সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে সংসদ ভবনের বাইরে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে নতুন করে জোরদার হল বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনীতির আলোচনা। সংসদ চত্বর থেকে দেওয়া ১৩ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সম্পূর্ণভাবে ইউরোপের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কের উপরেই আলোকপাত করলেন। লক্ষণীয় ভাবে, আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে থাকা বাণিজ্যিক বোঝাপড়া বা শুল্ক-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে একটি বাক্যও উচ্চারণ করলেন না তিনি। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এই নীরবতা কী আদতে ডোনাল্ড ট্রাম্পদের (Donald Trump) উদ্দেশ্যে ঘুরিয়ে দেওয়া কোনও কৌশলী বার্তা?
প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইউরোপ। সদ্য চূড়ান্ত হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (European Union) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির রূপরেখাকে তিনি ভবিষ্যৎ ভারতের অর্থনৈতিক পথচলার অন্যতম মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, ‘ইউরোপের সঙ্গে এই চুক্তি শুধু একটি কাগুজে সমঝোতা নয়, এটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভারতের চুক্তি। এটি তরুণ ভারতের স্বপ্নের চুক্তি, আত্মনির্ভর ভারতের আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন।’ প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যে স্পষ্ট, আগামী দিনে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের দিশা অনেকটাই ইউরোপকেন্দ্রিক হতে চলেছে।উল্লেখ্য, ব্রিটেনের (United Kingdom) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির কাঠামো আগেই চূড়ান্ত করেছে ভারত। তার পরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের জোটের সঙ্গে সমঝোতার রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ায় দিল্লির কূটনৈতিক সাফল্য আরও জোরদার হয়েছে বলে মনে করছে সরকার। মোদী আগেও এই চুক্তিকে ‘সব চুক্তির জননী’ বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। বৃহস্পতিবার সেই বক্তব্য পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান, এই চুক্তির ফলে ভারতীয় রফতানিকারকদের সামনে বিশাল বাজার খুলে গিয়েছে। ইউরোপের দেশগুলিতে কম খরচে এবং দ্রুত ভারতীয় পণ্য পৌঁছনোর পথ প্রশস্ত হবে বলেও তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের অন্তর্নিহিত বার্তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি দেশের শিল্পপতি ও উৎপাদকদের উদ্দেশে সতর্কবাণী দেন। শুধু সস্তা পণ্য রফতানি করলেই চলবে না, গুণমানের দিক থেকেও ইউরোপীয় মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে, এই বার্তাই দেন মোদী। তাঁর কথায়, ‘সেরার সেরা মানের পণ্য নিয়ে বাজারে নামার এটাই সেরা সময়। তা হলে ইউরোপের ক্রেতাদের কাছ থেকে শুধু আয়ই হবে না, দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করা যাবে।’ এই বক্তব্যে স্পষ্ট, সরকার ইউরোপীয় বাজারকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ধরে রাখতে চাইছে।এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকার প্রসঙ্গ অনুল্লেখিত থাকাটাই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। গত বছরের আগস্টে ভারতীয় পণ্যের উপর প্রথমে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে আমেরিকা। পরবর্তী কালে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ‘জরিমানা’ হিসেবে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপান তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে বর্তমানে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর কার্যত ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পরেও সেই শুল্ক প্রত্যাহার না হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ভারতীয় রফতানিকারকেরা। বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পে এই চাপ আরও প্রকট। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ (Bangladesh) ও ভিয়েতনাম (Vietnam)-এর উপর মার্কিন শুল্ক ভারতের তুলনায় কম হওয়ায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে ভারতীয় পণ্য। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রফতানির পরিসংখ্যানে। ফলে বিকল্প বাজারের সন্ধান শুরু হয় অনেক আগেই। ইউরোপের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি সেই প্রেক্ষিতেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
সংসদ চত্বরের বক্তৃতায় ইউরোপকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের কথা তুলে ধরে এবং আমেরিকার নাম একেবারেই না করে মোদী কি ইচ্ছাকৃত ভাবে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করতে চাইলেন, এই প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক মহলে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এটি সরাসরি কোনও সংঘাতের বার্তা নয়, বরং বিকল্প পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত। অর্থাৎ, আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা চললেও ভারত যে একমাত্র সেই বাজারের উপর নির্ভরশীল নয়, সেটাই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাজেট অধিবেশনের প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, অর্থনৈতিক নীতি, রফতানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান এই তিনটি বিষয়ই বাজেট আলোচনার কেন্দ্রে। ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়লে ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলেই আশা করছে সরকার। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের দর কষাকষির ক্ষমতাও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু, সংসদ ভবনের বাইরে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর এই সংক্ষিপ্ত অথচ ইঙ্গিতবহুল ভাষণ কেবল বাণিজ্যিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না। ইউরোপকে সামনে রেখে আমেরিকার প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই দিশা কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন নজর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Indian AI Startups 2026, PM Narendra Modi AI Roundtable | ভারতের AI উদ্ভাবনে স্টার্টআপদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




