সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি উন্নয়ন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করতে একাধিক উচ্চপ্রভাব গবেষণা প্রকল্প চালু করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কোয়ান্টাম (Quantum) প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনের নতুন পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। সম্প্রতি লোকসভায় এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী ‘ড. জিতেন্দ্র সিং (Dr. Jitendra Singh)’ এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, ‘উচ্চপ্রভাব গবেষণার ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেম এবং নতুন প্রজন্মের যোগাযোগ প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকার।’
কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, ভারতের বৈজ্ঞানিক গবেষণার নতুন দিগন্ত হিসেবে উঠে এসেছে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি। এই লক্ষ্য পূরণে ‘ন্যাশনাল কোয়ান্টাম মিশন (National Quantum Mission)’ -এর অধীনে দেশের বিভিন্ন শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ থিম্যাটিক হাব তৈরি করা হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলির কাজ হল গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই মিশনের অধীনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ থিম্যাটিক হাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘কোয়ান্টাম কম্পিউটিং (Quantum Computing)’ গবেষণার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (Indian Institute of Science বা IISc)’ বেঙ্গালুরুতে। এই কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য উন্নতমানের কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তি তৈরি এবং সেই ক্ষেত্রে গবেষণা সম্প্রসারণ। অন্যদিকে ‘কোয়ান্টাম কমিউনিকেশন (Quantum Communication)’ বিষয়ক গবেষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি মাদ্রাজকে (Indian Institute of Technology Madras বা সংক্ষেপে IIT Madras)’, যেখানে সহযোগিতা করছে ‘সি-ডট (Centre for Development of Telematics বা C-DOT)’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নিরাপদ যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এছাড়াও ‘কোয়ান্টাম সেন্সিং অ্যান্ড মেট্রোলজি (Quantum Sensing & Metrology)’ বিষয়ক গবেষণা পরিচালনা করছে ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি বোম্বে (Indian Institute of Technology Bombay বা IIT Bombay)’। এই ক্ষেত্রটি মূলত অত্যন্ত সংবেদনশীল সেন্সর এবং নির্ভুল পরিমাপ প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ‘কোয়ান্টাম ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড ডিভাইসেস (Quantum Materials & Devices)’ নিয়ে গবেষণার কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি দিল্লিতে (Indian Institute of Technology Delhi বা IIT Delhi)’। এখানে উন্নত উপাদান ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি তৈরি নিয়ে কাজ চলছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর লোকসভায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চারটি কেন্দ্র শুধু গবেষণাই করবে না, পাশাপাশি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ এবং শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে যৌথ সহযোগিতাও গড়ে তুলবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক স্তরের গবেষণা সহযোগিতাও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতে একটি শক্তিশালী কোয়ান্টাম উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম তৈরি করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা, তথ্য নিরাপত্তা, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং উন্নত কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। এদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ‘ন্যাশনাল মিশন অন ইন্টারডিসিপ্লিনারি সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমস (National Mission on Interdisciplinary Cyber-Physical Systems বা NM-ICPS)’ চালু করা হয়েছে। এই মিশনের লক্ষ্য হল উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেম তৈরি করা। সরকারি তথ্য বলছে , এই মিশনের আওতায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘টেকনোলজি ইনোভেশন হাব (Technology Innovation Hubs বা TIHs)’ স্থাপন করা হয়েছে। এই হাবগুলিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেম প্রযুক্তি ভবিষ্যতের শিল্পক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। স্মার্ট কারখানা, স্বয়ংচালিত যানবাহন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং স্মার্ট শহর গড়ে তুলতে এই প্রযুক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনকে আরও শক্তিশালী করতে ‘অনুসন্ধান ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (Anusandhan National Research Foundation বা ANRF)’ একাধিক মিশনভিত্তিক গবেষণা প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে ড্রোন প্রযুক্তি, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ৬জি যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং ‘লিপফ্রগ ডেমোনস্ট্রেটর’ প্রকল্প। উল্লেখ্য, এই উদ্যোগগুলির লক্ষ্য হল সমস্যাভিত্তিক এবং বাস্তবমুখী গবেষণা উৎসাহিত করা। অর্থাৎ শুধুমাত্র তাত্ত্বিক গবেষণা নয়, বরং এমন প্রযুক্তি উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে যা বাস্তব জীবনে ব্যবহার করা সম্ভব।
লোকসভায় ‘ড. জিতেন্দ্র সিং (Dr. Jitendra Singh)’ বলেন, ‘ভারতকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিতে হলে উচ্চপ্রভাব গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।’ তাঁর মতে, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেম এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ ভবিষ্যতে দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে। বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ ভারতের গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় ভারতের অবস্থান আরও মজবুত হতে পারে।
ছবি :সংগৃহীত
আরও পড়ুন : World’s Largest Grain Storage Plan India | সমবায় খাতে বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্যশস্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা, PACS-এর মাধ্যমে গ্রামেই তৈরি হবে আধুনিক গুদাম, সংসদে জানালেন কেন্দ্রীয় সমবায় মন্ত্রী




