সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত হিংসা নিয়ে ফের প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানাল ভারত। দীপুচন্দ্র দাস (Dipu Chandra Das) হত্যার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজবাড়ি জেলায় যুবক অমৃত মণ্ডল ওরফে সম্রাট (Amrit Mondal alias Samrat) গণপিটুনিতে খুন হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (Ministry of External Affairs, India) স্পষ্ট জানিয়ে দিল, প্রতিবেশী দেশে হিন্দু, খ্রীস্টান, বৌদ্ধ-সহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ‘অবিরাম’ হামলা ভারতের কাছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
শুক্রবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল (Randhir Jaiswal) বলেন, ‘বাংলাদেশে কট্টরপন্থীদের হাতে সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক হামলা গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। আমরা পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছি।’ তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে আমরা অবগত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কী অবস্থায় রয়েছে, কী হওয়া উচিত এবং ভবিষ্যতে কী হতে পারে, এই সব বিষয় নিয়ে আমরা ধারাবাহিক ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করছি।’ কূটনৈতিক মহলের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে নতুন দিল্লি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিল যে তারা বিষয়টিকে হালকা ভাবে নিচ্ছে না।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলায় দীপুচন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে উন্মত্ত জনতা পিটিয়ে খুন করে এবং পরে তাঁর দেহে আগুন লাগিয়ে দেয়। সেই ঘটনায় দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। ভারত তখনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জ (United Nations) পর্যন্ত বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু এত কিছুর পরেও পরিস্থিতির কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।সেই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই বুধবার গভীর রাতে ঢাকার (Dhaka) রাজবাড়ি (Rajbari) জেলায় গণপিটুনিতে নিহত হন অমৃত মণ্ডল। সূত্রের খবর, অমৃত এলাকায় ‘সম্রাট’ নামেই পরিচিত ছিলেন। জেলা পুলিশের দাবি, তোলাবাজি সংক্রান্ত বিবাদ থেকেই ওই ঘটনা ঘটে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বুধবার রাতে একটি গোলমালের সময় উত্তেজিত জনতা অমৃতকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা অমৃতের এক সহযোগী সেলিম শেখকে (Selim Sheikh) ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশের দাবি, সেলিমের কাছ থেকে দু’টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। রাজবাড়ি থানার ওসি শেখ মঈনুল ইসলাম (Sheikh Moinul Islam) জানিয়েছেন, নিহত অমৃত মণ্ডলের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ-সহ একাধিক মামলা ছিল। তাঁর সহযোগী সেলিমের কাছ থেকে একটি পিস্তল এবং একটি ওয়ান শটার পাওয়া গিয়েছে বলেও দাবি পুলিশের।
কিন্তু, এই ব্যাখ্যা ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। বাংলাদেশের একাংশের মানবাধিকার সংগঠন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, অমৃত মণ্ডল হত্যার ঘটনাকে ‘তোলাবাজির অভিযোগের মোড়কে’ ঢাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, বাস্তবে এটি কট্টরপন্থী জনতার হামলা হলেও প্রশাসন সেটিকে ভিন্ন খাতে বইয়ে দিতে চাইছে। এই অভিযোগ সামনে আসতেই পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতিক্রিয়া তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। তাঁদের মতে, নয়াদিল্লির বক্তব্য শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক নির্যাতনের একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন। ভারত যে বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্তরেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, সেটাই স্পষ্ট হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা এবং কট্টরপন্থীদের বাড়বাড়ন্ত, এই তিনের মিলিত ফলেই সংখ্যালঘুরা ক্রমশ বেশি অসুরক্ষিত হয়ে পড়ছেন। দীপু দাস থেকে অমৃত মণ্ডল, পরপর দুটি ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরাল করেছে।
এ দিকে বাংলাদেশের প্রশাসনের তরফে বার বার দাবি করা হচ্ছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অপরাধীরা শাস্তি পাবে। কিন্তু বাস্তবে গণপিটুনির মতো ঘটনা থামছে না। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, শুধু তদন্ত বা গ্রেফতার যথেষ্ট নয়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় স্তরে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য যে, অমৃত মণ্ডল হত্যাকাণ্ড এবং তার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া আবারও প্রমাণ করল, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি শুধু অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সে দিকে তাকিয়ে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহল।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : India Bangladesh visa suspension | ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নজিরবিহীন টানাপোড়েন, নতুন দিল্লি-শিলিগুড়ি-আগরতলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ভিসা পরিষেবা বন্ধ ঢাকার




