সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লী : বিবাহের প্রতিশ্রুতি, সহবাস, সম্মতি এবং আইনি দায় এই চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করল দেশের শীর্ষ আদালত Supreme Court of India। একটি মামলার শুনানিতে আদালত যুগলদের সতর্ক করে জানাল, ‘বিয়ে না-হওয়া পর্যন্ত কাউকে বিশ্বাস করবেন না।’ বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, বিয়ের আগে ছেলে ও মেয়ে উভয়েই একে অপরের কাছে ‘সম্পূর্ণ অপরিচিত’। ফলে বিবাহপূর্ব শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকা জরুরি।
ঘটনার সূত্রপাত বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাসের অভিযোগে। এক তরুণী অভিযোগ করেন, একজন যুবক তাঁকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কে জড়ান এবং পরবর্তীতে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। অভিযোগের ভিত্তিতে যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়। শুনানিতে উঠে আসে, ২০২২ সালে একটি ম্যাট্রিমোনিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাঁদের পরিচয়। প্রথমে দিল্লিতে সাক্ষাৎ, পরে দু’জনে একসঙ্গে দুবাই ভ্রমণ করেন। সেখানেই তাঁদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় বলে অভিযোগ। মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে বিচারপতি বিভি নাগরত্ন (BV Nagarathna) এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঞা (Ujjal Bhuyan) -এর বেঞ্চে। শুনানির সময় আদালত বিশেষভাবে প্রশ্ন তোলে তরুণীর দুবাই সফর নিয়ে। বিচারপতিরা জানতে চান, যদি অভিযোগকারী এতটাই সতর্ক অবস্থানে থাকেন, তবে বিয়ের আগে বিদেশযাত্রা ও ঘনিষ্ঠতা কেন? বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, নথিপত্র অনুযায়ী শারীরিক সম্পর্ক ‘পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই’ হয়েছিল।
বিচারপতি নাগরত্ন মন্তব্য করেন, ‘হয়ত আমাদের সেকেলে মনে হতে পারে, কিন্তু বিয়ের আগে পর্যন্ত এক জন ছেলে ও এক জন মেয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত। শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি না, বিয়ের আগে কীভাবে এমন সম্পর্ক স্থাপিত হল, সম্পর্ক যত গভীরই হোক না কেন। বিয়ের আগে কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়।’ আদালতের এই মন্তব্য ঘিরে আইন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাসের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা নতুন নয়। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আদালতকে খতিয়ে দেখতে হয়— অভিযুক্তের উদ্দেশ্য শুরু থেকেই প্রতারণামূলক ছিল কি না। যদি প্রমাণিত হয় যে অভিযুক্ত ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন, তবে তা গুরুতর অপরাধ। কিন্তু যদি সম্পর্ক প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন মানুষের সম্মতিতে গড়ে ওঠে এবং পরে কোনও কারণে বিয়ে না-হয়, তা হলে প্রতিটি ঘটনাকেই ‘ধর্ষণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
এই মামলায় বেঞ্চের প্রাথমিক মত, বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করার মতো উপাদান স্পষ্ট নয়। বিচারপতি নাগরত্ন বলেন, ‘এটি এমন মামলা বলে মনে হচ্ছে না, যেখানে পূর্ণাঙ্গ বিচার চালিয়ে দোষী সাব্যস্ত করা প্রয়োজন।’ বরং উভয় পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে পরামর্শ দেয় আদালত। অভিযুক্তের আইনজীবীকে অভিযোগকারী তরুণীকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীর আইনজীবীকেও মীমাংসার সম্ভাব্য দিকগুলি পর্যালোচনা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী বুধবার আদালতে দু’পক্ষের মতামত জানাতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, এই পর্যবেক্ষণ বিবাহপূর্ব সম্পর্ক ও সম্মতির আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সামাজিক পরিসরে অনেকেই মনে করছেন, আদালত তরুণ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল আচরণের বার্তা দিয়েছে। আবার অন্য অংশের মত, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নৈতিক মন্তব্য বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। আইনজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে পূর্বে জানিয়েছে, ‘সম্মতি’ ও ‘প্রতারণা’ এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। কেবল সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াই অপরাধের প্রমাণ নয়। আদালতকে দেখতে হয়, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় অভিযুক্তের প্রকৃত অভিপ্রায় কী ছিল। এই মামলায় বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ সেই নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একই সঙ্গে আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, বিবাহ একটি সামাজিক ও আইনি প্রতিষ্ঠান। বিয়ের আগে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি বাস্তববোধও জরুরি। বিচারপতি নাগরত্নের কথায়, ‘সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’ তাঁর মন্তব্যে স্পষ্ট, আদালত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে চায় না; তবে আইনি জটিলতা এড়াতে সচেতনতা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। ম্যাট্রিমোনিয়াল ওয়েবসাইট বা সামাজিক মাধ্যমে আলাপ থেকে সম্পর্ক, সেখান থেকে সহবাস, এই ধারায় আইনি প্রশ্নও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ক্ষেত্রে লিখিত প্রমাণ, বার্তা আদানপ্রদান, সাক্ষাৎকারের বিবরণ, সবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আদালতের বিচারে। কিন্তু, শীর্ষ আদালতের এই মন্তব্য ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলার শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে। এখন নজর থাকবে আগামী শুনানিতে মীমাংসার পথে হাঁটবে কী দু’পক্ষ, নাকি মামলা পূর্ণাঙ্গ বিচারের দিকে এগোবে। তবে আপাতত আদালতের বার্তা স্পষ্ট যে, বিবাহপূর্ব শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সম্মতি’ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সতর্কতাও অপরিহার্য।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Supreme Court DA verdict West Bengal | সুপ্রিম কোর্টের ডিএ রায়: ভোটের মুখে মমতা সরকারের ঘাড়ে কতটা আর্থিক চাপ, হিসাব বনাম ব্যাখ্যায় মুখোমুখি রাজনীতি




