সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সমবায় আন্দোলন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে আসছে। কৃষি, বিপণন, দুগ্ধ, মৎস্য, বস্ত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমবায় সমিতির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় উপস্থাপিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে সমবায় ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান (Job creation through cooperative societies) তৈরি হয়েছে এবং আগামী দিনে এই ক্ষেত্র আরও বড় কর্মসংস্থানের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। এই তথ্য রাজ্যসভায় লিখিত উত্তরে প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সমবায় মন্ত্রী ‘অমিত শাহ (Amit Shah)’। তিনি জানান, ‘দেশের বিভিন্ন রাজ্যে সমবায় সমিতির বিস্তারের ফলে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায় বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’ সরকারি পোর্টাল ‘ন্যাশনাল কোঅপারেটিভ ডেটাবেস (National Cooperative Database বা NCD)’ –এর তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সারা দেশে সমবায় সংস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, সমবায় ব্যবস্থার আওতায় বিভিন্ন রাজ্যে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ‘রাজস্থান (Rajasthan)’ রাজ্যে ১৯,৩৭৩টি সমবায় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৫,৮১,৩২৮ জন মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একইভাবে ‘পাঞ্জাব (Punjab)’ রাজ্যে ৭,৮৮৫টি সমবায় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ২,৬৬,৯৯০ জন মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।
দক্ষিণ ভারতের ক্ষেত্রেও সমবায় ব্যবস্থার প্রভাব সামনে এসেছে। ‘তামিলনাড়ু (Tamil Nadu)’ রাজ্যে ১০,৭১৯টি সমবায় সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ১৪,৬৮,৭২০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আবার ‘তেলেঙ্গানা (Telangana)’ রাজ্যে ২,২৭৩টি সমবায় সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৭১,৮২৫ জন মানুষ সরাসরি কাজের সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া আরও বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। উত্তর ভারতের বৃহত্তম রাজ্যগুলির মধ্যে ‘উত্তর প্রদেশ (Uttar Pradesh)’ এ সমবায় কাঠামোর মাধ্যমে বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১৬,০৩১টি সমবায় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৫,১২,৫৬৭ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট খাতে আরও লক্ষাধিক মানুষ কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যেও সমবায়ের প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়ছে। ‘পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)’ রাজ্যে ২,৩০৪টি সমবায় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩৮,২৭৯ জন মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি খাতে প্রায় ৬১,৭০৬ জন এবং অন্য একটি ক্ষেত্রে ১১,৩১১ জন মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সরকারি তথ্য জানাচ্ছে।
আরও পড়ুন: মোবাইল রিচার্জের দাম ঊর্ধ্বমুখী: ভারতে বাড়ছে ডিজিটাল খরচের চাপ,বিপাকে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার
ছোট রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির ক্ষেত্রেও সমবায় ব্যবস্থা কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে। যেমন ‘সিকিম (Sikkim)’ রাজ্যে ৪৬১টি সমবায় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১১,৯৮৭ জন মানুষের কাজের সুযোগ হয়েছে। ‘ত্রিপুরা (Tripura)’ রাজ্যে ৩৪২টি সমবায় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৫,৮০৭ জন মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১,৫৭,২২৯টি সমবায় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৩৪ লক্ষেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য খাতে আরও প্রায় ৩৮ লক্ষ এবং প্রায় ৮৪ লক্ষ মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সমবায় ব্যবস্থার মাধ্যমে মোট কর্মসংস্থানের সংখ্যা কয়েক কোটিতে পৌঁছেছে বলে সরকারি তথ্য ইঙ্গিত করছে। শুধু কর্মসংস্থান নয়, সমবায় খাতে আর্থিক সহায়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ন্যাশনাল কোঅপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (National Cooperative Development Corporation বা NCDC)’ গত চার বছরে বিভিন্ন খাতে বিপুল আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট প্রায় ৪১,০৩১ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬০,৬১৮ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সমবায় খাতে আর্থিক সহায়তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯৫,১৮২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সেই সংখ্যা ইতিমধ্যেই প্রায় ১,১১,৫১৩ কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে। এই বিপুল বিনিয়োগ সমবায় খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপণন বা মার্কেটিং (Marketing) খাতে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এই খাতে কয়েক বছরে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চিনি কারখানা, বস্ত্র শিল্প, প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কোল্ড চেইন অবকাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হয়েছে। দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সমবায় খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মৎস্য, দুগ্ধ ও পশুপালন, হ্যান্ডলুম, তফসিলি উপজাতি সমবায় এবং নারী সমবায়ের মতো ক্ষেত্রেও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং ছোট উৎপাদকদের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
সংসদে অমিত শাহ (Amit Shah) বলেন, ‘সমবায় আন্দোলনকে শক্তিশালী করা হলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি আরও মজবুত হবে এবং বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।’ তাঁর মতে, সরকারের লক্ষ্য হল সমবায় খাতকে আধুনিক প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা। অর্থনীতিবিদদের মতে, সমবায় ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ভারতের মতো বৃহৎ কৃষিনির্ভর দেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ব্যবস্থা ছোট কৃষক, মৎস্যজীবী, কারিগর এবং গ্রামীণ শ্রমিকদের সংগঠিত অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে সাহায্য করে। ফলে আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হয় এবং গ্রামীণ উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। বিশেষকরা মনে করছেন, আগামী কয়েক বছরে সমবায় খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বাড়লে কর্মসংস্থানের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে এবং দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত




