বসুধা চৌধুরী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ লখনউ : উত্তরপ্রদেশের বাগপত (Baghpat) জেলায় খাপ পঞ্চায়েতের (Khap Panchayat) সাম্প্রতিক একটি ফরমান ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত শনিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে খাপ পঞ্চায়েত ঘোষণা করেছে, ১৮ বছরের নিচে কোনও কিশোর-কিশোরী প্রকাশ্য স্থানে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারবে না এবং শর্টস পরাও নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে বিয়ে-বাড়িতে ব্যাঙ্কোয়েট হল (Banquet Hall) ব্যবহারের বিরোধিতা করে জানানো হয়েছে, বিবাহ অনুষ্ঠান গ্রামের বাড়ি বা নিজস্ব আবাসেই হওয়া উচিত। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বাগপত জেলাজুড়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। খাপ পঞ্চায়েতের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত প্রভাব কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার পড়াশোনা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে এবং সামাজিক আচরণে অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। পঞ্চায়েতের একজন সদস্যের বক্তব্য, ‘আজকের প্রজন্ম মোবাইলের প্রতি এতটাই আসক্ত যে তারা পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে’। এই কারণেই নাবালকদের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
শুধু প্রযুক্তি নয়, পোশাকের ক্ষেত্রেও খাপ পঞ্চায়েত রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে। প্রকাশ্য স্থানে ১৮ বছরের কম বয়সিদের শর্টস পরা অনুচিত বলে মন্তব্য করে তারা পোশাকের নির্দিষ্ট রীতির প্রস্তাব দিয়েছে। পঞ্চায়েতের নির্দেশ অনুযায়ী, ছেলেদের জন্য কুর্তা-পাজামা (Kurta-Pyjama) এবং মেয়েদের জন্য সালোয়ার-কুর্তা (Salwar-Kurta) উপযুক্ত পোশাক। তাদের দাবি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক সামাজিক শালীনতা বজায় রাখে এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সুরক্ষিত করে। এই ফরমানের আর একটি দিক হল বিবাহ অনুষ্ঠান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। খাপ পঞ্চায়েত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বিয়ে ব্যাঙ্কোয়েট হলে আয়োজন করা উচিত নয়। তাদের মতে, গ্রামের ভেতরে বা বাড়িতে বিয়ে হলে সামাজিক বন্ধন মজবুত হয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও কমে। পঞ্চায়েতের একজন প্রবীণ সদস্য বলেন, ‘বিবাহ শুধু দুই পরিবারের নয়, গোটা গ্রামের উৎসব হওয়া উচিত’। এই যুক্তিতে শহুরে প্রথার বিরোধিতা করেছে তারা।

তবে খাপ পঞ্চায়েতের এই সিদ্ধান্তে বাগপত জেলার মানুষ একমত নন। একাংশ গ্রামবাসী এই ফরমানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, আধুনিকতার নামে সমাজে যে অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে, তা রুখতে এই ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত জরুরি। বিশেষ করে অভিভাবকদের একাংশ মনে করছেন, স্মার্টফোন নিষেধাজ্ঞা পড়ুয়াদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।অন্যদিকে, বুদ্ধিজীবী মহল, সমাজকর্মী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলি এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাঁদের অভিযোগ, খাপ পঞ্চায়েতের কোনও সাংবিধানিক অধিকার নেই ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক বা প্রযুক্তি ব্যবহারের উপর নির্দেশ জারি করার। একজন সমাজকর্মীর বক্তব্য, ‘এ ধরনের ফরমানে ব্যক্তিস্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয় এবং তরুণ প্রজন্মের উপর অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ চাপানো হয়’। তাঁদের মতে, শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব, নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে নয়।
আইনজ্ঞদের মতে, ভারতের (India) সংবিধান অনুযায়ী ব্যক্তির স্বাধীনতা ও পছন্দের অধিকার সুরক্ষিত। খাপ পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত আইনত বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু সামাজিক চাপে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ তা মানতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতি গ্রামীণ সমাজে ভয় ও দ্বিধার পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলেও তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বাগপতের তরুণ প্রজন্মও এই ফরমানে ক্ষুব্ধ। একজন কলেজ পড়ুয়া ছাত্রের কথায়, ‘মোবাইল এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, পড়াশোনা ও তথ্যের বড় উৎস’। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ থেকে নাবালকেরা বঞ্চিত হবে। একইভাবে অনেক কিশোরী মনে করছেন, পোশাক নিয়ে এই ধরনের নির্দেশ তাঁদের আত্মসম্মানে আঘাত করে।
রাজনৈতিক মহলেও এই ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা খাপ পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্তকে মধ্যযুগীয় মানসিকতার পরিচয় বলে কটাক্ষ করেছেন। যদিও শাসক দলের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, কিন্তু, পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয় তার দিকে প্রশাসনের এর ওপর নজর রয়েছে। মানতেই হয়, বাগপতের খাপ পঞ্চায়েতের এই ফরমান গ্রামীণ ঐতিহ্য বনাম আধুনিক মূল্যবোধের সংঘাতকে আবার সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে সামাজিক শৃঙ্খলা ও সংস্কৃতির যুক্তি, অন্যদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বাগপতের সমাজ এখন দ্বিধাবিভক্ত। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে এবং প্রশাসন কী ভূমিকা নেবে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা জেলা।
ছবি : প্রতীকী




