সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উঠে আসছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন্ন বাজেট অধিবেশন। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই শুরু হতে চলেছে এই অধিবেশন, যেখানে পেশ করা হবে রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেট। বিধানসভা সচিবালয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এটিই হবে বর্তমান সরকারের শেষ অধিবেশন। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক দিক থেকেও এই অধিবেশনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। শাসক ও বিরোধী উভয় শিবিরেই এই অধিবেশন ঘিরে প্রস্তুতি ও কৌশল নির্ধারণ শুরু হয়ে গিয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করবেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য তবে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের একটি সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে যেমন অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee), তেমন সম্ভাবনা এ বারও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিধানসভা সচিবালয়ের অন্দরে এই নিয়ে আলোচনা চলছে বলেই জানা গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে বাজেট পেশ করলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য যে আরও বাড়বে, সে বিষয়ে একমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

এই অধিবেশন হবে সপ্তদশ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার শেষ অধিবেশন। নিয়ম অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর পর্ব, উল্লেখপর্ব এবং সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, সরকারের চলমান প্রকল্পগুলির কাঠামোগত কিছু সংশোধনী এবং নতুন কিছু প্রস্তাব এই অধিবেশনেই আইনি স্বীকৃতি পেতে পারে। যদিও অন্তর্বর্তী বাজেট হওয়ায় বড় ধরনের নীতিগত বা কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম, তবু জনহিতকর প্রকল্পগুলিতে বরাদ্দ বৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলছে। নবান্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গ্রামীণ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী ও খাদ্যসাথী প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসনের একাংশ। রাজ্য সরকারের মতে, এই প্রকল্পগুলিই গত কয়েক বছরে সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এবং সামাজিক সুরক্ষার একটি শক্ত ভিত তৈরি করেছে। তাই নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী বাজেটে এই প্রকল্পগুলিকে আরও জোরদার করার মাধ্যমে সরকারের উন্নয়নমূলক ভাবমূর্তি তুলে ধরার কৌশল নেওয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অন্তর্বর্তী বাজেট কার্যত রাজ্য সরকারের ‘রিপোর্ট কার্ড’ হিসেবে কাজ করবে। গত পাঁচ বছরে সরকার কী কী করেছে, কোন প্রকল্পে কতটা সাফল্য এসেছে এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা কী, এই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা থাকবে বাজেট বক্তৃতায়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্য বকেয়া অর্থ, আর্থিক বঞ্চনা এবং রাজ্যের আর্থিক স্বনির্ভরতার প্রশ্নও গুরুত্ব পেতে পারে। অন্য দিকে, বিরোধী দলের ভূমিকাও এই অধিবেশনে বিশেষ নজরে থাকবে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-র নেতৃত্বে বিজেপির পরিষদীয় দল সরকারকে আক্রমণাত্মক কৌশলে ঘিরতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। সাম্প্রতিক নিয়োগ দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজ্যের ঋণের বোঝা এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারকে কাঠগড়ায় তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিজেপি। পরিষদীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং আলোচনার সময় এই ইস্যুগুলিকেই হাতিয়ার করতে পারে বিরোধীরা।
শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসও যে প্রস্তুত, তা দলীয় সূত্রেই স্পষ্ট। তাদের দাবি, বিরোধীদের অভিযোগের জবাব দিতে উন্নয়নমূলক পরিসংখ্যান এবং সামাজিক প্রকল্পের সাফল্যের তথ্যই হবে প্রধান অস্ত্র। তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, ‘রাজনীতির বাইরে সাধারণ মানুষের স্বার্থেই সরকার কাজ করেছে’, এবং সেই বার্তাই শেষ অধিবেশনে আরও জোরালো ভাবে তুলে ধরা হবে।গত পাঁচ বছরে বিধানসভার অন্দরে বারবার উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তৃণমূল ও বিজেপির বিধায়কদের মধ্যে সংঘাত, ওয়াকআউট এবং স্লোগানবাজি প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ফলে শেষ অধিবেশনে সেই রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। অনেকের মতে, এই অধিবেশন শুধু বাজেট পেশের জায়গা নয়, বরং বিধানসভা নির্বাচনের আগে শক্তি প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠতে চলেছে।প্রসঙ্গত, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শুরু হতে চলা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বাজেট অধিবেশন রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভবিষ্যতের দিক নির্দেশ করবে। অন্তর্বর্তী বাজেটের অঙ্কের চেয়েও তার বার্তা, ইঙ্গিত এবং রাজনৈতিক ভাষ্যই বেশি গুরুত্ব পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী ঘোষণা করেন এবং বিরোধীরা কী ভাবে তার মোকাবিলা করে, সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Gyanesh Kumar letter, Mamata Banerjee SIR allegation | এসআইআর বিতর্কে চিঠি-রাজনীতি তুঙ্গে, মমতার অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলেই জ্ঞানেশ কুমারকে পাল্টা চিঠি শুভেন্দুর




