শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা : শিক্ষা পরীক্ষার নম্বর বা পাঠ্যসূচীর সীমায় আবদ্ধ না থেকে মনন, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির আলোয় মানুষকে নির্মাণ করে, তখন সেই শিক্ষালয় হয়ে ওঠে সময়ের সাক্ষী। ঠিক তেমনি একটি অনন্য শিক্ষাসাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ‘চলন্তিকা’ (Chalantika)। ১৯৯৫ সালে স্বপ্নকে পাথেয় করে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, বুধবার, আয়োজন করেছিল তাদের ৩১তম বার্ষিক সাংস্কৃতিক ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনুপম মিলনমেলায় রূপ নেয় এই স্মরণীয় সন্ধ্যা। এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ‘চলন্তিকা’ -এর কর্ণধার ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্বের লেখা উপন্যাস ‘স্বপ্নচন্দ্র’ এবং প্রবন্ধগ্রন্থ ‘ঔপন্যাসিক অজিতেশ’ -এর প্রচ্ছদ উন্মোচন। একই মঞ্চে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠান এবং সাহিত্য প্রকাশের এমন সমন্বয় অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয় স্বাগত ভাষণের মাধ্যমে। বক্তব্য রাখেন সীমা সোম বিশ্বাস (Seema Som Biswas)। তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়ে দীর্ঘ ৩১ বছরের পথচলার গর্ব ও দায়িত্ববোধ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা চলন্তিকা আজ হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয় চলন্তিকার মূল দর্শন এই প্রতিষ্ঠান শুধু XI থেকে M.A. পর্যন্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি দেয় না, পাশাপাশি মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষাও দেয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও অধ্যাপক ড. কল্যাণ কুমার সরকার (Dr. Kalyan Kumar Sarkar)। তিনি ‘চলন্তিকা’ -এর দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সমাজের ভিতকে দৃঢ় করে। উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন কবি ও সম্পাদক অমলেন্দু বিশ্বাস (Amalendu Biswas)। তিনি চলন্তিকার সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি নৃপেন চক্রবর্তী (Nripen Chakraborty), তাঁর উপস্থিতি পুরো অনুষ্ঠানকে বিশেষ মর্যাদা দেয়। সভাপতিত্ব করেন কবি অরু চট্টোপাধ্যায় (Aru Chattopadhyay)। তিনি তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা ও সংস্কৃতির সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপস্থাপন করেন। এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি ও শিক্ষক রতিকান্ত মালাকার (Ratikanta Malakar) এবং কবি ও সম্পাদক রাঘব পোড়ে (Raghav Pore)। মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন কেকা (Keka), সাধনা (Sadhana), মধুশ্রী (Madhushree), কাকলী (Kakoli) ও সোমা (Soma) প্রমুখ, যাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
এই সন্ধ্যার অন্যতম আকর্ষণ ছিল গ্রন্থ প্রকাশ পর্ব। ‘স্বপ্নচন্দ্র’ ও ‘ঔপন্যাসিক অজিতেশ’ -এর প্রচ্ছদ উন্মোচনের সময় দর্শকাসনে ছিল বিশেষ উৎসাহ। উল্লেখ্য যে, এই দু’টি গ্রন্থের প্রচ্ছদ শিল্পী অধ্যাপক ড. বাসুদেব মণ্ডল (Dr. Basudeb Mandal)। তাঁর নান্দনিক শিল্পবোধ গ্রন্থ দু’টির ভাবনাকে আরও গভীরতা দেয়। সাংস্কৃতিক পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন মধুশ্রী সরকার (Madhushree Sarkar), সাধনা হালদার (Sadhana Haldar) এবং কবি ও সম্পাদক সোমা বিশ্বাস (Soma Biswas)। তাঁদের কণ্ঠে সুরের আবেশ গোটা মিলনমেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। নৃত্য পরিবেশন করেন শুভায়ু (Shubhayu) ও শ্রুতমা (Shrutama), মেঘলা (Meghla) ও বৃষ্টি (Brishti)। কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করেন বিদিশা (Bidisha), শ্যামা (Shyama), জয়িতা (Jayita), প্রীতম (Pritam), অদৃজা (Adrija) ও অর্ঘ্য (Arghya)। তাঁদের কবিতায় ফুটে ওঠে সমকালীন সমাজচিন্তা ও অনুভূতির নানা রং।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি আশীষ মিশ্র (Ashish Mishra)। তাঁর সাবলীল ও প্রাঞ্জল সঞ্চালনায় প্রতিটি পর্বই হয়ে ওঠে সুসংগঠিত ও প্রাণবন্ত। অনুষ্ঠান শেষে সীমা সোম বিশ্বাস সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রসঙ্গত, চলন্তিকা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নাম। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে চলেছে এই প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা ও সংস্কৃতির এই যুগলবন্দীই চলন্তিকার প্রকৃত শক্তি, যা ভবিষ্যতেও তাদের পথচলাকে অর্থবহ ও স্মরণীয় করে রাখবে।
আরও পড়ুন : হাইলাকান্দিতে ৪২তম রবীন্দ্র মেলার সমাপ্তি অনুষ্ঠান



