সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : প্রবীণ ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টুলি (Mark Tully) আর নেই। দীর্ঘ দিন ধরেই তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গত এক সপ্তাহ দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পরে রবিবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন, তাঁর প্রয়াণে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস ও সমাজকে তিনি পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে গভীর সহমর্মিতা ও বিশ্লেষণের চোখে তুলে ধরেছিলেন, সেই মার্ক টুলি সাংবাদিকতার জগতে এক অনন্য নাম। জন্মসূত্রে কলকাতার (Kolkata) মানুষ, জীবনের বড় অংশ কেটেছে ভারতেই। প্রায় তিন দশক ধরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-এর (BBC) সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। তার মধ্যে টানা ২২ বছর বিবিসি-র নতুন দিল্লি ব্যুরো চিফ (Bureau Chief) হিসেবে দায়িত্ব সামলান। ভারতকে জানার, বোঝার এবং বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণীয়।
১৯৩৫ সালে কলকাতায় জন্ম মার্ক টুলির। সেই সময় ভারত ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৫ সালে মাত্র ন’বছর বয়সে তিনি পাড়ি দেন ব্রিটেনে। সেখানেই তাঁর শিক্ষাজীবন গড়ে ওঠে। কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ে (Cambridge University) ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবন থেকেই ইতিহাস ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক এই বিষয়গুলি তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর সাংবাদিকতার মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পড়াশোনা শেষ করে বিবিসি-তে যোগ দেন মার্ক টুলি। ১৯৬৫ সালে প্রথমবার তিনি সংস্থার হয়ে ভারতে আসেন। তখন তাঁর পদ ছিল প্রশাসনিক সহকারী। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, বিশ্লেষণী দৃষ্টি এবং ভাষার উপর দখল কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ে। ফলে রিপোর্টার হিসেবে তিনি কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় একটি দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনের পথচলা, যা ভারতের ইতিহাসের বহু নাটকীয় ও সংবেদনশীল ঘটনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে থাকবে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (Bangladesh Liberation War) চলাকালীন সময়ের রিপোর্টিং ছিল টুলির সাংবাদিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুদ্ধ, শরণার্থী সঙ্কট, মানবিক বিপর্যয় এই সবকিছুকে তিনি শুধু খবরের কাগজের শিরোনাম হিসেবে নয়, মানুষের যন্ত্রণার গল্প হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ভারতের জরুরি অবস্থা (Emergency) ঘোষণার সময়েও তাঁর রিপোর্টিং আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইন্দিরা গান্ধীর (Indira Gandhi) শাসনকাল, ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ (Operation Blue Star), ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর (Rajiv Gandhi) হত্যাকাণ্ড এমন বহু ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রত্যক্ষ বিবরণ উঠে এসেছে তাঁর প্রতিবেদনে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখিতেও সমান দক্ষ ছিলেন মার্ক টুলি। ভারতের সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে লেখা তাঁর একাধিক বই আজও পাঠকসমাদৃত। ‘নো ফুল স্টপ্স ইন ইন্ডিয়া’ (No Full Stops in India), ‘ইন্ডিয়া ইন স্লো মোশন’ (India in Slow Motion) এবং ‘দ্য হার্ট অফ ইন্ডিয়া’ (The Heart of India) এই বইগুলিতে ভারতের গ্রামীণ জীবন, ধর্মীয় বিশ্বাস, গণতন্ত্রের টানাপড়েন ও সামাজিক বাস্তবতাকে তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখায় ভারত রহস্যময় দেশ নয়, প্রাণবন্ত একটি সমাজ হিসেবে ধরা দিয়েছে।
বেতার মাধ্যমেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল। বিবিসি রেডিয়ো ৪-এ (BBC Radio 4) দীর্ঘ দিন ‘সামথিং আন্ডারস্টুড’ (Something Understood) নামে একটি অনুষ্ঠান তিনি সঞ্চালনা করেন। সেখানে ধর্ম, বিশ্বাস ও জীবনের দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে তাঁর গভীর আলোচনা শ্রোতাদের বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট করত। সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০২ সালে ব্রিটেনের তরফে তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এর পাশাপাশি, ভারতের প্রতি তাঁর গভীর টান ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্ম সম্মান প্রদান করে। একজন বিদেশি সাংবাদিক হয়েও ভারতীয় সমাজের অন্তর্নিহিত সুরকে যিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই সম্মান তাঁর জন্য ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
রবিবার তাঁর মৃত্যুর খবর প্রথম প্রকাশ্যে আনেন প্রবীণ সাংবাদিক ও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সতীশ জেকব (Satish Jacob)। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে তিনি বলেন, ‘আজ বিকেলে হাসপাতালে মার্ক টুলির মৃত্যু হয়েছে।’ এই খবরে শোকস্তব্ধ সাংবাদিক মহল। অনেকের কাছেই মার্ক টুলি ছিলেন শুধুই একজন সাংবাদিক নন, বরং ভারতকে বোঝার এক নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বর। উল্লেখ্য, মার্ক টুলির প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে যেন ভারতের ইতিহাসের এক প্রত্যক্ষ দলিলকারের কলম থেমে গেল। কিন্তু তাঁর লেখা, তাঁর কণ্ঠ আর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘ দিন ধরে ভারত ও বিশ্বের পাঠক-শ্রোতাদের মনে বেঁচে থাকবে, এই বিশ্বাসই রেখে গেলেন এই প্রবীণ সাংবাদিক।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Trump tariff on Europe, Greenland controversy NATO | গ্রিনল্যান্ড বিতর্কে আট বন্ধু দেশকেই শাস্তি! ইউরোপের উপর শুল্ক-খাঁড়া ট্রাম্পের, ২৫ শতাংশের হুঁশিয়ারিতে আন্তর্জাতিক উত্তাপ




