সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : মাত্র একটি বৈঠক, অথচ তার অভিঘাতে তোলপাড় গোটা দল। নিউ টাউনের এক অভিজাত হোটেলে বিতর্কিত নেতা হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir) -এর সঙ্গে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম (Mohammad Salim) -এর বৈঠক ঘিরে সিপিএমের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র মতবিরোধ, সন্দেহ ও রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ। বুধবার রাতের সেই সাক্ষাতের পর থেকেই প্রশ্নের মুখে রাজ্য সম্পাদক। দলীয় শিবিরের একাংশের মতে, এই বৈঠক শুধু রাজনৈতিক কৌশলেরই প্রশ্ন নয়, তা সিপিএমের আদর্শিক অবস্থানকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন : Balanced Diet, Diet Plan | সুষম আহারের সহজ কৌশল: ৫ ধাপেই স্বাস্থ্যকর জীবনধারার রেসিপি
সিপিএমের ইতিহাসে বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে জ্যোতি বসুকে (Jyoti Basu) প্রধানমন্ত্রী হতে না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে ২০০৮ সালে পরমাণু চুক্তির প্রশ্নে ইউপিএ-১ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার, কিংবা ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দলীয় অন্দরে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। এমনকি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে আব্বাস সিদ্দিকী (Abbas Siddiqui) ও নওশাদ সিদ্দিকীর (Naushad Siddiqui) নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে বামেদের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও দল দ্বিধাবিভক্ত ছিল। কিন্তু প্রবীণ নেতাদের মতে, সাম্প্রতিক কালে একটি বৈঠককে কেন্দ্র করে এত তীব্র প্রতিক্রিয়া আগে দেখা যায়নি। দলের একাংশের অভিযোগ, প্রতি বুধবার রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক হয়। বুধবারও সেই বৈঠক হয়েছিল। অথচ তার পর সন্ধ্যার পরে সেলিম যে হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করতে যাচ্ছেন, তা রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর অনেক সদস্যই জানতেন না। সম্পাদকমণ্ডলীর একজন প্রবীণ সদস্যের প্রশ্ন, ‘কেন রাজ্য সম্পাদককেই যেতে হল? কেন এই বিষয়টি আগে দলের মধ্যে আলোচনা করা গেল না? এমন কী গোপনীয়তা ছিল যে, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীকে এড়িয়ে এই বৈঠক?’ এই প্রশ্নগুলিই এখন দলের অন্দরে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেলিম-বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, যাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অভিযোগ রয়েছে, যিনি প্রকাশ্যে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করেছেন এবং বিজেপির সমর্থন নিতেও আপত্তি নেই বলে মন্তব্য করেছেন, তাঁর ‘মন বুঝতে’ রাজ্য সম্পাদককে কেন বৈঠক করতে হবে? তাঁদের মতে, এই বৈঠক সিপিএমের দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
অন্য দিকে, সেলিমপন্থীদের যুক্তি ভিন্ন। তাঁদের দাবি, আধুনিক রাজনীতিতে সব কিছু কমিটির আলোচনার মধ্যে দিয়ে হয় না। একটি বৈঠক মানেই রাজনৈতিক সমঝোতা নয়। তাঁদের বক্তব্য, সেলিম কোনও সিদ্ধান্ত নেননি, কেবল পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। সেলিম নিজেও প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘রাজ্যে কী হচ্ছে, তার উপর বামপন্থীদের দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। তাই গিয়েছি।’ তাঁর অনুগামীদের একাংশের মতে, দলের মধ্যে যাঁরা আমলাতান্ত্রিক কাঠামো আঁকড়ে ধরে রাখতে চান, তাঁরাই এই বৈঠক নিয়ে ‘গেল-গেল’ রব তুলছেন। বিতর্ক এখানেই থামেনি। বুধবার রাত থেকেই সমাজমাধ্যমে সিপিএমের কর্মী-সমর্থকেরা এই বৈঠক নিয়ে সরব হন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তা আরও তীব্র হয়। শুধু রাজনৈতিক কর্মীরাই নন, বামেদের ঘনিষ্ঠ নাট্য ও সাহিত্য জগতের একাংশও এই সাক্ষাৎকে ‘সাম্প্রদায়িক নেতার সঙ্গে আপস’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। নাট্যকার চন্দন সেন (Chandan Sen) -সহ একাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।
দলের ভিতর থেকে আরও একটি বাস্তব রাজনৈতিক প্রসঙ্গ উঠে আসছে। অনেক নেতার মতে, সিপিএমকে যদি ‘শূন্যের গেরো’ কাটাতে হয়, তা হলে মালদহ ও মুর্শিদাবাদ থেকেই সেই লড়াই শুরু করতে হবে। আলিমুদ্দিনের অন্দরমহলেও জানা, এই দুই জেলায় বাস্তব রাজনীতির চাপ এতটাই প্রবল যে, অতীতে বহু সিপিএম কর্মীকে স্থানীয় পরিস্থিতির কারণে আপস করতে হয়েছে। সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কেবল তাত্ত্বিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করা সম্ভব নয়, এমনটাই দাবি একাংশের। দলের অন্য অংশের মতে, হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বৈঠকের সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকায়। তাঁদের যুক্তি, সাম্প্রতিক মিছিল-মিটিংয়ে দেখা গিয়েছে, আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মানুষের অংশগ্রহণ কম হলেও বাংলাদেশের দীপু দাস হত্যার মতো ঘটনায় ব্যাপক জমায়েত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তিযুক্ত নেতার সঙ্গে বৈঠক দলের গ্রহণযোগ্যতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বাম শরিক দলগুলিও এই বৈঠক নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা শুরু করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসও সুযোগ ছাড়েনি। দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) ব্যঙ্গাত্মক গান গেয়ে সিপিএমকে কটাক্ষ করেছেন। সমস্ত মিলিয়ে রাজনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
এই বিতর্কের মধ্যে আবার ইতিহাস টেনে আনছেন সেলিমপন্থীরা। তাঁদের যুক্তি, কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে নানা সময়ে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁরা স্মরণ করাচ্ছেন নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Nirmal Chandra Chatterjee) -এর প্রসঙ্গ কিংবা জরুরি অবস্থার সময়ে জনসঙ্ঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পি সুন্দরাইয়া-এর (P. Sundarayya) ইস্তফার ঘটনাও। অর্থাৎ, আদর্শ বনাম বাস্তব রাজনীতির দ্বন্দ্ব সিপিএমের নতুন নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হুমায়ুন কবীর বৈঠক ঘিরে সিপিএমের অন্দরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা আপাতত কাটার লক্ষণ নেই। আগামী মাসে সিপিএমের দু’দিনের রাজ্য কমিটির বৈঠকে এই প্রসঙ্গ উঠবে বলেই দলীয় সূত্রে ইঙ্গিত। প্রশ্ন একটাই, এই বিতর্ক কি কেবল একটি বৈঠক ঘিরেই সীমাবদ্ধ থাকবে, না কি তা সিপিএমের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিশাকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে?
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Babri Masjid donation, Humayun Kabir fund | বাবরি মসজিদের নামে অনুদানে ঢল, এক দিনে ২০ লক্ষ জমা পড়তেই বাড়ানো হল ব্যাঙ্ক লিমিট




