সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাজ্যের নির্বাচনী বুথগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ফের একবার তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এল প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন। বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) -এর দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে বৃহস্পতিবার স্পষ্ট ও কড়া মন্তব্য করল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল (Justice Sujoy Paul) প্রশ্ন তুললেন, ‘এটা তো নির্বাচন কমিশনের কাজ। তারা নির্দেশ দিতে পারে। কেন আদালতের উপর দায়িত্ব চাপানো হচ্ছে?’ এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।
প্রসঙ্গত, রাজ্যের প্রায় ৮৩ হাজার নির্বাচনী বুথে ন্যূনতম নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দাবিতে এই মামলা দায়ের করেছিলেন শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, প্রতিটি নির্বাচনের সময়েই বুথে-বুথে সন্ত্রাস, ভয় দেখানো, ক্যামেরা বিকল করা এবং বিরোধী দলের এজেন্টদের হেনস্থার অভিযোগ ওঠে। সেই প্রেক্ষিতেই আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে জনস্বার্থ মামলা করা হয়। বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনকে এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানাতে নির্দেশ দিয়েছে।
শুনানির সময় নির্বাচন কমিশনের তরফে আইনজীবী আদালতকে জানান, রাজ্যের বুথগুলিতে নজরদারি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি বড় অংশের দায়িত্ব ছিল ম্যাকিনটোশবার্ন কোম্পানি (Mackintosh Burn & Northern Company) -এর উপর। কিন্তু সংস্থাটি রাজ্যের অর্থ দফতরের (Finance Department, West Bengal) সঙ্গে আলোচনা করার পর মাঝপথে কাজ থেকে সরে দাঁড়ায়। কমিশনের দাবি, প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সংস্থা কাজ বন্ধ করে দেয়। এই অবস্থায় বুথ নিরাপত্তার দায়িত্ব কার্যত রাজ্যের কাঁধেই বর্তেছে। এই বক্তব্যের পরেই মামলাকারীর তরফে তীব্র আপত্তি তোলা হয়। শমীক ভট্টাচার্যের আইনজীবী আদালতে বলেন, ‘রাজ্য সরকার অন্তত আদালতকে জানাক, বাস্তব পরিস্থিতি কী। নির্বাচনের আগে বুথের ন্যূনতম নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আদালত নির্দেশ দিক।’ তাঁর বক্তব্য, বুথে নিরাপত্তা না থাকলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এই মামলার প্রেক্ষিতে শমীক ভট্টাচার্য নিজেও একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটের দিন বুথের ভিতরে কী ঘটে, তা প্রশাসনের অজানা নয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী (Central Armed Police Forces) মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে বুথের ভিতরে ভোটারদের ভয় দেখানো হয়, বিরোধী দলের এজেন্টদের আটকে দেওয়া হয় এবং নজরদারি ক্যামেরা অকেজো করে দেওয়া হয়, সেই প্রশ্নই তুলেছেন তিনি। শমীকের অভিযোগ, ‘সিআরপিএফ বাইরে থাকে, কিন্তু বুথের ভিতরে ঢোকার পর ভোটাররা কী অবস্থার মুখোমুখি হন, তা নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠেছে। অনেক সময় ক্যামেরার উপর ময়দা, কাগজ বা কাপড় লাগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ভিতরের দৃশ্য রেকর্ড না হয়।’ এই পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল যে মন্তব্য করেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা ও বুথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সাংবিধানিক ভাবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকলে কমিশনেরই প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার কথা। আদালত কেন এই দায়িত্ব কাঁধে নেবে, সেই প্রশ্নই তুলেছেন প্রধান বিচারপতি।
ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, আপাতত আদালত কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিচ্ছে না। বরং নির্বাচন কমিশনের অবস্থান জানতে চাওয়া হচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যে কমিশনকে লিখিত ভাবে জানাতে হবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে বা নিতে চলেছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী শুনানিতে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে। এই মামলাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে। বিজেপির তরফে অভিযোগ করা হচ্ছে, রাজ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বারবার বাধার মুখে পড়ছে। অন্য দিকে, শাসক দলের দাবি, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন মিলেই আইন অনুযায়ী সব ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণের পর রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, প্রায় ৮৩ হাজার বুথের নিরাপত্তা কোনও ছোট বিষয় নয়। ক্যামেরা, পর্যাপ্ত কর্মী, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশের সমন্বয়, সমস্ত কিছু নিয়ে একটি কঠোর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। ম্যাকিনটোশবার্নের মতো সংস্থা মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেওয়ায় সেই ব্যবস্থাপনায় ফাঁক তৈরি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। উল্লেখ্য, শমীক ভট্টাচার্যের দায়ের করা এই মামলার মাধ্যমে নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক মৌলিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। নির্বাচন কমিশন কী ভাবে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছে, রাজ্য সরকার কোথায় দাঁড়িয়ে, আর আদালতের ভূমিকা কতটা, এই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী শুনানিতে। তবে আপাতত প্রধান বিচারপতির স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, নির্বাচনী দায়িত্ব আদালতের নয়, তা পালন করতেই হবে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংস্থাকেই।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : West Bengal Interim Budget, Mamata Banerjee | অন্তর্বর্তী বাজেটের দিন বদলে নবান্নে ব্যস্ততা, রাজ্য মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকের দিনক্ষণ ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে



