সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের আবহে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্ণবৈষম্য রোধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন- University Grants Commission) -এর প্রণীত নতুন বিধির উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই বিধি কার্যকর হলে সমাজে বিভাজন আরও গভীর হতে পারে এবং আদালত সময়মতো হস্তক্ষেপ না করলে পরিস্থিতি ‘বিপজ্জনক’ আকার নিতে পারে। সেই কারণেই আপাতত ইউজিসি-র নয়া নির্দেশিকা কার্যকর না রেখে ২০১২ সালের পুরনো বিধিই বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Chief Justice Surya Kant) এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীকে (Justice Jayamalya Bagchi) নিয়ে গঠিত দুই বিচারপতির বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। মামলার শুনানিতে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, শিক্ষাঙ্গনের মতো সংবেদনশীল এবং প্রগতিশীল পরিসরে এমন কোনও বিধি কার্যকর করা যায় না, যা সমাজে নতুন করে বিভাজনের বীজ বপন করতে পারে। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘স্বাধীনতার ৭৫ বছরেরও বেশি সময় পরে আমরা কি আবার এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে জাতিগত পরিচয়ই হয়ে উঠবে বিচার ও সিদ্ধান্তের মূল মানদণ্ড? বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে এতদিন যা অর্জন হয়েছে, তা কি এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে?’ আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, ইউজিসি-র নয়া বিধির ভাষায় একাধিক অস্পষ্টতা রয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে কি না, এই সব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই বিধিমালায়। বিচারপতিদের মতে, এমন অনিশ্চিত কাঠামো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অকারণ উত্তেজনা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। তাই এই বিধি বর্তমান আকারে কার্যকর করা সমীচীন নয়।
এই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে ইউজিসি -এর নতুন বিধি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কমিটির সুপারিশ না আসা পর্যন্ত এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ২০১২ সালের পুরনো বর্ণবৈষম্য বিরোধী বিধিই বহাল থাকবে। আদালতের ভাষায়, ‘সংবিধানসম্মত ন্যায়বিচার এবং সাম্যের নীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই যে কোনও সংস্কার আনতে হবে।’ উল্লেখ্য যে, চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ইউজিসি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসাম্য দূর করার লক্ষ্যে ‘প্রোমোশন অফ ইকুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশনস, ২০২৬’ শীর্ষক নতুন বিধিমালা প্রকাশ করে। সেই নির্দেশিকায় বলা হয়, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বাধ্যতামূলক ভাবে ‘ইকুয়াল অপারচুনিটি সেন্টার’ গঠন করতে হবে। পাশাপাশি থাকবে একটি ‘ইকুইটি কমিটি’, যেখানে তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি, অনগ্রসর শ্রেণি, প্রতিবন্ধী এবং মহিলা প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়।
নয়া বিধিতে আরও উল্লেখ ছিল, পড়ুয়াদের অভিযোগ জানানোর সুবিধার্থে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২৪ ঘণ্টার ইকুইটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। এমনকি, চরম ক্ষেত্রে ইউজিসি-র স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকেও কোনও কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদ দেওয়া হতে পারে, এমন সতর্কবার্তাও ছিল নির্দেশিকায়। এই বিধি প্রকাশের পর থেকেই নানা মহলে প্রবল প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে অসংরক্ষিত শ্রেণিভুক্ত পড়ুয়াদের একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। তাঁদের অভিযোগ, এই বিধি কার্যত পক্ষপাতদুষ্ট এবং এক তরফা। তাঁদের দাবি, উচ্চবর্ণের পড়ুয়ারা যদি কোনও ধরনের বৈষম্যের শিকার হন, সে ক্ষেত্রে অভিযোগ জানানোর জন্য সমান সুযোগের কথা স্পষ্ট করে বলা নেই নির্দেশিকায়। ফলে শিক্ষাঙ্গনে ন্যায়বিচারের বদলে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। আরও বড় অভিযোগ ওঠে, নয়া বিধি অনুযায়ী অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রায় অনিশ্চিত। অনেকের আশঙ্কা, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা আক্রোশ থেকেও মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায্য শুনানির অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে বলে মত দেন সমালোচকেরা। সেই সমস্ত অভিযোগ এবং উদ্বেগকেই গুরুত্ব দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আদালতের এই অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল। তাঁদের কথায়, বৈষম্য রোধ অবশ্যই জরুরি, কিন্তু তা করতে গিয়ে যেন নতুন করে বৈষম্যের জন্ম না হয়, সে বিষয়টি সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আপাতত সেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।আরও উল্লেখ, ইউজিসি-র নয়া বিধি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেই শীর্ষ আদালতের এই হস্তক্ষেপ নতুন দিশা দেখাল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। এখন নজর বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী নির্দেশের দিকে। সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, ভবিষ্যতে শিক্ষাঙ্গনে বর্ণবৈষম্য রোধের পথে কোন নীতি অনুসরণ করা হবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Aamir Khan Relationship, Marriage Breakup Reasons | পর পর দু’টি বিচ্ছেদের পর আত্মসমালোচনায় আমির খান: কাজপাগল মানসিকতা ও নিঃসঙ্গতার অভ্যাস কি দাম্পত্যের শত্রু?



