সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মেদিনীপুর : পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির অন্দরমহলে নতুন করে জল্পনা ও বিতর্কের সূত্রপাত। প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh) যখন ফের সংগঠনের পরিসরে সক্রিয় হয়ে উঠছেন, ঠিক সেই সময়েই তাঁর স্ত্রী রিঙ্কু মজুমদার (Rinku Majumdar) প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিলেন দলের একাংশের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, বঙ্গ বিজেপির বর্তমান সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Shamik Bhattacharya) -এর সঙ্গে দেখা না হওয়া নিয়ে সরাসরি অসন্তোষ জানিয়ে তিনি রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। শুক্রবার মেদিনীপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন দিলীপ ঘোষ। তিনি নিজে প্রকাশ্যে খুব বেশি কিছু না বললেও সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রিঙ্কু মজুমদার একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। জানা গিয়েছে, আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করে ইতিমধ্যেই নিজের বায়োডাটা জমা দিয়েছেন তিনি। মেদিনীপুর, বীজপুর ও নিউটাউন এই তিনটি কেন্দ্রের জন্য আবেদন করেছেন রিঙ্কু। প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘টিকিট পাওয়া না পাওয়া আমার হাতে নেই। আমি শুধু ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারি। জেতার মতো পরিস্থিতি থাকলেই লড়তে চাই। শুধু দাঁড়ানোর জন্য দাঁড়াতে চাই না। সম্ভাবনা পঞ্চাশ-পঞ্চাশ ধরেই এগোচ্ছি।’ তাঁর কথায় স্পষ্ট, তিনি আত্মবিশ্বাসী হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন।
এরপরই দলের অন্দরের ক্ষোভ সামনে আনেন রিঙ্কু। তাঁর বক্তব্য, ‘এত বছর ধরে সক্রিয় থাকার পরেও আমাকে কোনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। পঞ্চায়েত তো দূরের কথা, মণ্ডল স্তরেও জায়গা পাইনি। আমাদের মতো স্পষ্ট বক্তা মানুষদের রাজনীতিতে খুব একটা পছন্দ করা হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যাঁরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কাজ বাস্তবায়ন করতে পারেন, তাঁদের অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে সাইড করে রাখা হয়।’ এই মন্তব্য ঘিরেই রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়েছে। বিজেপির অন্দরে কি সত্যিই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বাড়ছে? দিলীপ ঘোষের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের প্রেক্ষাপটে তাঁর ঘনিষ্ঠ বলয়ে অসন্তোষ কি নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিঙ্কুর মন্তব্যকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, তিনি শুধু দিলীপ ঘোষের স্ত্রী নন, দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত। রিঙ্কুর আরও বক্তব্য, ‘দলের ভিতরে যদি নিজের মত প্রকাশ করতে না পারি, তবে বিরোধীদের সঙ্গে লড়ব কীভাবে? মন খুলে কথা বললে যদি কেউ আমাকে ব্ল্যাকলিস্ট করে দেয়, তাতেও আমার কিছু যায় আসে না।’ তাঁর দাবি, তিনি কখনও কোনও অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং সর্বদা সতর্ক থেকেছেন যাতে তাঁর দ্বারা কোনও ভুল না হয়।
রাজনীতির বাস্তবতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করতে গেলে মিথ্যা বলা, অভিনয় করা, ম্যানিপুলেশন জানা দরকার এই ধারণা অনেকের। কিন্তু এগুলো আমার অভিধানে নেই।’ তাঁর এই মন্তব্যকে অনেকেই দলের বর্তমান কৌশল নিয়ে পরোক্ষ সমালোচনা হিসেবে দেখছেন। সবচেয়ে বেশি চর্চায় এসেছে শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা না হওয়ার প্রসঙ্গ। রিঙ্কু জানান, ‘রাজ্য সভাপতির পিএ-এর সঙ্গে দু’দিন কথা বলেছি। একদিন অফিসে গিয়েছিলাম, দেখা হল না। পরের দিনও অপেক্ষা করতে হয়েছে। এটা আমার কাছে অপমানজনক লেগেছে। দু’দিন অফিসে বসে থেকেও সময় পেলেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামী কাউকে নিরাশ করে ফেরান না। কিন্তু আমি আর সেখানে যাইনি। আমার সিভি অন্যের মাধ্যমে পাঠিয়েছি।’ এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, দলীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় কি কোনও ঘাটতি রয়েছে? নাকি ব্যক্তিগত অভিমানই বড় হয়ে উঠেছে? বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের তরফে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, রিঙ্কু মজুমদার দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কখনও বড় মাপের পদ পাননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘যাঁদের মধ্যে সম্ভাবনা থাকে, তাঁদের সামনে আনা হয় না। একটা টিম কাজ করে যাতে তাঁরা উপরে উঠতে না পারেন।’ এই অভিযোগ দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত বহন করছে বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
দিলীপ ঘোষের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন জল্পনা তুঙ্গে। তিনি বিজেপির রাজ্য সভাপতি হিসেবে একসময় সংগঠনকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছিলেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা থাকলেও রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা ফের বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে রিঙ্কুর মন্তব্য দলীয় সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। সমগ্র ঘটনায় পরিষ্কার, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির অন্দরে অন্তর্দ্বন্দ্ব, টিকিট বণ্টন এবং নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ, এই তিনটি বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রে। রিঙ্কু মজুমদারের প্রকাশ্য ক্ষোভ কী শুধুই ব্যক্তিগত অভিমান, নাকি বৃহত্তর অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ, তা সময়ই বলবে। তবে রাজনৈতিক মহলে এই বার্তা স্পষ্ট যে, নির্বাচনের আগে বিজেপির ঘরোয়া সমীকরণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে নেতৃত্বকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rinku Singh T20 World Cup | ফিনিশারের গণ্ডি ভাঙতে প্রস্তুত রিঙ্কু সিং, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যে কোনও ব্যাটিং পজিশনে নামার বার্তা ভারতীয় তারকার



