সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লী : নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিল দেশের শীর্ষ আদালত। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির অভিযোগে রাজ্য পুলিশকে কড়া বার্তা দিল Supreme Court of India। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে রাজ্য পুলিশের ডিজি পীযূষ পাণ্ডের (Piyush Pandey) বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হতে পারে। একই সঙ্গে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা হলফনামা আকারে আদালতে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবারের শুনানিতে এসআইআর মামলায় কমিশনের তরফে দাবি করা হয়, পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি ক্রমশ অস্থির হচ্ছে এবং প্রশাসনিক সহযোগিতা যথেষ্ট নয়। কমিশনের বক্তব্য, ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি আমাদের কাজকে প্রভাবিত করছে।’ এই প্রেক্ষিতে আদালত জানতে চায়, অভিযোগ ওঠার পর থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশ, পরবর্তী শুনানির আগে ডিজি-কে বিস্তারিত হলফনামা জমা দিতে হবে। তাতে বর্তমান পরিস্থিতি, গৃহীত পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উল্লেখ থাকতে হবে।
এর আগের শুনানিতেই ডিজি পীযূষ পাণ্ডেকে (Piyush Pandey) শো-কজ় করেছিল আদালত। অভিযোগ ছিল, রাজ্যের কয়েকটি এলাকায় এসআইআর সংক্রান্ত আপত্তিপত্রের ফর্ম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, অথচ সেই বিষয়ে এফআইআর দায়ের হয়নি। আদালত তখন প্রশ্ন তোলে, প্রশাসন কেন সক্রিয় হয়নি। সেই সূত্রেই ডিজি-র জবাবদিহি চাওয়া হয়। শুক্রবারের শুনানিতে ডিজি-র আইনজীবী আদালতে সওয়াল করে জানান, কমিশনের অভিযোগ ‘অতিরঞ্জিত ও অসত্য’। তবে আদালত সেই যুক্তি মেনে নেয়নি। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant) কমিশনকে প্রশ্ন করেন, ‘পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সমস্যা কোথায়?’ উত্তরে কমিশনের তরফে জানানো হয়, মামলা বিচারাধীন থাকায় তারা কিছু ক্ষেত্রে দ্বিধায় রয়েছে। একই সঙ্গে এসআইআর কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি এনভি অঞ্জরিয়ার (NV Anjaria) বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। বেঞ্চ জানায়, ‘রাজ্যের ভূমিকায় আমরা হতাশ।’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, রাজ্য সরকার ও কমিশনের মধ্যে আস্থার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরকে কেন্দ্র করে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ আদালত আরও নির্দেশ দেয়, রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকরা আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার জন্য বিশেষ দায়িত্বে থাকবেন। পরবর্তী শুনানির আগে যদি নতুন করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে, তা-ও হলফনামায় উল্লেখ করতে হবে। সূত্রের খবর, মার্চের প্রথম সপ্তাহে এই মামলার পরবর্তী শুনানি হতে পারে।
এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নির্বাচন কমিশনের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভুয়ো বা অপ্রাসঙ্গিক নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন যোগ্য ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর, বিক্ষোভ ও প্রশাসনিক বিতর্ক সামনে এসেছে। ফলে বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। আইনজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা রাজ্য সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আদালতের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি প্রশাসনের উপর চাপ বাড়াবে বলেই মত তাঁদের। এক আইনজীবীর কথায়, ‘শীর্ষ আদালত বুঝিয়ে দিল, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনও রকম বাধা বরদাস্ত করা হবে না।’ রাজনৈতিক মহলেও এই নির্দেশ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় তদারকি প্রয়োজন। অন্যদিকে শাসক শিবিরের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আদালতে তার যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া হবে।
এই মামলার পরবর্তী শুনানিতে ডিজি পীযূষ পাণ্ডের (Piyush Pandey) হলফনামা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আদালত স্পষ্ট করেছে, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি অবনতির পুনরাবৃত্তি হলে ব্যক্তিগতভাবে ডিজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ফলে প্রশাসনিক মহলে চাপ বেড়েছে। কিন্তু, এসআইআর বিতর্কে সুপ্রিম কোর্টের কড়া অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে বড় বার্তা দিল। নির্বাচন প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আদালত যে আপসহীন, তা এদিনের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট। এখন নজর মার্চের প্রথম সপ্তাহের শুনানির দিকে, সেখানে হলফনামা জমা দিয়ে কী ব্যাখ্যা দেয় রাজ্য পুলিশ, সেটাই নির্ধারণ করবে পরবর্তী আইনি পথ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : SIR Final List 2026: গুজরাটে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ, বাদ ৭৭ লক্ষেরও বেশি নাম, স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর




