সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ গভীর হচ্ছে। সেই প্রেক্ষিতেই শিশুদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপের পথে হাঁটতে চলেছে ভারত (Child Social Media Ban India)। সংসদে পেশ হওয়া একটি সমীক্ষা-ভিত্তিক সরকারি প্রতিবেদনে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে, নাবালক-নাবালিকাদের অনলাইন আসক্তি কমাতে সমাজমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হতে পারে। পাশাপাশি অনলাইন ক্লাসের সংখ্যা ও সময়সীমা কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, বিশ্বের একাধিক দেশ ইতিমধ্যেই এই পথে এগিয়েছে। ডেনমার্ক (Denmark), অস্ট্রেলিয়া (Australia) এবং ফ্রান্স (France) প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে শিশুদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একই রকম সিদ্ধান্তের পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইংল্যান্ড (England)। আন্তর্জাতিক এই প্রবণতার দিকে নজর রেখেই ভারতেও নীতি পরিবর্তনের আভাস মিলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংসদে বৃহস্পতিবার সরকারের তরফে জানানো হয়, সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অতিরিক্ত অনলাইন উপস্থিতি শিশুদের মধ্যে আসক্তির প্রবণতা বাড়াচ্ছে। এই আসক্তি শুধুমাত্র পড়াশোনার ক্ষতি করছে না, প্রভাব ফেলছে মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও। উদ্বেগ, একাকিত্ব, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং মনোযোগের ঘাটতির মতো সমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ছে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার। সেই কারণেই অনলাইন ক্লাসের সংখ্যা ও সময় সীমিত করার প্রস্তাব উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনলাইন শিক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা নির্ধারণ করা জরুরি। খুব কম বয়সে দীর্ঘ সময় ভার্চুয়াল পর্দার সামনে বসে পড়াশোনা করার ফলে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তাই প্রাথমিক স্তরে অফলাইন ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার উপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বিকল্প ও সহজতর সামগ্রী ব্যবহারেরও পরামর্শ রয়েছে, যাতে প্রযুক্তিনির্ভরতা কমে এবং শেখার অভিজ্ঞতা আরও মানবিক হয়।
সমীক্ষায় আরও উল্লেখ, বিদ্যালয়গুলিকে এগিয়ে এসে শিশুদের ‘ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত’ এই বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। শুধু পাঠ্যবই নয়, পাঠক্রমের মধ্যেই ডিজিটাল আচরণবিধি, সাইবার শিষ্টাচার এবং অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিশুরা নিজেরাই বুঝতে শিখবে কখন ও কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত। ওই সরকারি প্রতিবেদনে জুয়া, অনুপযুক্ত বিজ্ঞাপন এবং ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্ট নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সমাজমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে শিশুদের সামনে যেভাবে অশালীন বা সহিংস বিষয়বস্তু পৌঁছে যাচ্ছে, তা মানসিক গঠনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তাই সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সমীক্ষায় নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং টাইম বা দৈনিক স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা নির্ধারণের পরামর্শ রয়েছে। এর পাশাপাশি শিশুদের ভার্চুয়াল জগতের বাইরে খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ, বই পড়া এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাস্তব জগতের সঙ্গে সংযোগ বাড়লে মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে এবং আত্মবিশ্বাসও গড়ে ওঠে, এমনটাই মত মনোবিদদের।অভিভাবক-অভিভাবিকাদের ভূমিকাকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বার্তা দেওয়া হয়েছে, বাড়িতে মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা ট্যাব যেন শিশুদের জন্য সর্বক্ষণ সহজলভ্য না থাকে। প্রয়োজনে প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় ও নিয়ম বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নাবালক-নাবালিকাদের অনলাইন আসক্তি ছাড়ানোর জন্য অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বিশেষ কর্মশালা আয়োজনের প্রস্তাবও রয়েছে। এই কর্মশালায় ডিজিটাল প্যারেন্টিং, অনলাইন ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ এবং সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করার কৌশল শেখানো হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন আসক্তি কমাতে পারলে শিশুদের মধ্যে যৌনতা, হিংসা ও আগ্রাসী আচরণের প্রবণতা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব। ভার্চুয়াল জগতের অতিরিক্ত প্রভাব কমলে বাস্তব জীবনের মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা আরও শক্তিশালী হবে। উল্লেখ্য, শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে ভারত যে কঠোর কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের পথে এগচ্ছে, তা পরিষ্কার। সমাজমাধ্যম নিষিদ্ধকরণ ও অনলাইন শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের জন্য এক নতুন দিশা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও নীতি বিশেষজ্ঞরা।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Under 16 Social Media Restriction, Goa Government | ১৬ বছরের কম বয়সিদের সমাজমাধ্যম নিষিদ্ধ করার ভাবনায় গোয়া ও অন্ধ্রপ্রদেশ




