সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দেশীয় ইস্পাত শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বড় সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্র। ইস্পাতের কয়েকটি পণ্যের আমদানির ওপর আগামী তিন বছরের জন্য সুরক্ষামূলক শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছে ভারত সরকার (Government of India)। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক (Ministry of Finance) একটি বিবৃতিতে জানান, প্রথম বছরে ১২ শতাংশ হারে শুল্ক বসবে, যা ধাপে ধাপে কমে তৃতীয় বছরে ১১ শতাংশে দাঁড়াবে। সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ঘরোয়া অর্থনীতিকে রক্ষা করা এবং ইস্পাতের দেশীয় বাজারে ভারতীয় উৎপাদকদের অবস্থান আরও মজবুত করা।কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ (Nirmala Sitharaman) -এর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রকের এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে অর্থনৈতিক মহল। সংবাদসংস্থা রয়টার্স (Reuters) -এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের মূল নিশানা আসলে চিন (China)। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সস্তা ইস্পাত ও ইস্পাতজাত পণ্য চিন থেকে ভারতের বাজারে ঢুকে পড়ে। দামে সস্তা হওয়ার কারণে সেই সব পণ্য দ্রুত বাজার দখল করে নেয়, যার ফলে দেশীয় উৎপাদকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। মানের দিক থেকে এই পণ্যগুলি অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও কম দামের কারণে ক্রেতাদের আকর্ষণ করে।
অর্থ মন্ত্রকের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই শুল্কের স্থানীয় নাম ‘সুরক্ষামূলক কর’ বা সেফগার্ড ডিউটি (Safeguard Duty)। আগামী তিন বছরের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি ইস্পাত-পণ্যের উপর এই কর প্রযোজ্য হবে। প্রথম বছরে আমদানিমূল্যের উপর ১২ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে ১১.৫ শতাংশ এবং তৃতীয় বছরে ১১ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হবে। সরকারের মতে, ধাপে ধাপে শুল্ক কমানোর এই পদ্ধতি বাজারে হঠাৎ ধাক্কা না দিয়ে ধীরে ধীরে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। এই সিদ্ধান্তের আওতায় মূলত চিন, ভিয়েতনাম (Vietnam) এবং নেপাল (Nepal) থেকে আমদানিকৃত কিছু ইস্পাত-পণ্য পড়ছে। তবে সব ক্ষেত্রেই যে শুল্ক বসছে, তা নয়। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশকে এই শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্টেনলেস স্টিল (Stainless Steel) -এর মতো বিশেষ ধরনের ইস্পাত-পণ্যও এই শুল্ক থেকে ছাড় পাবে। এর ফলে শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিশেষ কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত চাপ পড়বে না বলেই মনে করছে সরকার।
আরও পড়ুন : Indian Talent in USA, Elon Musk Immigration Comment | আমেরিকার উন্নয়নে ভারতীয়দের বিশাল অবদান : অভিবাসন নিয়ে ইলন মাস্কের মন্তব্য আলোচনায়
উল্লেখ্য, এর আগেও সাময়িকভাবে একই ধরনের পদক্ষেপ করেছিল কেন্দ্র। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বিদেশি ইস্পাতের আমদানিতে ২০০ দিনের জন্য ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। সেই সময় সরকার জানিয়েছিল, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরে ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ট্রেড রেমেডিস্ (Directorate General of Trade Remedies) বিদেশি পণ্যের আমদানি বৃদ্ধির প্রবণতা খতিয়ে দেখে দীর্ঘমেয়াদের শুল্ক আরোপের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই এবার তিন বছরের জন্য শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।
আরও পড়ুন : Rohit Sharma Fitness | নতুন রূপে রোহিত শর্মা ফিটনেসে ফের হিটম্যান, সমালোচকদের জবাব দিলেন স্টাইলেই
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির নিরিখেই এই সিদ্ধান্ত। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ভারত-সহ একাধিক দেশের পণ্যের উপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। তার জেরে চিনের ইস্পাত-পণ্যের রফতানি অন্য বাজারগুলির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ভারত তার অন্যতম বড় গন্তব্য হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনা ইস্পাতের উপস্থিতি দ্রুত বেড়ে যায়। প্রসঙ্গত, এই পরিস্থিতিতে শুধু ভারতই নয়, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়া (South Korea) -এর মতো দেশগুলিও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে নিজেদের শিল্পকে রক্ষার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন একের পর এক দেশ সুরক্ষামূলক নীতি গ্রহণ করছে, তখন ভারতও সেই পথেই হাঁটল বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়লে ঘরোয়া শিল্পকে বাঁচাতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াই সরকারের পক্ষে স্বাভাবিক। ভারতের ইস্পাত শিল্প দেশের পরিকাঠামো উন্নয়ন, নির্মাণ শিল্প এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দেশীয় বাজারে যদি সস্তা বিদেশি পণ্যের আধিপত্য বেড়ে যায়, তা হলে স্থানীয় কারখানাগুলি উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে। সরকার মনে করছে, সুরক্ষামূলক শুল্কের মাধ্যমে দেশীয় সংস্থাগুলি কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে এবং উৎপাদন ধরে রাখতে পারবে।
কিন্তু, আমদানিকারকদের একাংশের মতে, শুল্ক বাড়লে ইস্পাতের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার প্রভাব পড়তে পারে নির্মাণ খরচের উপর। যদিও সরকারের যুক্তি, শুল্ক ধাপে ধাপে কমানো হচ্ছে যাতে বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির চাপ না পড়ে। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে দাম স্থিতিশীল থাকবে বলেই আশা করা হচ্ছে। তবে, তিন বছরের জন্য ইস্পাত আমদানিতে শুল্ক আরোপ ভারতের বাণিজ্য নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও ঘরোয়া শিল্পকে রক্ষা করতে কতটা সফল হয় এই পদক্ষেপ, সেদিকেই এখন নজর থাকবে শিল্পমহলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nirmala Sitharaman | অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে সাক্ষাতে সিকিমের মন্ত্রী সোনম লামা, উন্নয়ন ও জলসম্পদে নতুন সহযোগিতার বার্তা




