মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : প্রয়াগরাজে (Prayagraj) মহা কুম্ভমেলায় (Kumbh Mela) পদপিষ্ট হয়ে বহু পুণ্যার্থীর মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলেছিল। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। ঠিক সেই প্রেক্ষিতেই ২০২৬ সালের গঙ্গাসাগর মেলা (Gangasagar Mela) ঘিরে বাড়তি সতর্কতায় রাজ্য প্রশাসন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার (West Bengal Government) পরিষ্কার করে দিয়েছে, এবারের গঙ্গাসাগর মেলায় ভিড় সামলাতে কোনও ঝুঁকি নেওয়া হবে না। মহাকুম্ভের অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে একাধিক নতুন ও আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে নবান্ন (Nabanna)।
প্রয়াগরাজের দুর্ঘটনার পর উত্তরপ্রদেশের (Uttar Pradesh) মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath) -এর সরকারের মেলা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তাঁর অভিযোগ ছিল, ‘ভিড় নিয়ন্ত্রণের মতো যথাযথ বন্দোবস্ত না থাকাতেই এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে’। সেই ঘটনার পর থেকেই রাজ্য প্রশাসনের অন্দরে গঙ্গাসাগর মেলা নিয়ে একাধিক বৈঠক শুরু হয়। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, ‘মহাকুম্ভের ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগমে পুরনো ব্যবস্থার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি’। উল্লেখ্য যে, প্রতি বছর গঙ্গাসাগর মেলায় ভিড় নিয়ন্ত্রণে ড্রপ গেট ও বাঁশের ব্যারিকেড ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে গেট বন্ধ করে মানুষের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে, শুধুমাত্র ব্যারিকেড অনেক সময় পর্যাপ্ত হয় না। বিশেষ করে মকরসংক্রান্তির (Makar Sankranti) পুণ্যলগ্নে ভিড়ের চাপ হঠাৎ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেই কারণেই এ বছর ড্রপ গেট ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে সেখানে বসানো হচ্ছে ট্রাফিক লাইট।
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, লাল ও সবুজ আলোর মাধ্যমে পুণ্যার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। দূর থেকেই আলো দেখে মানুষ বুঝতে পারবেন কখন থামতে হবে এবং কখন এগিয়ে যাওয়া নিরাপদ। ভিড়ের চাপ বেড়ে গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আলো লাল করে দেওয়া হবে, যাতে একসঙ্গে অতিরিক্ত মানুষ কোনও এলাকায় ঢুকতে না পারেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার সবুজ আলো জ্বালিয়ে ধাপে ধাপে পুণ্যার্থীদের এগিয়ে যেতে দেওয়া হবে। এই পরিকল্পনার আওতায় মোট ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাকদ্বীপের (Kakdwip) লট-৮, সাগরদ্বীপে (Sagar Island) প্রবেশের প্রধান পথ কচুবেড়িয়া ঘাট (Kachuberia Ghat) এবং মেলাপ্রাঙ্গণের একাধিক সংযোগকারী মোড়। এই সব জায়গাকেই ভিড়ের দিক থেকে ‘সংবেদনশীল’ বলে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। সুন্দরবন পুলিশ জেলা (Sundarban Police District)-র পক্ষ থেকে আগেই এই সব স্থানে অতিরিক্ত নজরদারির সুপারিশ করা হয়েছিল।
১২ থেকে ১৫ জানুয়ারি গঙ্গাসাগর মেলায় যে বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে, তা প্রশাসনের কাছে প্রতি বছরই বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ১৩ জানুয়ারি রাত থেকে ১৪ জানুয়ারি ভোর পর্যন্ত মকরসংক্রান্তির পুণ্যস্নানের সময়ে ভিড় সর্বাধিক হয়। পুলিশের এক কর্তার কথায়, ‘এই কয়েক ঘণ্টায় সামান্য বিশৃঙ্খলা থেকেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আগে থেকেই ভিড়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি’। সেই কারণেই এ বছর আগাম সতর্কতার পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। নবান্ন সূত্রে খবর, সুন্দরবন পুলিশ জেলার তরফে প্রযুক্তিনির্ভর ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই সুপারিশ খতিয়ে দেখেই রাজ্য সরকার এই উদ্যোগে সবুজ সঙ্কেত দেয়। প্রশাসনের বক্তব্য, ‘মানুষকে বাধা দিয়ে নয়, সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য। ট্রাফিক লাইট ব্যবস্থায় সেই কাজটা অনেক সহজ হবে’। এই নতুন উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন, সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি, ড্রোনের মাধ্যমে ভিড় পর্যবেক্ষণ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় ভূমিকা, সব মিলিয়ে গঙ্গাসাগর মেলাকে একটি শক্ত নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হচ্ছে। প্রশাসনের দাবি, কোনও একটি ব্যবস্থার উপর নির্ভর না করে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে, মহাকুম্ভের করুণ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে গঙ্গাসাগর মেলাকে আরও নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করে তুলতে বদ্ধপরিকর রাজ্য প্রশাসন। ড্রপ গেটে ট্রাফিক লাইট বসানোর মতো উদ্যোগ সেই প্রস্তুতিরই প্রতিফলন। প্রশাসনের আশা, এই ব্যবস্থার ফলে পদপিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমবে এবং লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর জন্য গঙ্গাসাগর মেলা হয়ে উঠবে আরও নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Digital Census India 2027 | ডিজিটাল যুগে প্রথম জনসুমারি: নভেম্বরেই শুরু দেশজুড়ে পরীক্ষামূলক সমীক্ষা, ২০২৭-এ পূর্ণাঙ্গ জনগণনা



