প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, হায়দরাবাদ : অবসরপ্রাপ্ত। বয়স প্রায় ৪০। সন্তানের বয়স ৭ পেরিয়েছে। তবু শরীরচর্চায় বিন্দুমাত্র শিথিলতা নেই। এক সময় টেনিস কোর্টে যাঁকে টেক্কা দিতে নাভিশ্বাস উঠত বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের, সেই ‘সানিয়া মির্জা’ (Sania Mirza) এখন নতুন এক লক্ষ্য সামনে রেখে জীবনযাপন সাজিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন, আজ থেকে ১০ বছর পরেও যেন তিনি সমান ফিট থাকেন, ১৭ বছরের ছেলের সঙ্গে টেনিস খেলতে পারেন, দৌড়াতে পারেন একই শক্তিতে। আর সেই লক্ষ্যেই প্রতিদিন নিয়ম করে অনুশীলনে ঘাম ঝরাচ্ছেন ভারতের প্রাক্তন টেনিস তারকা।

সানিয়া পেশাদার টেনিস থেকে অবসর নেওয়ার পর অনেক খেলোয়াড়ই ধীরে ধীরে অনিয়মিত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। কঠোর রুটিনের বাঁধন শিথিল হয়, ডায়েটের কড়াকড়ি কমে। কিন্তু সানিয়া মির্জা (Sania Mirza) সেই পথে হাঁটেননি। তবে উল্টোটা। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘অবসর মানেই শরীরকে ছেড়ে দেওয়া নয়।’ তাঁর কাছে ফিটনেস এখন আর কেরিয়ারের প্রয়োজনে নয়, ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও মাতৃত্বের দায়বদ্ধতার অংশ। বর্তমানে মূলত শক্তিবৃদ্ধিমূলক বা স্ট্রেংথ ট্রেনিংয়ের উপর জোর দিচ্ছেন সানিয়া। নিয়মিত জিমে গিয়ে ওজন তোলা, কোর মাংসপেশি শক্ত করা, স্কোয়াট ও লাঞ্জের মতো ব্যায়াম তাঁর রুটিনের অঙ্গ। আগে নিয়মিত পিলাটিজ় করতেন তিনি, যা শরীরের নমনীয়তা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। যদিও ব্যস্ততার কারণে এখন নিয়মিত পিলাটিজ় করা হয়ে ওঠে না, তবু সুযোগ পেলেই তা করেন বলে জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠ মহল।

শীত ও বসন্তকালে বাইরে দৌড়নো সানিয়ার প্রিয় অভ্যাস। প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার দৌড়ান তিনি। ‘রোজ ৫-৭ কিমি দৌড়াই’ এই কথাটিই এখন তাঁর ফিটনেস মন্ত্র হয়ে উঠেছে। খোলা আকাশের নিচে ছুটতে ছুটতেই তিনি নিজেকে মানসিকভাবে চাঙা রাখেন। দীর্ঘদিন পেশাদার ক্রীড়াজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, শরীর ও মনের সমন্বয় না থাকলে ফিটনেস সম্পূর্ণ হয় না। টেনিস কোর্টে সক্রিয় থাকার সময়ে নিয়মিত অনুশীলন ও ম্যাচের চাপে অতিরিক্ত মেদ ঝরে যেত স্বাভাবিকভাবেই। তখন আলাদা করে কড়া ডায়েটের প্রয়োজন পড়ত না। প্রয়োজন অনুযায়ী খাওয়া-দাওয়া করেই শরীর ঠিক রাখা সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। নিয়মিত প্রতিযোগিতার চাপ নেই, তাই খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ না রাখলে ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। সেই কারণেই এখন তিনি কড়া ডায়েট মেনে চলেন। সানিয়ার সকালের শুরুটা হয় বিশেষ একটি স্বাস্থ্যকর পানীয় দিয়ে। জিমে যাওয়ার আগে গরম জলে লেবুর রস, মধু, কালো জিরে, আদা ও হলুদ মিশিয়ে পান করেন সানিয়া। এই পানীয় শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়াতে সাহায্য করে এবং প্রদাহ কমাতে সহায়ক বলে মনে করা হয়। সারা রাত ভিজিয়ে রাখা চিয়া বীজও তাঁর সকালের তালিকায় থাকে। চিয়া বীজে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও ফাইবার শরীরকে দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগায়। এরপর এক কাপ কফি ব্যায়ামের আগে এটাই তাঁর প্রধান ভরসা।

উল্লেখ্য, শরীরচর্চার আগে ভারী খাবার খান না সানিয়া মির্জা। অধিকাংশ সময় তরল পানীয়েই নির্ভর করেন। ব্যায়াম শেষ হওয়ার পরই দিনের মূল খাবার গ্রহণ করেন। পুষ্টিকর প্রোটিন, শাকসবজি, পরিমিত কার্বোহাইড্রেট, আসলে সুষম খাদ্যতালিকা মেনে চলেন। প্রসেসড খাবার ও অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলাই তাঁর নীতি।এছাড়াও, একলা মা হিসেবে সন্তানের প্রতি দায়বদ্ধতাও সানিয়ার এই শৃঙ্খলিত জীবনের বড় কারণ। তাঁর ছেলে এখন ছোট, কিন্তু তিনি চান ভবিষ্যতেও সন্তানের সঙ্গে সমান তালে খেলাধুলা করতে। তাঁর স্বপ্ন, ‘১০ বছর পরেও যেন আমি দৌড়াতে পারি, খেলতে পারি, ক্লান্ত না হই।’ এই লক্ষ্যই তাঁকে প্রতিদিন অনুপ্রাণিত করে।

খেলাধুলার জগতে ‘সানিয়া মির্জা’ (Sania Mirza) -এর অবদান অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক টেনিসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে তিনি একাধিক গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা জিতেছেন এবং বহু তরুণ ক্রীড়াবিদের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। কোর্টে তাঁর আগ্রাসী ফোরহ্যান্ড যেমন প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলত, তেমনই আজ ফিটনেসে তাঁর দৃঢ়তা অনেকের কাছে শিক্ষণীয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রেংথ ট্রেনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাংসপেশি ক্ষয় রোধ, হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখা এবং বিপাকক্রিয়া সচল রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম প্রয়োজন। সানিয়ার রুটিন সেই দিক থেকেই প্রাসঙ্গিক। তাঁর এই যাপন দেখিয়ে দেয়, অবসর মানেই স্থবিরতা নয়; বরং নতুন লক্ষ্য স্থির করে নিজেকে গড়ে তোলার সময়। উল্লেখ্য, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়াতেও ফিটনেস সংক্রান্ত নানা ঝলক শেয়ার করেন সানিয়া। অনুরাগীরা নিয়মিত তাঁর ওয়ার্কআউট ভিডিও ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস দেখে অনুপ্রাণিত হন। অনেকেই মনে করেন, প্রাক্তন ক্রীড়াবিদ হয়েও তিনি যেভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন করছেন, তা আজকের প্রজন্মের জন্য বড় শিক্ষা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর লক্ষ্য একটিই সুস্থ থাকা। খ্যাতি, সাফল্য, রেকর্ড সবকিছুর ঊর্ধ্বে এখন তাঁর অগ্রাধিকার শরীর ও মনকে সুস্থ রাখা। ‘সন্তানের জন্য সুস্থ থাকা’ এই সহজ কিন্তু গভীর দর্শনই আজ তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি। আর সেই কারণেই ৪০ ছুঁইছুঁই বয়সেও প্রতিদিন ৫-৭ কিলোমিটার দৌড়ে নিজেকে প্রস্তুত রাখছেন ভারতের এই কিংবদন্তি টেনিস তারকা।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Arjun Tendulkar and Saniya Chandhok Dubai trip | বিয়ের আগেই সানিয়াকে নিয়ে ‘মধুচন্দ্রিমা’! সচিন-পুত্র অর্জুনের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে জল্পনা তুঙ্গে



