে এই ধরনের খনিজ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh)’, ‘ওডিশা (Odisha)’, ‘তামিলনাড়ু (Tamil Nadu)’, ‘কেরল (Kerala)’, ‘মহারাষ্ট্র (Maharashtra)’, ‘গুজরাট (Gujarat)’, ‘পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)’ এবং ‘ঝাড়খণ্ড (Jharkhand)’। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভারী খনিজের মজুত প্রায় ১,৩০৯ মিলিয়ন টন। এই খনিজগুলির মধ্যে রয়েছে ইলমেনাইট (Ilmenite), রুটাইল (Rutile), লিউকোক্সেন (Leucoxene), মোনাজাইট (Monazite), জিরকন (Zircon), গারনেট (Garnet) এবং সিলিম্যানাইট (Sillimanite)। রাজ্যভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, এই খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওডিশা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। অন্ধ্রপ্রদেশে মোট ভারী খনিজ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৫৯.৭৯ মিলিয়ন টন, যা দেশের মধ্যে অন্যতম বেশি। অন্যদিকে ওডিশায় রয়েছে প্রায় ৩৫১.৩৬ মিলিয়ন টন খনিজ সম্পদ।

তামিলনাড়ুতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খনিজ মজুত রয়েছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ৩৩০.৬৪ মিলিয়ন টন। এছাড়া কেরলে রয়েছে প্রায় ২৪২.৮৮ মিলিয়ন টন ভারী খনিজ সম্পদ। এই চারটি উপকূলীয় রাজ্য মিলেই ভারতের বিচ স্যান্ড মিনারেল সম্পদের বড় অংশ গঠন করেছে। এর পাশাপাশি মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খণ্ডেও সীমিত পরিমাণে এই ধরনের খনিজ পাওয়া গেছে। যদিও পরিমাণ তুলনামূলক কম, তবু ভবিষ্যতের শিল্পক্ষেত্রে এগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই এই সম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছে যে খনিজসমৃদ্ধ উপকূলীয় রাজ্যগুলিতে বিশেষ ‘রেয়ার আর্থ করিডর (Rare Earth Corridors)’ গড়ে তোলা হবে।

এই করিডোর তৈরির মূল লক্ষ্য হল খনিজ উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ, গবেষণা এবং শিল্প উৎপাদনের জন্য একটি সমন্বিত পরিকাঠামো তৈরি করা। বিশেষ করে ‘নিওডিমিয়াম-প্রাসিওডিমিয়াম (NdPr)’ এবং ‘স্যামারিয়াম (Samarium)’ অক্সাইড উৎপাদন বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হবে। এই ধরনের রেয়ার আর্থ উপাদান আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চুম্বক, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং উন্নত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি তৈরিতে এগুলির ব্যবহার ব্যাপক।

সরকারি সূত্রে খবর, এই করিডোর তৈরি হলে ভারত শুধু খনিজ উত্তোলনেই নয়, বরং খনিজ প্রক্রিয়াকরণ ও মূল্য সংযোজন শিল্পেও বড় ভূমিকা নিতে পারবে। একই সঙ্গে টাইটানিয়াম (Titanium) এবং জিরকোনিয়াম (Zirconium) -এর মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের শিল্পও বিকাশ লাভ করবে। ভারতে রেয়ার আর্থ উপাদানের অন্যতম প্রধান উৎস হল ‘মোনাজাইট (Monazite)’। এই খনিজ সাধারণত উপকূলীয় বালির সঙ্গে অন্যান্য ভারী খনিজের সঙ্গে মিশে থাকে। তবে মোনাজাইট উত্তোলন একটি জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোনাজাইটে তেজস্ক্রিয় উপাদান থাকায় এর উত্তোলনে কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। ফলে এই খনিজ উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি অনুমোদন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়।

AMD-এর অনুমোদিত খনি পরিকল্পনার ভিত্তিতেই মোনাজাইট উত্তোলন করা হয়। পাশাপাশি পরিবেশগত নিয়ম, উপকূলীয় এলাকার জনবসতি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে এই কাজ অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। সরকারি সূত্রে উল্লেখ, কোনও উপকূলীয় অঞ্চলে রেয়ার আর্থ খনিজ উত্তোলনের জন্য সম্ভাব্য খনি ইজারা দেওয়া থেকে শুরু করে সমস্ত আইনি অনুমোদন পাওয়া এবং প্রকৃত খনি চালু হওয়া পর্যন্ত প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে AMD নতুন খনিজ সম্পদের সন্ধানে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। অন্ধ্রপ্রদেশের ‘ড. আম্বেদকর কোনাসীমা জেলা (Dr. Ambedkar Konaseema district)’, ওডিশার ‘পুরী জেলা (Puri district)’ এবং তামিলনাড়ুর ‘থুথুকুড়ি জেলাতে (Thoothukudi district)’ উপকূলীয় বালিতে মোনাজাইটের নতুন মজুত খুঁজে বের করার কাজ চলছে।

এর পাশাপাশি রাজস্থানের জোধপুর, বালোটরা ও উদয়পুর, গুজরাটের ছোটাউদেপুর, তামিলনাড়ুর সেলম এবং তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গল ও সূর্যাপেট জেলায় কঠিন শিলা অঞ্চলেও রেয়ার আর্থ উপাদানের অনুসন্ধান করা হচ্ছে। লোকসভায় ‘ড. জিতেন্দ্র সিং (Dr. Jitendra Singh)’ বলেন, ‘ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে যে বিপুল খনিজ সম্পদ রয়েছে, তা দেশের শিল্প ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তাঁর মতে, রেয়ার আর্থ করিডর তৈরি হলে ভারত বৈশ্বিক খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার করা যায়, তবে ভবিষ্যতে ভারত রেয়ার আর্থ প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ শিল্পে একটি বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Canada energy partnership | ভারত-কানাডা সম্পর্কে নতুন গতি: জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, শিক্ষা ও নিরাপত্তায় বিস্তৃত রূপরেখা ঘোষণা

Sasraya News
Author: Sasraya News