Sasraya News Sunday’s Literature | Edition 95| 11th January 2026| সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল, ১১ জানুয়ারি ২০২৬| সংখ্যা ৯৫

SHARE:

সম্পাকীয়

বাংলা সাহিত্য কেবলমাত্র কিছু গ্রন্থ, কবিতা কিংবা গল্পের সমষ্টি নয়, আসলে তা জীবন্ত উত্তরাধিকার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে বাঙালির আত্মপরিচয়ের ভিত নির্মাণ করেছে। এই সাহিত্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের ইতিহাস, সংগ্রাম, প্রেম, দ্রোহ, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিকতার বহুমাত্রিক রূপ। বিশেষ করে, সাহিত্যের কিছু আলোচিত অধ্যায়, যেগুলি সময়কে অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক।বাংলা ও বাঙালির এক অমূল্য সম্পদ। লক্ষ্যণীয় যে, বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি যুগ নিজস্ব আলো ও ছায়া নিয়ে হাজির হয়েছে। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে যেমন আমরা পাই জীবনের দৈনন্দিন লড়াই ও লোকজ বিশ্বাসের প্রতিফলন, তেমনই নবজাগরণের সাহিত্যে উঠে আসে যুক্তিবাদ, সমাজ সংস্কার ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রশ্ন। বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে বিশ্বমানবতার আহ্বান, নজরুলের লেখনীতে বিদ্রোহ ও সাম্যের বজ্রনিনাদ, সামগ্রিকভাবে বাংলা সাহিত্য বিশাল মহাকাব্যিক ধারার মতো প্রবাহিত হয়েছে।

এই আলোচিত অধ্যায়গুলির বিশেষত্ব এখানেই যে, কেবল সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য স্মরণীয় নয়; সমাজকে প্রশ্ন করেছে, মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছে। দারিদ্র্য, শোষণ, নারীজাগরণ, সাম্প্রদায়িকতা, স্বাধীনতা, অস্তিত্বের সঙ্কট, সব বিষয়ই সাহিত্যের পাতায় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাস্তববাদী নির্মমতা, তারাশঙ্করের গ্রামীণ সমাজচিত্র, বিভূতিভূষণের প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্লীন সম্পর্ক, এসবই বাঙালির চেতনার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক পর্বে এসে বাংলা সাহিত্য আরও জটিল ও বহুমুখী হয়েছে। নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা, রাজনৈতিক হতাশা, আত্মপরিচয়ের সঙ্কট, ভাঙা সম্পর্ক ও ভাঙা ভাষা, এ সবই সাহিত্যের নতুন অধ্যায়ে জায়গা পেয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এই সময়ের সাহিত্য কঠিন, দুর্বোধ্য। কিন্তু আসলে এ-ও আমাদের সময়ের সত্য, এ-ও বাঙালির বাস্তব অভিজ্ঞতার দলিল। এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা সাহিত্যকে দ্রুত বিনোদনের সঙ্গে তুলনা করি, তখন মনে রাখা জরুরি যে, সাহিত্য কখনওই ক্ষণস্থায়ী নয়। গভীরভাবে ভাবার বা উপলব্ধি করার বিষয়। আলোচিত অধ্যায়গুলিকে পুনর্পাঠ করা মানে নিজের শিকড়কে নতুন করে চেনা। বাংলা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এই সাহিত্যিক সম্পদকে লালন করা, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব। এই সম্পাদকীয়র মাধ্যমে আমরা সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মনে রাখতে হবে, আলোচিত বিষয়টি আমাদের অতীতকে যেমন স্মারক করায়, তেমনি আমাদের ভবিষ্যতের পথনির্দেশকও। বাংলা ভাষা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন এই সাহিত্যই বাঙালির আত্মার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।🍁

 

 

 

🍁মহামিলনের থা

 

নকে বশ কর—
দেখো, মন একটি দুষ্ট বালক— প্রহার করিলে তাকে বশ করিতে পারিবে না। প্রথমে, তাহার বশে যাইতে হইবে, অন্যায় করিলে বুঝাইতে হইবে, দিবারাত্র তাহাকে পাহারা দিতে হইবে। শ্বাস-প্রশ্বাসরূপ প্রহরী দুইটার হাতে জপরূপ চকচকে হাতিয়ার খানা দাও, তাহারা মনের শরীর রক্ষা করুক। কিছুদিন পাহারা দিবার পর মন যে চক্ষু লইয়া ব্রহ্মাণ্ড পরিভ্রমণ করে, সে চক্ষু দুইটি আপনা আপনি নষ্ট হইয়া যাইবে। একটি নূতন চক্ষু ফুটিবে, তখন সে শান্তশিষ্ট হইয়া যাবে। হৃদয়ে, কণ্ঠে, ভ্রুমধ্যে, সহস্রারে যে স্হানে রাখিবে, সেই স্হানেই স্হির ভাবে থাকিবে।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক— ইহারা জ্ঞানেন্দ্রিয়। বাক্, পানি, পাদ, পায়ু, উপস্থ— ইহারা কর্ম্মেন্দ্রিয়। উভয় ইন্দ্রিয়ের রাজা মন। ইন্দ্রিয়গণ তোমার উপর কর্তৃত্ব করিতেছে। তুমি দেহ নও— সেকথা ভুলাইয়া রাখিয়াছে। সেইজন্য তোমার যাতায়াত নিবৃত্তি হইতেছে না।

চক্ষু দেখিল— তজ্জন্য পাপ পুণ্য চক্ষুর, কিন্তু চক্ষুর রাজা মন তোমায় বুঝাইয়া দিল— তুমি দেখিয়াছ, এ তোমার পাপ পুণ্য। এই অভিমান হেতু তোমার যাতায়াত নিবৃত্তি হয় না। তাহারা কর্তৃত্ব করিয়া বড় কষ্ট দিতেছে। চক্ষু, কর্ণ এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়গণও এইরূপ করিবে আর ইন্দ্রিয়ের রাজা মন, সে তোমাকে নষ্ট করিবার জন্য ইতস্ততঃ ছুটাছুটি করিবে। তাই মনকে আগে বশ করিতে হইবে। মন যখনই কোন অন্যায় করিয়া বলিবে— এ পাপ তোমার, তুমি অমনি বলিবে— আমি তো জড়, আমার তো কোনো শক্তি নাই, তুমি বলাও তাই বলি, তুমি করাও তাই করি, এ পাপ-পুণ্য তোমার, এ বোঝা আমার কেন নাথ! এই বলিয়া মনের বোঝা ভগবানের চরণে ফেলিয়া দাও— পাপ-পুণ্যের বন্ধন আসিবে না। এইরূপে মন অবিরত ভগবদসঙ্গ করিলে সেও ভগবান হইয়া যাইবে এবং স্বরূপে বিশ্রান্তি লাভ করিবে। 🍁—অনন্তশ্রীঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব

 

 

🍂ধারাবাহিক উন্যাস

 

কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

ব্দদের রাত্রি

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

১৪

নদীর বুকে সময়ের পদচিহ্ন

রাতের শহর ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু নদী এখনও জেগে আছে। নদীর ধারে বসে হিরণ্য ভাবছে,
—সময়ের কোনও রূপ আছে কি? তার সামনে জল ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে, যেন প্রতিটি তরঙ্গের গায়ে অদৃশ্য অক্ষরে লেখা আছে একেকটা স্মৃতি। সে চোখ মেলে দেখছে, কিন্তু চোখের ভেতরেই জল জমে উঠছে। তার হাতে পুরনো এক নোটবই, পাতা খুললেই অক্ষরগুলো ভেসে যায়, শুধু গন্ধটা থেকে যায়, কাগজের গন্ধ, আর অসমাপ্ত কবিতার গন্ধ।
হিরণ্যর পাশে এসে দাঁড়াল নবীন, সেই ঘড়িওয়ালা মানুষ। তার হাতে একটা বন্ধ ঘড়ি।
বলল,
–এই ঘড়িটা অনেকদিন আগেই থেমে গিয়েছে, কিন্তু তুমি জানো, এটি এখনও সময় মাপে?
হিরণ্য চমকে উঠল,
–থেমে থাকা জিনিস সময় মাপে কীভাবে?
নবীন হাসল,
–থেমে থাকা মানেই তো সময়ের আরেক রূপ। যা থামে, সেটাই সময়ের শুরু। গতিই যদি সব হত, মৃত্যু কেবল ছুটি হত।
হিরণ্য নীরব রইল। নদীর জলে চাঁদের প্রতিফলন কেঁপে উঠছে। নবীন ধীরে বলল,
–আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা আসলে নিজেদের সময়ের ভূত। নিজেদেরই প্রতিধ্বনি শুনে জীবন পার করি। তোমার কবিতাগুলোও তেমন, ওগুলো তোমার নয়, সময়ের ধার নেওয়া।
হিরণ্য হেসে বলল,
–তাহলে সময়ই কবি?
নবীন গম্ভীর স্বরে বলল,
–সময় কবি নয়, পাঠক। সে আমাদের প্রতিটি শব্দ পড়ে, তারপর চুপ করে থাকে। আমরা ভাবি সে বোঝেনি, অথচ সে আমাদের মাপছে।

সোমদত্তা তখন ঘরে ফেরে। দিনের পর দিন এক অদ্ভুত ক্লান্তি তার মধ্যে ঘন হয়ে জমেছে। সে আয়নার সামনে বসে, আয়না আজ নড়ে না, শুধু নরম আলো ছড়িয়ে দেয়। আয়নার ভিতরে আজ কেউ নেই, শুধু নিজস্ব প্রতিফলন। সে বলে ওঠে,
–আমি কি এখন সময়ের অন্তরালে দাঁড়িয়ে?
আয়না উত্তর দেয় না, কিন্তু কাচের ওপর হালকা অক্ষরে ফুটে ওঠে কয়েকটি শব্দ, সময়কে খুঁজে পেতে চাইলে, নীরবতাকে শেখো।

দূরে গাছের ছায়া কেঁপে উঠল। বাতাসে এক মৃদু সুর ভেসে এল।মীরার গলা। হিরণ্যর চোখ ভিজে উঠল। নবীন উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলল, যে নদীকে দেখছ, তার জল তোমার মতোই ভাবছে, সে কোথায় শুরু হয়েছিল, আর কোথায় শেষ হবে!
হিরণ্য নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, –শেষ বলে কিছু নেই, তাই না? বাতাসের ভেতর যেন কারও কণ্ঠ ভেসে এল,
–শেষ হলেই তো গল্পের মানে তৈরি হয়।
সে বুঝল না, কণ্ঠটা তার নিজের মাথার ভেতর থেকে এল, নাকি জলের ওপাশ থেকে।

এদিকে শহরের অন্য প্রান্তে, বেল্লা স্কুলের মাঠে একা দাঁড়িয়ে। রাতের ঘাসে জ্যোৎস্নার ফোঁটা লেগে আছে। সে স্কুলের খেলার বেঞ্চে বসে নিজের লেখা কাগজ খুলল। তাতে সে লিখেছে,
–মানুষের মুখগুলো এখন আয়না নয়, মুখোশ।
কিন্তু তারপর নিজেই লেখাটা মুছে দিল, কারণ হঠাৎ মনে হল, হয়ত মুখোশও এক প্রকার সত্য। হয়ত মানুষ যত মুখোশ পরে, তার প্রতিটিই একেকটা সত্তা, একেকটা দার্শনিক অভিব্যক্তি। সে ভাবছে, যদি সবাই নিজের মুখ খুলে দেয়, তবে পৃথিবী বোধহয় ভেঙে পড়বে। মুখোশই হয়ত এই সভ্যতার চূড়ান্ত রক্ষাকবচ।
হঠাৎ পেছনে কারও কণ্ঠ,
–তুমি কাকে লিখছ?
সায়ো দাঁড়িয়ে। তার চোখে মায়া, কিন্তু মুখে কঠিন হাসি। বেল্লা বলল,
–নিজেকেই লিখছি।
সায়ো বলল,
–নিজেকে লিখতে পারলে তুমিই তো ঈশ্বরের সমান। কিন্তু কেউ কি পারে?
বেল্লা তাকাল,
–তুমি পারো?
সায়ো উত্তর দিল না, শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, –আমাদের মধ্যে যাদের মুখোশ টিকে থাকে, তারাই বাঁচে।

দূরে স্কুলের ঘণ্টা বাজল, অথচ স্কুল বন্ধ। তারা দু’জনেই এক মুহূর্ত চুপ রইল। তারপর বেল্লা ধীরে বলল,
–যদি মুখোশটাই মুখ হয়, তবে আমি কোনটা?
সায়ো তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
–যেটা তুমি ভাঙতে ভয় পাও, সেটাই আসল।

শহরের অন্য পাশে, সোমদত্তা তখন ঘরে ফেরে। দিনের পর দিন এক অদ্ভুত ক্লান্তি তার মধ্যে ঘন হয়ে জমেছে। সে আয়নার সামনে বসে, আয়না আজ নড়ে না, শুধু নরম আলো ছড়িয়ে দেয়। আয়নার ভিতরে আজ কেউ নেই, শুধু নিজস্ব প্রতিফলন। সে বলে ওঠে,
–আমি কি এখন সময়ের অন্তরালে দাঁড়িয়ে?
আয়না উত্তর দেয় না, কিন্তু কাচের ওপর হালকা অক্ষরে ফুটে ওঠে কয়েকটি শব্দ, সময়কে খুঁজে পেতে চাইলে, নীরবতাকে শেখো।
সেই রাতে সোমদত্তা একটা স্বপ্ন দেখে। সে হাঁটছে সেই মেলায়, কিন্তু মেলা নেই, কেবল একটি বিশাল নদী। নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে জ্যোতিশ্মী, তার হাতে প্রজাপতির ছায়া। জ্যোতিশ্মী বলছে,
–তুমি ভয়কে বিক্রি করেছ, এখন তোমার আলো অতিরিক্ত। অতিরিক্ত আলোয় অন্ধকারের অস্তিত্ব বোঝা যায় না। ফিরে যাও, আলোকে নিভাতে শেখো। সোমদত্তা বলে,
–অন্ধকার কি ক্ষতি করে? জ্যোতিশ্মী মৃদু হেসে বলে,
–না, অন্ধকারই তো আলোকে ব্যাখ্যা দেয়।
জলধারারের ওপর চাঁদ তখন কেবল আধখানা। সোমদত্তা চাঁদটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে, হয়ত মানুষও তাই, অর্ধেক দেখা, অর্ধেক লুকানো। সম্পূর্ণ হলে অর্থ হারায়, অসম্পূর্ণতাই তাকে সুন্দর রাখে।
হঠাৎ নদীর ভেতর থেকে একটি শব্দ ওঠে, একটি বই ভেসে আসছে। সে বই তুলে নেয়, খুলে দেখে, প্রতিটি পাতা ফাঁকা। কিন্তু যখন সে চোখ বন্ধ করে, তখন পাতাগুলো নিজের থেকেই লেখা হয়ে যায়, প্রতিটি অক্ষর একেকটি চিন্তা, একেকটি অভিজ্ঞতা, একেকটি অপরাধবোধ। বইটা যেন তার নিজের জীবন, যা সে কখনও লেখেনি, কিন্তু সময় তার হয়ে লিখে দিয়েছে। সকালে চোখ খুলে দেখে, বইটা নেই। টেবিলের ওপর পড়ে আছে একখানা পুরনো ঘড়ি। সময় থেমে আছে সেই মুহূর্তে, যখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। এবং ঘড়ির কাঁচের ভিতর সে নিজের মুখ দেখতে পেল। মুখ নয়, বরং জলের ঢেউ।
বাইরে হালকা আলো ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের রাস্তায় মানুষগুলো আবার চলতে শুরু করেছে। সোমদত্তা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে, এই চলার মাঝেই কোথাও থেমে থাকার প্রয়োজন আছে। সময়ের মানে হয়ত গতি নয়, থেমে থাকার সাহস। নদী তখনও বইছে: নীরবে, অবিরত। 🍁(চলবে)

 

 

 

🍂কবিতা 

 

 

নাসির ওয়াদেন -এর একটি কবিতা

অনন্ত-যাপন

ছায়ার পেছনে অন্ধকারকে খুঁজি
পেয়ে যাই এক অনন্ত যাপনকথা
নদীর ভাঙাজলে ভবিষ্যতের শিল্প
ভেসে আসে
একটা দু’মুখো ঝরণার কাছে
আপন সত্তাকে ভিজিয়ে নিই জলে

অন্ধকার যাপন নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ
ভালোমন্দ যাহাই থাকুক
মাটির গভীরে সভ্যতার বাহন জেগে

নিরাসক্ত জীবনের সকল আনুষঙ্গিক
ক্রিয়াকলাপ অক্ষরের স্রোতে ভাসমান

পাখির নগ্ন ছায়ায় খুঁজে চলেছি
অসংলগ্ন সভ্যতার প্রকৃত স্বরূপ
যার ভেতর খেলা করে অন্ধকার যাপন।

 

 

অনিন্দিতা শাসমল -এর একটি কবিতা

অনেকদিন হল

অনেকদিন হল–
তোমার সঙ্গে ট্রেন বা বাসের জানালায় একসাথে চোখ রাখি না আর, যেটা আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল।

অনেকদিন হল–
তোমার জন্য অভিমানে চোখের জল ফেলি না আর। ততদিন ফেলতাম, যতদিন জানতাম, সেই জল একটি আঙুল দিয়ে মুছে ঠিক বুকে টেনে নেবে‌ আমায়।

অনেকদিন হল–
তোমাকে ফোন করবো করবো করেও করা হয়ে উঠলো না আর। ততদিন নিয়ম করে সারাদিনে অন্তত দশবার করতাম, যতদিন জানতাম মোবাইলের স্ক্রিনে তোমার দেওয়া গোপন নামটা কখন ফুটে উঠবে, দেখার আকুল অপেক্ষা ছিল তোমার।

অনেকদিন হল–
তোমাকে মেসেজ করতেও ভুলে গেছি। দু’ঘন্টা অন্তর তোমার খোঁজ নিতাম মেসেজ করে, যতদিন তুমি অভিমানে ঠোঁট ফোলাতে, সঙ্গে সঙ্গে তোমার মেসেজ দেখে উত্তর না দিলে,আমি মেসেজ না করলে।

অনেকদিন হল–
তোমার জন্য কষ্টও হয় না আর।
কাজের মধ্যে এতটাই ডুবিয়ে দিয়েছি নিজেকে, একবার খোঁজ নিয়ে দেখো, ঠিক তোমার মতোই ব্যস্ত হয়ে গেছি আজ।

এই সবকিছুই অনেকদিন হল।
তবু, হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে খুব যত্নে রেখে দিয়েছি আমাদের বড্ড দামী মুহূর্তগুলো…

 

 

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম -এর একটি কবিতা

লীনতাপ ছাই

মেঠোপথ জুড়ে ঝরাপাতাদের মিছিল
রুগ্ন, রুক্ষ পাতাদের গায়ে আগুনের হলকা
লাজুক মেঘেদের আনাগোনায়
আকাশে তখন রঙের সমারোহ
পাঁজরে শ‍্যাওলা জমা বাড়িটি
ঠায় দাঁড়িয়ে দেখে শ‍্যামলা উঠোনের রিক্তবুক
সাবেকিয়ানার পোড়া গন্ধ,
দূরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওড়ে।
রাত হলে কারা যেন খানিক সময় কাটায়
এখানে ওখানে পরিত‍্যক্ত চিহ্ন রেখে যায়।
কুয়াশা-ঢাকা পথে সন্ধ‍্যে নেমে এলে,
দূরে গাড়িচলা শব্দের ফাঁকে রেল চলে
শীতের পারদ নামে তুষারহীন এ অঞ্চলে
মনের ভিতরে বিঁধে অতৃপ্ত কাঁটা।
আগুনের উত্তাপে জ্বলে ওঠে শীত,
জ্বলে কুয়াশায় ভেজা লতা-পাতা, আবর্জনা।
বাড়িটির অঙ্গ-প্রত‍্যঙ্গ আলোকিত হয়
আগুন নিভলে ভ্রষ্টরাত চাপে উঠোনের বুকে
লীনতাপ শুয়ে পড়ে ছাই-এর উদরে।
চারদিকে দহন উৎসবের সূচনায়
বাড়িটি দাঁড়িয়ে দেখে দহনবিলাসী
পরিযায়ীদের আনাগোনা।

 

 

সমিত মজুমদার -এর একটি কবিতা

মহীরুহ

একটি মহীরুহের স্বপ্ন দেখার
সাহস করেছিলাম,
দূর থেকে তার একটা নিবিড়
ছায়াতল দেখেছি,
সেই ছায়া দেখে মনে হয়েছিল
তা যেন উঠোন-জোড়া,
তার নিচে যেন স্নিগ্ধ শান্তির আছে এক পর্ণকুটির।
যেখানে হয়তো
নেওয়া যায় অনায়াসে এক আশ্রয়।
গোপন সেই সুখের আশায়
থেকে যাওয়া যায় নিবিড়ভাবে,
দরকারে গুটিশুটি হয়ে,
ঠিক কাটিয়ে দেওয়া যাবে বাকিটা জীবন।
আশায় আশায় বুক বেঁধে
ক্রমশ এগিয়ে চলি,
সেই নিবিড় ছায়াতলের দিকে…
কিন্তু এ কি…
যত এগোতে থাকি ততই ছায়াতলও সরে,
আমি গতি বাড়াই, তবু্ও ছায়াতল সরে,
আরও দূর থেকে দূরে…
ছায়াতল ছোট থেকে আরও ছোট হয়
হারাতে থাকে তার ছড়ানো কাণ্ড,
একে একে শাখা-প্রশাখা, লতাপাতা,
ক্রমশ হারিয়ে যায় গোটা বৃক্ষই…
চারদিক যেন সবুজহীন
একটি রুক্ষ ভূমিতে রূপান্তর ঘটে যায়
সময়ের তালে তালে।
আমি একলা দাড়িয়ে থাকি,
রুক্ষ ভূমির উপর দাড়িয়ে
উপরের দিকে চেয়ে থাকি এক মনে…
এখনও আকাশের রঙ নীল,
সেই নীল আকাশে
ধীরে ধীরে জমছে কালো মেঘ,
বৃষ্টি আসবে নিশ্চিত
বুক বাঁধি, শ্রাবণ ধারার আশায়…
শীতল করব শরীর।

 

 

প্রিয়াংকা নিয়োগী সনি -এর একটি কবিতা

নিঃশব্দ

চুপিসারে কথা হয়ে যায় মনের সাথে মনের
কোন ভোরে জোনাকি অপেক্ষারত সন্ধ্যাকালের
ফিস ফিস করে মাছরাঙা হাঁসফাঁস দৌঁড় হাসের
নতুন পথে নতুন কুঁড়ি নজরে সকলের।

কথা গড়িয়ে যায় চুপ থাকতে হবে বলে
সময় দেবে বলে কিছু প্রতিউত্তর।
সড়ে যেতে হয় নিঃশব্দে শেষ অবস্থানের
অনুভব করাতে হয় হাবভাব আচরণের।

নিঃশব্দ শব্দ রচনায় গহীন বাণী ব্যক্ত হয় সমুদ্রে
অলীক কল্পনা ভেসে বেড়ায় মনের বিশ্বে।

আসে মাঘ আসে পৌষ বাক্য রচনাতে।
সাক্ষী থাকে বুঝ মন মনের শান্ত ঘরে।
উত্তর চলে নীরব ভূমিকাতে সময়ের দাপড়া-দাপড়িতে।
প্রতিফলন ঘটে চুপচাপ বাক্যালাপে কার্যকারণে।
আসে জেদ নতুন সৃষ্টিশীলে কথাহীন শব্দ জোগায়
নিঃশব্দ জেতায় ভোরের ভূমিকায়।

 

 

শর্বাণীরঞ্জন কুন্ডু -এর একটি কবিতা

চাল বেচাল

আমরা জানতেও পারি না কোন ছিদ্র দিয়ে সর্বনাশ ঢোকে।
তাই যখন কিছু করবে চুপচাপ ধীর গতিতে কোরো।
বেশী প্রচার কোরো না।
শম্বুক গতিতে এগিয়ে যাও।
অনেক মানুষ ওৎ পেতে বসে থাকে ঈগলের মতো।
কখন যে ছোঁ মারবে তুমি জান না।

কিছু মানুষ আছে যাদের খেলা পন্ডতেই আনন্দ।
এরা কারো ভাল দেখতে পারে না,
কোনো কিছু ভাল দেখতে পারে না।
তারাও ওঁৎ পেতে বসে থাকে
কখন কোন খেলা পণ্ড করা যায়।
এরা কিন্তু মানুষের মনঃস্তত্ব ভাল বোঝে।
চট করে বুঝতে পেরে যায়
কোন মানুষের কী দুর্বলতা।

এমন মানুষও আছে
যারা দাদার গৌরব ছুঁতে পারে না বলে
দাদার গর্বে গর্বিত হয় না।
দাদার গর্বে তারা নিজেদের ছোট মনে করে।

এ পৃথিবী আজব জায়গা।
সৃষ্টিশীল মানুষ যেমন আছে
কুদৃষ্টির মানুষও প্রচুর পাবে।
তাই ভাই প্রতিটা পা ফেলো ভেবে ভেবে, চিন্তা করে।
বেচালগুলো তবেই ধরতে পারবে।

 

 

লিপিমিতা তনুশ্রী -এর একটি কবিতা

পারাপার 

এপার ওপার পারাপার সারাবেলা
ভোরের আলোয় কুসুম কোমল কথা,
এই তো নদী- কত জনমের কথা
বুকের মধ্যে ঢেউ তোলা নীরবতা,
ওই যে মাঝি, ভাটিয়ালি সুর গায়
নদীর সাথে মিলেমিশে সে সুর বুঝি
দূর গগনের উদাসী মন ছায়;
একূল-ওকূল দুকূল জুড়ে পাড়
ভাঙা-গড়ায় জীবন তোলপাড়
খেয়ালী স্রোত আছড়ে পড়ে তটে
ভরাডুবির সময় যখন আসে,
আবার কোনও নতুন দিশা মেলে
আলোর পথে জীবন ছন্দে ফেরে।

 

 

রবীন প্রামাণিক -এর একটি কবিতা 

তখন মা আমাকে সব দিয়ে যায়, এখনও

আমার মাকে আমি কখনো রঙিন শাড়ি পরতে দেখিনি
কখনো গয়না পরতে দেখিনি ,কখনো সাজতে দেখিনি
মায়ের কোন সখ আল্হাদ ও দেখিনি –
দেখেছি মায়ের চোখে কর্তব্যের আগুন-অঙ্গীকার,
বুকের গভীরে নিঃশব্দে আর্তনাদ
মা – আমি কিছুই দিতে পারিনি –
ভাল জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতে পারিনি
কিছু উপহার দিতে পারিনি,
সকলের সব প্রয়োজন মিটে গেছে সব
কেবল মায়ের কিছুতে প্রয়োজন হয়নি
মায়ের কোন কিছুতেই প্রয়োজন হয় না

শুধু কর্তব্যের যন্ত্রণায় মায়ায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে সব ,
ভেসে যাওয়া মেঘের চোখে –
একদিন মুছে গেছে সব ভোরের শিশির- আকাঙ্ক্ষায়

আজও ভোরের শিশিরের সাথে শীত এলে –
খেজুর রসের গন্ধ নিয়ে , চাল কোটার শব্দ নিয়ে
তুলসী তলায় সন্ধ্যার প্রদীপ হাতে
বর্ষার দুপুরে কাঁথা শিলাইয়ের অখণ্ড অবসরের মত
জৈষ্ঠে, পাকা আমের গন্ধে
ভাদ্রের তাল পড়ার শব্দের সাথে
ফিরে ফিরে আসে আমার মা –

আমাদের বাগানে বকুলের গন্ধ বয়ে আনে প্রাণে,
তখন মা আমাকে সব দিয়ে যায়, এখনও।

 

🍁ধারাবাহিক উন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হল সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র  করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ। আজ প্রথম পর্ব।

হারিয়ে যায়া নারীর ইতিথা


মমতা রায় চৌধুরী

 

১.

কাগুজি মাসি

‘না আর পারা যাচ্ছে না’।
বুবনকে রেডি করাতে করাতে কথাগুলো সমানে বলে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ ওর কথার কোনও রিপ্লাই দিচ্ছে না। অবশেষে হাতে থেকে বাসনগুলো এত জোরে ফেলে দিল বাসনের ঝনঝনানিতে পবিত্রের ঘুম ভেঙে গেল, অবাক চোখে তাকিয়ে তিথির দিকে। কিছু বোঝার আগেই তিথি তারস্বরে চিৎকার করে উঠল,
–সংসারটা কি শুধু আমার একার সব ভাবনাচিন্তা আমার মাথায় দিয়ে দিব্যি নাক ডেকে ঘুমোচ্ছ।
–আরে বাবা আমি আবার কি করলাম, হঠাৎ তুমি রেগেই বা গেলে কেন?
—তুমি জানো না আজ থেকে আমার স্কুলে পরীক্ষা শুরু।’
অবাক হয়ে পবিত্র বলল, হ্যাঁ জানি তো।
–এতগুলো কাজ সামলে আমি কি করে পরীক্ষা হলে ঢুকব বলো?
–এতগুলো কাজ মানে সুনয়নাদি আসেনি।
–সেই জন্যই তো এত কথা।
এবার আসল কারণ বুঝতে পারল পবিত্র ঝড় ওঠার আগের পূর্বাভাস।
–ঠিক আছে তুমি চলে যাও।
–হ্যাঁ সে আর আমি জানি না সেই তো ফিরে এসে দেখব, যেখানে যেটা সেখানে সেটাই সেটাই আছে।
–ট্রাস্ট মি ডিয়ার।
–কি হল, কোনও উত্তর দিলে না।
–এরকম প্রশ্ন অনেকবার দেওয়া হয়েছে উত্তরও দেওয়া হয়েছে।
–মেলা না বকে সুনয়না দি আসছে না কেন? একবার খবর নাও না।
–কাগজি মাসিকে তো দেখা যায় না।
সুনয়নাদি না আসলে আমাদের সংসারে উন্নয়ন নেই। এবার আসি সুনয়না সম্পর্কে।

কিন্তু সেদিনও কাস্টমার রেডি আর আমি নতুন আমাকে দিয়ে তাদের ব্যবসাটা অনেক বেশি ভাল হচ্ছে যে, কাস্টমার আসছে আমাকে এই পছন্দ করছে আমার নিস্তার নেই। এভাবেই কাস্টমার আসবে আমার সঙ্গে যথেচ্ছাচার ব্যবহার করবে, যেমন খুশি করবে, তারপর আমাকে একটু ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হয়।

সুনয়না আমাদের কাজের মেয়ে। মেয়ে বললে ভুল হবে বউ। তবে এই সুনয়নাকে এই বউ হতে গিয়ে অনেক বাধা-বিপত্তি পেরতে হয়েছে। আমাকে লিখতে বলেছিল গল্প কাগুজি মাসি। লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত শুনে বুকটা ফুলে উঠেছিল কাগজি মাসির। বলেছিল, বৌমা আমাদের নিয়ে গল্প লিখবে তখন পাত্তা দিইনি পরে ভেবেছি না কথাটা ঠিক খেটে খাওয়া সমস্ত মানুষের কথা লেখার ক্যানভাসে তুলে ধরি।
একদিন বললাম,
–আচ্ছা কাগজি মাসি আমি তোমার কাছে যে সমস্ত তথ্য চাইবো তুমি দিতে পারবে?
–কী রকম তথ্য!
–এই ধরো তোমার বাড়ি তোমার অবস্থা আশেপাশে তোমাদের অবস্থা, মানে তোমাদের মত নারীদের জ্বালা যন্ত্রনা, বলতে পারো হারিয়ে যাওয়া নারীদের ইতিকথা। হ্যাঁ আমাদের কথা আর কে শোনে। আমার জীবনের কাহিনি শুনবে! বাসন মাজতে মাজতে চোখের জল গড়িয়ে পড়েছিল। হ্যাঁ। শুনব, আর লিখব। অবাক হয়ে কাগজি মাসির চোখের কোণে জল চিকচিক আর ঠোঁটের কোণে হাসি অর্থাৎ কোথাও যেন তাদের একটা মূল্য এই সমাজ দেবে এই আশাতে। বলতে শুরু করেন,
—কি বলব, ১৩৫০ এর সালের কথা মনে আছে?
–হ্যাঁ বইতে পড়েছি।
–আর আমরা জীবন দিয়ে পড়েছি।
সেই সাল এখনও আমাদের মনের ভেতরে দাগ কেটে যায়। বুকের ভেতরে কাটা-ছেঁড়া হয়। খাবারের জন্য লড়াই কাতারে-কাতারে গ্রাম থেকে শহরের দিকে যাত্রা। কিন্তু শহরের মানুষের নির্দয়তা তখন আরও বেশি স্পষ্ট হয়েছে পথ কুকুরের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে কত মৃতদেহ তাদেরকে ভাবার জন্য শকুনের দরবার। আর তাছাড়া উদ্বাস্তু মানুষের জ্বালা যন্ত্রণা উপশম হতে না হতে আর এক জ্বালা যন্ত্রণার সম্মুখীন হওয়া। কত মায়ের বুকের দুধ খেতে না পেয়ে শিশুর মৃত্যু। সে নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে কত মেয়ে এদিক-ওদিক চলে গেছিল। কত অসহায় বাবা টাকার বিনিময়ে মেয়েদেরকে বলির পাঁঠা বানিয়েছিল।
আমিও একদিন এভাবেই চলে গেছিলাম কোনও এক গলিতে।
এসব বলতে বলতে ই একটু থেমে গেল তারপর বলল কি বলব? পুরো যৌবনটা ওখানে চুষে খেল। মাসি আর দালালেরা তারপর ফিরে এলাম আবার আলাদা জীবনে এখন আর সেখানে আমার জায়গা নেই। শরীরটা শেষ এখন লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করি।
—তোমার কোনও বাচ্চাকাচ্চা নেই?
—আছে তো। ছেলে। সে দেখে না।
ছেলে বিয়ে করেছে ওদেরই সংসার চলে না বলে। আরে পেট তো পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। এ জ্বালা কমে না।
সত্যি কাগজি মাসে যখন কাজের জন্য এসেছিল তখন এত বয়স হয়ে গিয়েছে কাজ পারবে কিনা মনের ভেতরে একটা সন্দেহ ছিল কিন্তু সে বারবার অনুরোধ করাতে কাজে ঢোকানো হয়। এর কাজ খুব পরিষ্কার। একই জায়গা যে কতবার ধোয় তা ঠিক নেই বাসন কতবার ধোবে মেজে ফলে কাজ করতে অনেক দেরি হতো।
পা দু’টো হাজাতে ভর্তি।
তবে কাগজি মাসি যৌবনকালে সুন্দর ছিল আর সেই জন্যই বোধহয় তার ঠাঁই হয়েছিল পতিতালয়ে। তার এই পেশা সম্পর্কে বলতে গিয়ে কোনও লজ্জা হয়নি। তবে সে বলেছিল, সেই পেশার থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি।
এখনও বলতে গেলে তার চোখ দিয়ে জল পড়ে। সেও একটা সংসার চেয়েছিল যেখানে তার স্বামী থাকবে তার সন্তানেরা থাকবে। সুখ-দুঃখের সাথী হবে।
না, সে আশা তার পূরণ হয়নি হ্যাঁ তবে সন্তান হয়েছিল সে সন্তান তাকে নিতেই হয়েছিল কতবার আর সে আবরসন করাবে। তবে সে ইচ্ছাকৃত অনেকটা এই সন্তানকে রাখতে চেয়েছিল।
সেই সন্তানের ফসল মাজার।
–আচ্ছা মাসি তোমার ধর্ম কি?
সে হেসেছিল।
–হাসলে যে বড়ো?
–আরে মা আমি আমার নিজের ধর্মই এখন ভুলে গেছি।
–মানে?
ওখানে আমাকে রেহানা নামে ঢোকানো হয়।
–তার মানে তুমি হিন্দু?
একরাশ প্রশ্ন ছেড়ে দিলাম মাসির দিকে।
মাসি আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
–ওই যে বললাম, আমি নিজে জানি না এখন আমি কে!
–তোমার ছেলের নাম মাজার রাখলে কেন?
–সেটাও ভবিতব্য। কবে যে গোপালের নাম ভুলে গিয়ে রহিমের নামে এক হয়ে গেছে নিজেও জানি না। সে এক আলাদা ইতিহাস।
আমাকে যখন পতিতালয়ে নিয়ে আসা হয় যার হাত ধরে আমি এসেছিলাম সংসার করব, যার নাম আমি মনে মনে জপ করেছিলাম সেই ইনসাফ মিয়া।
আসলে একদিকে খাদ্য সঙ্কট অন্যদিকে, পরিবারে কন্যা সন্তান আরও অনেকগুলো সন্তান থাকার জন্য মা-বাবার কাছে অনেকটা অবাঞ্ছিত মনে হয়েছিল সেই সময়ে আমার কাছে দেবদূত বা ফেরেস্তা যাই বল– হয়ে আসে ইনসাফ। কি ভালই না বাসতো আমাকে! অন্তত আমি তা-ই জানতাম। আমিও তাকে মনেপ্রাণে ভালবেসে ছিলাম তাই ভালোবেসে তার সঙ্গে পাড়ি জমিয়েছিলাম।
কিন্তু সে আমাকে পতিতালয়ে নিয়ে আসে একরাশ বিস্ময় উৎকণ্ঠা আর ভয় গ্রাস করেছিল আমাকে আমি এই পরিবেশ কখনও আগে দেখিনি। চারিদিকে মেয়েদের কি এক অদ্ভুত চাউনি।
আমি প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম এইটা আবার কি রকম স্বামীর ঘর এতগুলো পরিবার একসঙ্গে।
আমি যখন তাকে প্রশ্ন করি,
–আমাকে এখানে আনলে এটা তোমাদের বাড়ি।
আমি তখন চিনলাম এটা কোনও ইনসাফ সে আমাকে বলেছিল,
–বাড়ি। হ্যাঁ বাড়ি তো। তোর জন্য এই বাড়িটাই একদম পারফেক্ট।
একজন মহিলা দেখছি তার গা হাত পা টিপে দিচ্ছে। পান চিবুচ্ছে আর আমাকে তার কাছে নিয়ে ফেলে দিল। বলল,
–মাসি দেখো তোমার পছন্দ হয় কিনা নতুন মাল আছে। একদম ঝাক্কাস।
মাসি একগাদা থুথু ফেলতে যাবে সেই ফেলার পাত্রটিও অন্য একজন এনে দিল। তারপর আমার দিকে এক অদ্ভুত চাউনিতে বলল,
–তা তুই ঠিক বলেছিস। ইনসাফ হাত কচলে বলল,
–তাহলে মাসি আমার আমানত তোমাকে দিলাম তুমি রিজার্ভ ব্যাংকে ফেলে দিও।
–সে আর বলতে।
মাসি কাকে একটা ইশারা করল। ঘর থেকে বেরিয়ে একগাদা টাকা ছুঁড়ে দিল ইনসাফের মুখে। এক লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল টাকাগুলোর উপর। আর আমাকে টেনে নিয়ে গেল অন্য সব মেয়েরা ঘরের দিকে। আমি শুধু চিৎকার করে বললাম, ইনসাফ তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। ইনসাফ আমার কোনও কথার উত্তর দিল না। ও-টাকা লুফে নিতে থাকল। আর ছোটকু বলে ছেলেটা আরও টাকা ছড়িয়ে দিতে লাগল। তখন আমার বুঝতে অসুবিধা হল। না ইনসাফ আমাকে ভালবাসেনি, ইনসাফ আমাকে বিক্রি করে দিল।
তখন থেকে বুঝতে পারলাম এটা আমার একটা অন্য জগত চারিদিক থেকে মেয়েদের এক ধরনের হাসি ফোয়ারা ছুটে আসলো তার মধ্যে একটি মেয়ে বলল,
–এই তোর এত হাসছিস কেন রে? দেখ নতুন মালটা দেখ।
মালা বলে একটি মেয়ে এগিয়ে এসে বলল,
–এই মাগী তো অনেক বেশি সুন্দর রে। আমাদের বাজারটা নষ্ট করতে এল।
তখনওবুঝিনি কিসের বাজার!
একরাশ বিষয় নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম ওদের দিকে।
উপরেই মাসি এসে বলে গেল,
–ওকে রেডি কর বড়বাবু ওয়েট করছেন।
–এই চল চল তোকে সাজিয়ে দি। একদিন তোকে শিখিয়ে দেব, এরপর থেকে নিজেকেই করতে হবে। কিরে মালতি তাই না?
–হ্যাঁ গো দিদি, ঠিক বলেছ।
আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেল আমি বললাম আমি এসব কিছু করব না। আমি চলে যাব এখান থেকে।
–তারপর
–তারপর আর বৌমা
সেই চলে যাওয়ার আমার হল না। আমি যে জেলখানায় বন্দী হয়ে গেলাম আমার খোঁজ কে করবে বলো! ভালবাসার নামে প্রতারিত হলাম।
–তারপর বলো…
–তারপর আমাকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে যাওয়া হল সেই বড় বাবুর ঘরে। ওহ কি বলব, বৌমা বয়স ষাটের কাছাকাছি মদ খেয়ে চুর হয়ে আছে। আমাকে দেখা মাত্রই জিভটা বের করে এক বিশেষ অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল, আমার এত গা ঘিনঘিন করতে লাগল, কি বলব তোমায়!
আমি তো ছুটে তার থেকে পালাতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না
আমি যে জেলখানায় বন্দী হয়ে গেছি, সেখান থেকে পালানো যায় না।
–তারপর কি করলে?
–তারপর আমি তো নারী থাকলাম না। আমি তো মাল হয়ে গেলাম সেখানে। সেই রাতে আমাকে যা যা করার দরকার তাই করা হল। সেই রাতটা আমি এখনও ভুলতে পারি না।
–তারপর?
–পরের দিন আমি এত ক্লান্ত কি বলব, বৌমা! কিন্তু সেদিনও কাস্টমার রেডি আর আমি নতুন আমাকে দিয়ে তাদের ব্যবসাটা অনেক বেশি ভাল হচ্ছে যে, কাস্টমার আসছে আমাকে এই পছন্দ করছে আমার নিস্তার নেই। এভাবেই কাস্টমার আসবে আমার সঙ্গে যথেচ্ছাচার ব্যবহার করবে, যেমন খুশি করবে, তারপর আমাকে একটু ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হয়। পরের দিন আবার এভাবেই চলতে থাকে আমার দিন। তারপর জানো তো আমি নিজেই অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম। যখন আমি বুঝতে শিখলাম, এটাই আমার ব্যবসা এখান থেকে বেরনোর আর কোনও আমার জায়গা নেই তখন এটাকেই ধরে নিয়ে আমিও নিজেকে সেইভাবেই তৈরি করলাম।
–কিন্তু মাসি তুমি নিজের সঞ্চয় বলে কিছু রাখনি কেন?
–এই ব্যাপারটা তখন আমি বুঝতে পারিনি। আমাকে বলেছিল, তোর টাকা তোরই থাকবে এই বয়সেই রোজগার করে নে, বয়স থাকতে থাকতে রোজগার না করলে বাবুরা আর তোর কাছে ফিরবে না তখন খাবি কি?
তখন ঠিক নেশার মতই পড়ে গেছিলাম আমাকে যে করেই হোক অনেক অনেক টাকা রোজগার করতে হবে। করেচি জানো, কিন্তু সেই টাকা আমার ভাগ্যে জোটেনি। জ্বর সামান্য আমাকে দিয়ে বাকি দালাল আর মাসিরা ভাগ করে নিত। তাই তো শেষ বয়সে আমার এখনও লোকের বাড়িতে কাজ করে খেতে হয়।
–সেই তো মাসি এই বয়স তো তোমার কাজ করার কথা নয়।
–কি বলব বৌমা? ওই যে বললাম পেটের জ্বালা বড় জ্বালা।
কথাগুলো শুনে খুব খারাপ লাগল, একটা মেয়েই তার কত স্বপ্ন থাকে সেই স্বপ্নগুলো কি এই ভাবেই ভেঙে যায় কত নারীর এভাবে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কে বা আমরা খোঁজ রাখি।
আজ কাগজে মাসি লোকের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে খাচ্ছে কিন্তু কতদিন শরীর যেত তার কিছুই নেই চলতে পারে না মানুষের দয়া মায়ার জন্য একটু করে কাজ দেয় যাতে সে খেতে পায়।

সত্যি মাসিকে দেখে এত কষ্ট হতে লাগল, মাসিকে আমি নিজের থেকে প্রতি মাসে আরো ১০০ টাকা বাড়িয়ে দিলাম। যে কদিনই বা কাজ করতে পারবে যদি কিছু টাকা সঞ্চয় করে রাখতে পারে।
কিন্তু আমি বলছিলাম, সুনয়নার কথা। সুনয়নার কথা বলতে গেলে এই কাগজি মাসির কথা আমাকে বলতেই হত। কারণ সুনয়নাকে কাগুজি মাসি এনেছিল। 🍁(চলবে)

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন