সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ হুগলি : হুগলির বন্ধ হিন্দমোটর কারখানায় ঘুরতে যাওয়া এক নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে তদন্তে নতুন মোড়। এই ঘটনায় পুলিশ আরও দু’জনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত দুই যুবক ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ধর্ষণের সময় তাঁরা মূল অভিযুক্তের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এবং সক্রিয় ভাবে তাকে সহযোগিতা করেছিলেন। পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, ধৃতরা মূল অভিযুক্ত যুবকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মূল অভিযুক্ত নিজেকে ‘তৃণমূলকর্মী’ এবং সিভিক ভলান্টিয়ার বলে পরিচয় দিত বলে অভিযোগ উঠেছিল, যদিও পরে পুলিশ স্পষ্ট করে জানায়, তিনি আদৌ সিভিক ভলান্টিয়ার নন। এই ঘটনায় এর আগেই পুলিশ মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। পাশাপাশি ধরা হয়েছে নির্যাতিত নাবালিকার এক বন্ধুকেও, যিনি মেয়েটির সঙ্গে ওই বন্ধ কারখানায় ঢুকেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্ধ হিন্দমোটর কারখানার ভিতরেই মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাটি সামনে আসার পর থেকেই উত্তরপাড়া থানা এলাকা জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ যেমন বাড়ছে, তেমনই রাজ্য রাজনীতিতেও এই ঘটনা ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র তরজা।
পুলিশের এক আধিকারিক জানান, ‘ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। তথ্যপ্রযুক্তি এবং গোপন সূত্রের সাহায্যে তাঁদের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। শেষ পর্যন্ত দু’জনকেই গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে।’ পুলিশের দাবি, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার পুরো ছক এবং আরও কেউ যুক্ত ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে। বুধবার তাঁদের শ্রীরামপুর আদালতে হাজির করানো হবে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনায় রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে অভিযুক্তদের পরিচয় নিয়ে। বিজেপি (BJP) এবং সিপিএম (CPM) -এর অভিযোগ, ধর্ষণে অভিযুক্ত মূল যুবক এলাকায় নিজেকে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) -এর কর্মী এবং সিভিক ভলান্টিয়ার পরিচয়ে প্রভাব খাটাতেন। বিরোধীদের দাবি, দীর্ঘ দিন ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ ছিল, কিন্তু শাসকদল ও পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বিজেপির এক নেতা দাবি করেন, ‘অভিযুক্ত শাসকদলের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় দাপট দেখাত। এতদিন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলেই এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটল।’ উল্লেখ্য, এই অভিযোগের জবাবে তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি দলের কেউ নন। দলের এক মুখপাত্র বলেন, ‘যাঁরা অপরাধ করেছে, তারা যে দলের নামই ব্যবহার করুক না কেন, তৃণমূল কোনও ভাবেই তাদের সমর্থন করে না।’ দলীয় সূত্রের দাবি, অভিযুক্তের সঙ্গে দলের কোনও সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই এবং তাঁকে আড়াল করার প্রশ্নই ওঠে না।
পুলিশও গ্রেফতারির পর করে জানিয়েছে, অভিযুক্ত কখনও সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেননি। এক পুলিশ আধিকারিকের কথায়, ‘তদন্তে এমন কোনও নথি পাওয়া যায়নি, যাতে প্রমাণ হয় তিনি সিভিক ভলান্টিয়ার।’ তবে বিরোধীদের দাবি, ঘটনার শুরু থেকেই অভিযুক্তকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রথম দিকে অভিযুক্তের পরিচয় নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, তা ইচ্ছাকৃত ভাবেই করা হয়েছিল।এই মামলার প্রেক্ষাপটে বন্ধ হিন্দমোটর কারখানার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ থাকা এই কারখানা এলাকায় পর্যাপ্ত নজরদারি নেই বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে অসামাজিক কাজকর্মের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে এলাকা। স্থানীয় এক বাসিন্দার কথায়, ‘দিনের পর দিন এখানে নানা লোকজন আসে। প্রশাসনের নজর নেই বললেই চলে।’ এই ঘটনায় কারখানা চত্বরে নিরাপত্তা বাড়ানো এবং অবাঞ্ছিত প্রবেশ বন্ধ করার দাবি উঠেছে।
নাবালিকা নির্যাতনের ঘটনায় রাজ্য জুড়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে রাজনীতিতেও। মানবাধিকার সংগঠনগুলি ঘটনার দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, ‘নাবালিকার উপর এমন অপরাধ সমাজের জন্য লজ্জাজনক। দোষীদের দ্রুত সাজা নিশ্চিত করতে হবে।’ একই সঙ্গে নির্যাতিতার পরিবারকে সব রকম আইনি ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার দাবিও উঠেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনায় একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। নাবালিকা হওয়ায় পকসো আইনের কঠোর ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের দীর্ঘ মেয়াদের কারাদণ্ড হতে পারে। এক আইনজীবীর মন্তব্য, ‘এই ধরনের মামলায় প্রমাণ সংগ্রহ ও সাক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ যদি সঠিক ভাবে তদন্ত করে, তবে দোষীরা রেহাই পাবে না।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বন্ধ হিন্দমোটর কারখানায় নাবালিকা নির্যাতনের ঘটনা শুধু একটি অপরাধের খবর নয়, বরং প্রশাসনিক নজরদারি, রাজনৈতিক দায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আরও দু’জন গ্রেফতার হওয়ায় তদন্ত এক ধাপ এগোলেও, এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর বাকি। নির্যাতিতার পরিবার ও সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, ‘দোষীদের শাস্তি হোক, আর ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে।’
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : UP minister attack, Sanjeev Singh Gond convoy | মন্ত্রীর কনভয়ে হামলার চেষ্টা! উত্তরপ্রদেশে চাঞ্চল্য, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার, পলাতক দুই যুবককে খুঁজছে পুলিশ




