তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : সন্তান না হওয়া মানেই নারীর সমস্যা এই ধারণা সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধ্যাত্ব নারী বা পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে দেখা যেতে পারে। এমনকী বহু ক্ষেত্রে সমস্যার উৎস পুরুষের দিকেও থাকে। তাই ‘পুরুষের বন্ধ্যাত্ব’ বা Male Infertility নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায়, এক বছর নিয়মিত ও অসুরক্ষিত দাম্পত্য মিলনের পরেও যদি সন্তানধারণ না হয়, তবে সেটিকে বন্ধ্যাত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সংজ্ঞা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবারে প্রথমেই নারীর উপর দায় চাপানো হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানসিকতা শুধু ভুলই নয়, ক্ষতিকরও বটে। সময়মতো সঠিক পরীক্ষা না করালে সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হয়।
পুরুষের বন্ধ্যাত্বের মূল কারণ সাধারণত শুক্রাণুজনিত ত্রুটি। কখনও শুক্রাণু উৎপাদনই হয় না, কখনও সংখ্যা অত্যন্ত কম থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে শুক্রাণুর গতিশীলতা কম বা গঠনগত ত্রুটি থাকে, যার ফলে ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে ব্যর্থ হয়। চিকিৎসকেরা জানান, ‘শুধু সংখ্যা নয়, গুণগত মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’ এমনও হতে পারে, শুক্রাণু স্বাভাবিক হলেও শারীরিক অক্ষমতা বা নির্দিষ্ট সমস্যার কারণে তা নারীর জননতন্ত্রে পৌঁছাতে পারে না।বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে শুক্রাণু কমে যাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা যায় না। তবে বাকি ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে আধুনিক জীবনযাত্রা বড় ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশ দূষণ শুক্রাণুর মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘক্ষণ ল্যাপটপ কোলে রাখা বা মোবাইল ফোন শরীরের খুব কাছে রাখা নিয়েও সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের বক্তব্য, ‘তেজস্ক্রিয় রশ্মি সরাসরি ক্ষতি করে এমন প্রমাণ এখনও সীমিত, কিন্তু সতর্কতা অবলম্বন করাই ভাল।’
ধূমপান ও মদ্যপান শুক্রাণুর ঝিল্লি ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে গতিশীলতা কমে যায়। খাদ্যে ভেজাল ও কীটনাশকের উপস্থিতিও প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসকেরা বলছেন, ‘রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শুক্রাণু উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কেমোথেরাপি বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শুক্রাণু উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে ‘এজোস্পার্মিয়া’ বলা হয়, যেখানে বীর্যে কোনও শুক্রাণু পাওয়া যায় না। জন্মগত ত্রুটি, সংক্রমণ বা নালীর বাধাজনিত কারণেও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নালী বন্ধ থাকলেও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা সংশোধন সম্ভব। তবে আশার কথা, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান পুরুষের বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে একাধিক সমাধানের পথ খুলে দিয়েছে। হরমোনের ঘাটতি থাকলে হরমোন থেরাপি কার্যকর হতে পারে। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনাও অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ, ‘নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নেশামুক্ত জীবন প্রজননক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে।’ অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ, যেমন দীর্ঘক্ষণ সাউনা বা উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করা, এড়িয়ে চলাও উপকারী।
যাঁদের শুক্রাণুর সংখ্যা ১০ মিলিয়নের কম, তাঁদের ক্ষেত্রে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা In Vitro Fertilization (IVF) কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়। আরও কম, অর্থাৎ ৫ মিলিয়নের নিচে হলে ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন বা Intracytoplasmic Sperm Injection (ICSI) পদ্ধতিতে সফলতার হার বাড়ে। এই প্রযুক্তিতে একটি সুস্থ শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুর মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ক্যানসার আক্রান্ত রোগীরাও চিকিৎসার আগে শুক্রাণু সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন। পরবর্তী সময়ে তা ব্যবহার করে পিতৃত্বের স্বাদ পাওয়া সম্ভব। তাই গুরুতর চিকিৎসা শুরুর আগে প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।
সমাজে পুরুষের বন্ধ্যাত্ব নিয়ে এখনও লজ্জা ও গোপনীয়তার প্রবণতা রয়েছে। অনেকেই পরীক্ষা করাতে অনীহা প্রকাশ করেন। চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, ‘সময় নষ্ট না করে দম্পতির উভয়েরই পরীক্ষা করা উচিত।’ শুধুমাত্র নারীর উপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মানসিক চাপও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ার কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। তাই প্রয়োজন পারস্পরিক সমর্থন ও কাউন্সেলিং। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বন্ধ্যাত্ব কোনও অভিশাপ নয়, এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা।’ সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসার সাহায্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমাধান সম্ভব। কিন্তু, চিকিৎসকদের মত, লোকলজ্জা বা সামাজিক কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পুরুষের বন্ধ্যাত্ব লুকিয়ে রাখলে সমস্যা বাড়ে, আর খোলাখুলি আলোচনা করলে সমাধানের পথ সহজ হয়। বিজ্ঞান এগিয়েছে, প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Britain : Blaise Metreweli tobe first female chief of MI6: ১১৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষপদে নারী!




