প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বন্ধুদের আড্ডা, অফিস পার্টি কিংবা কোনও বিশেষ উদ্যাপন, মদ্যপান শুরুর আগে একসঙ্গে গ্লাস ঠেকিয়ে ‘চিয়ার্স’ বলার দৃশ্য এখন বিশ্বজোড়া পরিচিত। কলকাতা থেকে লন্ডন, নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি একই ছবি। কিন্তু এই ‘চিয়ার্স’ (Cheers) শব্দটির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অপ্রত্যাশিত ইতিহাস। অনেকের ধারণা, এটি নিছক ভদ্রতা বা সামাজিক রীতি। বাস্তবে এর শিকড় নাকি গাঁথা রাজদরবারের ষড়যন্ত্র আর প্রাণরক্ষার কৌশলের সঙ্গে। সেটা কেমন? ইতিহাসবিদদের মতে, বহু শতাব্দী আগে যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে রাজতন্ত্রের দাপট ছিল, তখন এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে নিমন্ত্রণ ছিল রাজনৈতিক কূটচালের অংশ। এক রাজা আরেক রাজার সঙ্গে আপাত সৌহার্দ্য দেখালেও অন্তরে লুকিয়ে থাকত শত্রুতা। বিশেষ করে মধ্যযুগীয় ইউরোপের রাজদরবারে এই ধরনের চক্রান্তের নজির পাওয়া যায়। সে সময় ভোজসভায় মদ পরিবেশন ছিল নিয়মিত ব্যাপার, আর সেখানেই তৈরি হত ভয়াবহ ফাঁদ।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক কাহিনিতে উল্লেখ আছে, আমন্ত্রিত অতিথির সুরাপাত্রে গোপনে বিষ মিশিয়ে দেওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক ছিল না। রাজ্য দখল, প্রতিশোধ বা ক্ষমতার লড়াই, এসবের জেরে বিষ প্রয়োগ ছিল এক পরিচিত অস্ত্র। ফলে অতিথি রাজা বা অভিজাতরা কখনওই পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে পান করতে পারতেন না। এই আশঙ্কা থেকেই জন্ম নেয় একটি অভিনব প্রথা, সবাই একসঙ্গে নিজেদের গ্লাস ঠেকিয়ে পান শুরু করা। শুধু আলতো করে ঠেকানো নয়, সে সময় নাকি জোরে ধাক্কা দিয়ে সুরাপাত্র একে অপরের সঙ্গে আঘাত করা হত। উদ্দেশ্যও ছিল স্পষ্ট, এক পাত্রের তরল অন্য পাত্রে ছলকে পড়ে মিশে যাক। যদি কারও গ্লাসে বিষ মেশানো থাকে, তবে সেই বিষ অন্যদের পানীয়তেও মিশে যাবে। এতে যে ব্যক্তি বিষ মিশিয়েছেন, তিনি নিজেই সেই পানীয় এড়িয়ে যেতে পারবেন না। কারণ তিনি পান না করলে সন্দেহের উদ্রেক হবে। এই পারস্পরিক মিশ্রণই একপ্রকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত।
এভাবে গ্লাস ঠোকাঠুকির মাধ্যমে একধরনের ‘পারস্পরিক আস্থা’ প্রদর্শিত হত। প্রত্যেকে দেখাতে চাইতেন যে তাঁর পানীয় নিরাপদ, এবং তিনি অন্যদের মতোই একই ঝুঁকি নিচ্ছেন। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়। রাজদরবারের সীমা পেরিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। আবার ‘চিয়ার্স’ শব্দটির উৎস নিয়েও রয়েছে আলাদা ইতিহাস। ইংরেজি ‘Cheers’ শব্দটি মূলত আনন্দ, শুভেচ্ছা বা উৎসাহ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হত। পরবর্তীকালে পানীয়ের সঙ্গে এটি জুড়ে যায়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই রীতির ভিন্ন ভিন্ন শব্দ রয়েছে। যেমন : জার্মানিতে ‘প্রোস্ট’ (Prost), ফ্রান্সে ‘সঁতে’ (Santé), ইতালিতে ‘চিন চিন’ (Cin Cin)। কিন্তু গ্লাস ঠোকানোর অভ্যাসটি প্রায় সর্বত্রই একই।
ভারতীয় উপমহাদেশেও এই প্রথা উপনিবেশিক যুগে আরও জনপ্রিয় হয়। ব্রিটিশ শাসনের সময়ে ইউরোপীয় সামাজিক আচার-আচরণ শহুরে সংস্কৃতিতে জায়গা করে নেয়। কলকাতা, যা একসময় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল, সেখানে ক্লাব সংস্কৃতির উত্থানের সঙ্গে ‘চিয়ার্স’ বলার রীতি ছড়িয়ে পড়ে। আজকের দিনে তা কেবল মদ্যপানেই সীমাবদ্ধ নয়; কখনও সফট ড্রিংক বা জুস নিয়েও মানুষ একইভাবে উদ্যাপন করে। কিন্তু, আধুনিক কালে গ্লাস ঠোকানোর ধরন অনেকটাই প্রতীকী। এখন আর কেউ জোরে ধাক্কা দিয়ে তরল মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন না। এটি সৌহার্দ্য, একাত্মতা ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার প্রকাশ। কেউ জন্মদিনে, কেউ সাফল্যের আনন্দে, কেউবা নতুন বছরের কাউন্টডাউনে সব ক্ষেত্রেই ‘চিয়ার্স’ যেন এক অভিন্ন শব্দবন্ধ। আবার আচরণবিজ্ঞানীরা মনে করেন, একসঙ্গে একই শব্দ উচ্চারণ ও একই কাজ করার মধ্যে দলগত সংযোগের অনুভূতি তৈরি হয়। গ্লাস ঠোকানোর মুহূর্তে সবাই একসঙ্গে চোখে চোখ রাখে, হাসে, শব্দ তোলে এতে সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়। যদিও এর সূচনা হয়েছিল সন্দেহ ও ভয়ের আবহে, সময়ের স্রোতে তা রূপ নিয়েছে উদ্যাপনের চিহ্নে।
আজকের প্রজন্ম হয়ত ভাবেনি, পার্টির শুরুতে ‘চিয়ার্স’ বলার মধ্যে লুকিয়ে আছে রাজদরবারের রোমাঞ্চকর অতীত। অথচ এই ছোট্ট আচার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতি কীভাবে সময়ের সঙ্গে বদলায়, অথচ তার ভিতরে রয়ে যায় ইতিহাসের ছাপ। রাজা-রাজড়াদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে আধুনিক বন্ধুত্বের টেবিল, গ্লাসে গ্লাস ঠোকানোর পথচলা সত্যিই বিস্ময়কর। সুতরাং, পরের বার যখন বন্ধুদের সঙ্গে গ্লাস ঠেকিয়ে ‘চিয়ার্স’ বলবেন, তখন মনে রাখতে পারেন : এটি শুধু আনন্দের শব্দ নয়; একসময় এটি ছিল বেঁচে থাকার কৌশলও।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী।
আরও পড়ুন : Elon Musk Partner Indian Origin | মাস্ক জানালেন তাঁর সঙ্গিনীর শিকড় ভারতে, ‘ইন্ডিয়ান অরিজিন’ পরিচয় ঘিরে আলোচনা তুঙ্গে




