সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তিতে বড়সড় শুল্কছাঁটের প্রভাব সরাসরি পড়ল মুদ্রাবাজারে। মঙ্গলবার সকালের লেনদেনে মার্কিন ডলারের (US Dollar) বিরুদ্ধে ১১৯ পয়সা শক্তিশালী হয়ে টাকা (রুপি) পৌঁছে গেল ৯০.৩০ স্তরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এই নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যায়। ফরেক্স বাজারের বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভারতের আপেক্ষিক অবস্থানকে আরও মজবুত করেছে এবং বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (FII) ফের বাজারে ফেরার দরজা খুলে দিয়েছে। ইন্টারব্যাঙ্ক ফরেন এক্সচেঞ্জ বাজারে (Interbank Forex Market) মঙ্গলবার টাকা (রুপি) লেনদেন শুরু করে ডলারের বিপরীতে ৯০.৩০ স্তরে। আগের দিনের বন্ধ মূল্য ছিল ৯১.৪৯। অর্থাৎ এক লাফে ১১৯ পয়সার উত্থান। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের তুলনায় টাকার (রুপির) এই ধরনের শক্তিবৃদ্ধিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
ফরেক্স বাজার বিশ্লেষক অনিল কুমার ভানসালি (Anil Kumar Bhansali), ফিনরেক্স ট্রেজারি অ্যাডভাইজার্স এলএলপি (Finrex Treasury Advisors LLP)-এর ট্রেজারি প্রধান ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, বলেন, ‘রাতারাতি সবচেয়ে ভালো খবর এসেছে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি থেকে। প্রায় ন’মাস দেরির পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এই চুক্তির ঘোষণা করেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) তা অনুমোদন করেন। শুল্ক ১৮ শতাংশে নামায় ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশের তুলনায় আপেক্ষিক সুবিধা পেলেন।’ ভানসালির মতে, এই শুল্কছাঁটের ফলে ভারতের রপ্তানি ক্ষেত্র নতুন করে গতি পাবে এবং আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীদের চোখে ভারত আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। তাঁর কথায়, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিক্রেতা থাকার পর এবার হয়তো বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ার বাজারে আবার কেনাকাটা শুরু করবেন।’ তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (Reserve Bank of India) -এর অবস্থান কী হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে ডলারের স্বল্প অবস্থান সামলাতে হতে পারে। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও ডলারের শক্তি কিছুটা কমেছে। ছয়টি প্রধান মুদ্রার ঝুড়ির বিপরীতে ডলারের শক্তি মাপার সূচক ডলার ইনডেক্স (Dollar Index) মঙ্গলবার ০.২০ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৯৭.৪৩-এ। এর ফলে উদীয়মান বাজারের মুদ্রাগুলির জন্য কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
অপরদিকে, আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারেও নরমভাব লক্ষ্য করা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড (Brent Crude), যা বিশ্ববাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, ফিউচার লেনদেনে ০.৪১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৬৬.০৩ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। তেলের দাম কমার ফলে ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য মুদ্রাস্ফীতি ও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতির উপর চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।মুদ্রাবাজারের পাশাপাশি দেশীয় শেয়ারবাজারেও এই ইতিবাচক খবরের প্রভাব স্পষ্ট। মঙ্গলবার সকালে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (BSE) ৩০ শেয়ারের সূচক সেনসেক্স (Sensex) ২,১৩৮.০৮ পয়েন্ট বা ২.৬২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩,৮০৪.৫৪-এ। একই সঙ্গে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (NSE) নিফটি (Nifty) ৬০৭ পয়েন্ট বা ২.৪২ শতাংশ বেড়ে ২৫,৬৯৫.৪০ স্তরে পৌঁছয়। ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও রপ্তানিনির্ভর সংস্থার শেয়ারে ব্যাপক কেনাকাটা দেখা যায়। তবে বাজারে এই উচ্ছ্বাসের মাঝেও একটি দিক বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ১,৮৩২.৪৬ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, শুল্কছাঁটের সুফল পুরোপুরি বাজারে প্রতিফলিত হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। আগামী কয়েক দিনে যদি এফআইআই প্রবাহের দিক বদলায়, তা হলে বাজারে আরও স্থায়ী ইতিবাচক ধারা তৈরি হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রুপির এই শক্তিবৃদ্ধি শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়, বরং তা বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায় রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নীতি, বৈশ্বিক মুদ্রানীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপরও বাজারের ভবিষ্যৎ দিক নির্ভর করবে। উল্লেখ্য যে, শুল্কছাঁটের ঘোষণার পর ভারতীয় মুদ্রা টাকা (রুপির) উত্থান, শেয়ারবাজারের চাঙ্গাভাব এবং বিদেশি লগ্নির সম্ভাবনা, এই তিনটি মিলিয়ে ভারতের আর্থিক বাজারে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee on Election Commission | জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের ইঙ্গিত, দিল্লী থেকে নির্বাচন কমিশনকে তীব্র আক্রমণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়




