সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ভারতের ডিজিটাল যাত্রায় নতুন চ্যাপ্টার। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নভেম্বর ২০২৫ মাসে দেশে ব্রডব্যান্ড গ্রাহকের সংখ্যা প্রথমবারের মতো একশো কোটির সীমা অতিক্রম করেছে। এই ঐতিহাসিক সাফল্য শুধু পরিসংখ্যানগত বৃদ্ধি নয়, তা ভারতের প্রযুক্তি-নির্ভর সমাজ ও অর্থনীতির দৃঢ় ভিত গড়ে ওঠার স্পষ্ট ইঙ্গিত বলেই উল্লেখ। গত এক দশকে ব্রডব্যান্ড পরিষেবার বিস্তার যে গতিতে ঘটেছে, তা বিশ্বব্যাপী নজিরবিহীন বলেও অভিমত বহু পর্যবেক্ষকের।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসের শেষে দেশে ব্রডব্যান্ড গ্রাহকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩ কোটি ১৫ লক্ষ (১৩১.৪৯ মিলিয়ন)। সেখান থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ৩৭ লক্ষেরও বেশি। অর্থাৎ, মাত্র দশ বছরে ছয় গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারী সংখ্যা। এই দীর্ঘ সময়ে স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা, সস্তা ডেটা প্ল্যান, ডিজিটাল পরিষেবার প্রসার এবং সরকারি নীতিগত উদ্যোগ মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটেছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা নিয়েছে সরকারের ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ (Digital India) কর্মসূচী। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ভারতনেট (BharatNet) প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক বিস্তার, জনধন যোজনা (Jan Dhan Yojana), আধার (Aadhaar) ও মোবাইল সংযোগের সমন্বয়ে ডিজিটাল পরিষেবার ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে। এর ফলে ব্যাঙ্কিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, সব ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
টেলিকম শিল্প সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ৪জি এবং ৫জি পরিষেবার দ্রুত সম্প্রসারণ ব্রডব্যান্ড বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে ৫জি চালু হওয়ার পর উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার আরও বেড়েছে। অনলাইন স্ট্রিমিং, ভিডিও কনফারেন্সিং, ই-কমার্স ও ডিজিটাল পেমেন্টের মতো পরিষেবাগুলি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। শহরের পাশাপাশি মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায়ও মানুষ এখন অনলাইন পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্রডব্যান্ড গ্রাহক সংখ্যা একশো কোটি ছাড়ানো ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, ফিনটেক, অ্যাডটেক ও হেলথটেকের মতো খাতে এই বৃদ্ধি নতুন সুযোগ তৈরি করছে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলি (MSME) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারছে। এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিও জোরদার হচ্ছে।
এই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে আসছে। ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র সংযোগ বাড়ালেই হবে না, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করাও জরুরি। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্কের গুণগত মান বজায় রাখা এবং সাশ্রয়ী পরিষেবা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।সরকারি সূত্রের দাবি, আগামী দিনে ব্রডব্যান্ড পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ৫জি ও ভবিষ্যতের ৬জি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা, দেশীয় টেলিকম সরঞ্জাম উৎপাদনে জোর এবং স্টার্টআপদের সহায়তা, এই সবকিছু মিলিয়ে ভারতকে একটি বৈশ্বিক ডিজিটাল হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, ডিজিটাল সংযোগ বাড়লে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা আরও সহজলভ্য হবে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পাবে। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই মাইলস্টোন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন শিক্ষা, ই-গভর্ন্যান্স, টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল বিনোদন গ্রামীণ ও শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবধান কমাতে সাহায্য করছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে ইন্টারনেট এখন জ্ঞানার্জন ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মহিলাদের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম স্বনির্ভরতার নতুন পথ খুলে দিচ্ছে। নভেম্বর তবে, ২০২৫-এ ভারতের ব্রডব্যান্ড গ্রাহক সংখ্যা একশো কোটির গণ্ডি পার করা নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন পথ। ভবিষ্যতে এই ডিজিটাল শক্তিকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলে ভারত বিশ্বমঞ্চে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Social Media Addiction, Digital Detox: মনের শান্তি ফেরাতে চান? ‘ডিজিটাল ডিটক্স’-এ মিলবে সমাধান


