সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: দীর্ঘ টানাপড়েন, দফায় দফায় আলোচনা আর একাধিক অচলাবস্থার পর অবশেষে অন্তর্বর্তী বাণিজ্যিক সমঝোতায় পৌঁছল ভারত ও আমেরিকা (India-USA Trade Deal)। শনিবার ভোরে ভারতীয় সময় অনুযায়ী যৌথ বিবৃতিতে এই সমঝোতার ঘোষণা করে দুই দেশ। এই চুক্তির জেরে ভারতীয় পণ্যের উপর চাপানো অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States of America)। ফলে মোট শুল্কের হার ২৫ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়াল ১৮ শতাংশে। তবে এই সমঝোতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক শুধু শুল্ক কমানো নয়, তা কৃষিক্ষেত্রে ভারতের কৌশলগত সাফল্য।
ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য আলোচনার সবচেয়ে জটিল দিক ছিল কৃষিপণ্য। একাধিক বৈঠকে এই জায়গাতেই বারবার আটকে যাচ্ছিল আলোচনা। মার্কিন পক্ষ চাইছিল তাদের কৃষিপণ্য ভারতীয় বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার পাক। অন্যদিকে নতুন দিল্লি কঠোর ছিল দেশের কৃষক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের স্বার্থে কোনও আপস করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত সেই জায়গাতেই ‘কাঁটা দিয়েই কাঁটা তোলা’ কৌশল নিল ভারত। অন্তর্বর্তী সমঝোতায় কৃষিক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান অটুট রাখল নতুন দিল্লি।এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল (Piyush Goyal) জানিয়ে দেন, এই সমঝোতায় ভারতীয় কৃষক ও এমএসএমই (MSME) -এর স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘কোনও মার্কিন কৃষিজাত পণ্যকে ভারতীয় বাজারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে না। তবে কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে সীমিতভাবে বাজার খোলা হচ্ছে।’ তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ‘যে সকল পণ্যের ক্ষেত্রে ভারত আত্মনির্ভর, সেগুলিকে এই সমঝোতার বাইরে রাখা হয়েছে।’
এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার যে, মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য ভারতের দরজা পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়নি। দেশের কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়াই ছিল সরকারের মূল লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভারতের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কৃষি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে সামান্য ছাড়ও দেশের কোটি কোটি কৃষকের জীবিকা প্রভাবিত করতে পারে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কোনও আপস করেনি নতুন দিল্লি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ভারতের কৌশলগত সাফল্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে। এই সমঝোতার ফলে একাধিক ভারতীয় কৃষিপণ্য বিনা শুল্কে আমেরিকার বাজারে ঢুকতে পারবে। পীযূষ গোয়েলের কথায়, ‘আমাদের চা, কফি ও নারকেল তেলের উপর কোনও শুল্ক চাপাবে না আমেরিকা।’ পাশাপাশি কলা, আম, অ্যাভোকাডো, কিউয়ি, পেঁপে -সহ একাধিক ফল এবং কিছু শাক-সবজিও শুল্কমুক্তভাবে মার্কিন বাজারে প্রবেশ করবে।
এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় কৃষকদের জন্য বড় স্বস্তির খবর। কারণ, এতদিন মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে শুল্ক ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক বাধার মুখে পড়তে হত ভারতীয় রফতানিকারকদের। নতুন সমঝোতায় সেই বাধা অনেকটাই কমল। এর ফলে ভারতের কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে চা ও কফির ক্ষেত্রে এই সমঝোতা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্ব বাজারে চা রফতানিতে চিন (China) ও শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka) অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু আমেরিকার মতো বড় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলে ভারত এই দুই দেশকে টেক্কা দিতে পারবে। শুধু রফতানি বৃদ্ধি নয়, এর প্রভাব পড়বে দেশের উত্তর-পূর্ব ভারত, পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) ও দক্ষিণ ভারতের চা-কফি উৎপাদক অঞ্চলে। বাড়তে পারে কৃষকের আয়, তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
এখানেই শেষ নয়। ফল ও শাক-সবজির ক্ষেত্রে আমেরিকার বাজার অত্যন্ত লাভজনক। উচ্চ ক্রয়ক্ষমতার বাজারে ভারতীয় পণ্য জায়গা করে নিতে পারলে, দেশের উদ্যানপালন ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমঝোতা ভারতের কৃষিকে ধীরে ধীরে ‘লোকাল থেকে গ্লোবাল’-এর পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। রাজনৈতিক দিক থেকেও এই চুক্তি তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কে একাধিকবার টানাপড়েন দেখা গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন দিল্লি এবার আরও সতর্ক অবস্থান নেয়। মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার আদায় করেও দেশের বাজারকে সুরক্ষিত রাখা, এই দ্বিমুখী কৌশলকেই এখন ‘ট্রাম্প কার্ড’ বলে ব্যাখ্যা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। উল্লেখ্য, এই অন্তর্বর্তী বাণিজ্যিক সমঝোতা ভারতের জন্য শুধু শুল্ক ছাড়ের সাফল্য নয়, তা একটি কৌশলগত জয়। যেখানে একদিকে মার্কিন বাজারে নতুন সুযোগ খুলছে, অন্যদিকে দেশের কৃষক ও ক্ষুদ্র শিল্প রক্ষা পাচ্ছে। চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তির পথে এটি যে একটি বড় ধাপ, তা বলাই বাহুল্য।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi on India US Trade Deal | ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি ‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’, দেশের প্রত্যেকেরই লাভ হবে: এনডিএ বৈঠকে ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর



