সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দীর্ঘ প্রায় সতেরো মাসের টানাপড়েনের পর অবশেষে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। কূটনৈতিক অচলাবস্থার আবহে যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক সময় অস্বস্তির মোড় নিয়েছিল, তা ফের স্বাভাবিকতার পথে ফিরছে, এমনই ইঙ্গিত মিলছে কূটনৈতিক মহল থেকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন পরিস্থিতিতে ভারত বাংলাদেশে সব ধরনের ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু করার প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে ভারত-বাংলাদেশ ভিসা পরিষেবা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও পর্যটন, সব ক্ষেত্রেই নতুন গতি আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) ইস্তফা দেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক নানা ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জেরে ভারত বাংলাদেশে ভিসা প্রদান প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। মেডিক্যাল ভিসা এবং ডবল-এন্ট্রি ভিসা ছাড়া অধিকাংশ বিভাগেই পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল। এতে সাধারণ যাত্রী, পর্যটক, শিক্ষার্থী এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। বর্তমানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। তারেক রহমান (Tarique Rahman) নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসনের আমলে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কূটনীতিকরা। সিলেটে নিযুক্ত ভারতের কনস্যুলার অনিরুদ্ধ দাস (Aniruddha Das) এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘পর্যটক-সহ সব ধরনের ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।’ তাঁর কথায়, ‘ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মর্যাদার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। সেই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে ভিসা পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’ বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম ‘বিবিনিউজ২৪’ (BBNews24) -এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, খুব শীঘ্রই ভারত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পূর্ণমাত্রায় ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু করতে পারে। ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলেও সূত্রের খবর। এতে করে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটনের ক্ষেত্রে দুই দেশের মানুষের যাতায়াত অনেক সহজ হবে।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) দেশ ছাড়ার পর বাংলাদেশে অবস্থিত সমস্ত ‘ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার’ (Indian Visa Application Center) সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় ভারত। নিরাপত্তাজনিত কারণে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানানো হয়। পরে ধাপে ধাপে কিছু পরিষেবা চালু হলেও পূর্ণমাত্রায় ভিসা দেওয়া হচ্ছিল না। এর ফলে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অসমের ব্যবসায়ী মহল ক্ষতির মুখে পড়ে। বাংলাদেশে ছাত্রনেতা ওসমান হাদি (Osman Hadi) -এর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে নতুন করে অশান্তি শুরু হয়, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। গত বছরের শেষ দিকে অস্থিরতার জেরে নয়াদিল্লি বাংলাদেশে অবস্থিত একাধিক ভিসা কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ঢাকাও ভারতে তাদের ভিসা কেন্দ্র অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দেয়। ফলে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন প্রকাশ্যে চলে আসে।
কূটনৈতিক মহল সূত্রে খবর, বর্তমানে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রের মতে, নতুন প্রশাসনের সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগ বাড়ছে। বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় এই তিন ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিয়ে দুই দেশই সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত নিরাপত্তা, জলবণ্টন, জ্বালানি সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক লেনদেন সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন চিকিৎসা ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতে আসতে চাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকরা। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক রোগী কলকাতা, চেন্নাই ও দিল্লির বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন। একই ভাবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। পর্যটনের ক্ষেত্রেও আগ্রহ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বৌদ্ধ ও ঐতিহাসিক পর্যটন, ধর্মীয় ভ্রমণ এবং ব্যবসায়িক সফর সমস্ত মিলিয়ে দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ বাড়বে। অনিরুদ্ধ দাস (Aniruddha Das) আরও বলেন, ‘দু’দেশের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। ভিসা পরিষেবা সহজ হলে সেই বন্ধন আরও মজবুত হবে।’ কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন। উল্লেখ্য, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক নতুন অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। দীর্ঘ অচলাবস্থার পর পূর্ণমাত্রায় ভিসা পরিষেবা চালু হলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দেবে। তারেক রহমান (Tarique Rahman) -এর আমলে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী রূপ পায়, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে, সহজ হবে যাতায়াত, বাড়বে বাণিজ্য, মজবুত হবে বন্ধুত্ব।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Tabu father surname, Tabu personal life | তাবাসসুম ফাতিমা থেকে তাবু, বাবার পরিচয় মুছে ফেলার কঠিন সিদ্ধান্তের কারণ কী?




