সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ঢাকা : ঢাকা ও নতুন দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে ফের বড়সড় চিড়। একযোগে ভারতের তিন গুরুত্বপূর্ণ শহরে অবস্থিত বাংলাদেশ ভিসা সেন্টার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক (Bangladesh Ministry of Foreign Affairs)। নতুন দিল্লি (New Delhi), শিলিগুড়ি (Siliguri) এবং আগরতলায় (Agartala) অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন ও সহকারী হাই কমিশনগুলিতে আপাতত সব ধরনের কনস্যুলার পরিষেবা ও ভিসা সংক্রান্ত কাজ স্থগিত রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। ঢাকার এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিক ভাবেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ল দুই দেশের কূটনৈতিক সমীকরণ।
বাংলাদেশের একটি প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। অর্থাৎ, কবে আবার পরিষেবা চালু হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি। বাংলাদেশের হাই কমিশনের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাই কমিশনের অফিসে সমস্ত কনস্যুলার এবং ভিসা পরিষেবা সংক্রান্ত কাজ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হচ্ছে। সাময়িক এই অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।’ উল্লেখ্য যে, কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ নিছক প্রশাসনিক নয়, বরং সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রতিফলন। গত কয়েক মাস ধরেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একাধিক কারণে চাপের মুখে। বিশেষ করে বাংলাদেশে চরমপন্থী সংগঠনগুলির বাড়বাড়ন্ত এবং তাদের প্রভাব কূটনৈতিক পরিসরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
উল্লেখ্য যে, এর আগে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাই কমিশন ও ভিসা সেন্টারগুলিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিষেবা বন্ধের ঘোষণা করেছিল নতুন দিল্লি। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (Ministry of External Affairs, India) জানিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভিসা পরিষেবা চালু রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। তারই পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ঢাকার এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। বিশেষ করে গত সপ্তাহে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম-এ (Chattogram) ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সেখানে অবস্থিত ভারতের অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনে (Assistant High Commission of India) রাতের অন্ধকারে হামলার চেষ্টা চালায় একদল দুষ্কৃতী। অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও উগ্রপন্থীরা কমিশনের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে। বাধা পেলে ইট-পাটকেল ছুড়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। এই ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই দিল্লিতে কূটনৈতিক স্তরে তৎপরতা শুরু হয়।
চট্টগ্রামের ঘটনার আগেও ঢাকা (Dhaka), খুলনা (Khulna) এবং রাজশাহীতে (Rajshahi) অবস্থিত ভারতীয় ভিসা সেন্টারগুলিতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা জানিয়ে পরিষেবা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল ভারত। একাধিক শহরে একই ধরনের অশান্তি এবং বিক্ষোভের ছবি সামনে আসায় ভারতীয় কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। সেই প্রেক্ষিতেই ভিসা পরিষেবা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় নতুন দিল্লি।দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের যাতায়াত ছিল প্রায় স্বাভাবিক। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা পর্যটন, বিভিন্ন কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই চিত্র একেবারে বদলে যাচ্ছে। ইউনূস জমানায় চরমপন্থীদের প্রভাব বেড়েছে বলে অভিযোগ, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কূটনৈতিক ও জনসংযোগের উপর।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক অতীতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন অবনতি নজিরবিহীন। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জলবণ্টন এবং নিরাপত্তা, একাধিক ইস্যুতে যেখানে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার বার্তা দিত, সেখানে এখন ভিসা পরিষেবা বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত দুই পক্ষের মধ্যেকার আস্থার সংকটকেই তুলে ধরছে। উল্লেখ্য যে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব বিশেষ ভাবে পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আগরতলা ও শিলিগুড়ি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। চিকিৎসা বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে বহু বাংলাদেশি নাগরিক এই দুই শহরের উপর নির্ভর করতেন। একই ভাবে ভারতীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটকরাও বাংলাদেশে যাতায়াত করতেন। ভিসা পরিষেবা বন্ধ থাকায় সেই প্রবাহ আপাতত থমকে যাবে।এদিকে, বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে পরিষ্কার করে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং নতুন নির্দেশ এলে তবেই পরিষেবা পুনরায় চালু করা হবে। তবে কবে সেই দিন আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। দুই দেশের কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চলছে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে, যদিও সরকারিভাবে কোনও পক্ষই বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভিসা পরিষেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং তা দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া গভীর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটেরই প্রতিফলন, এ কথা বলছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Hindu youth murdered in Bangladesh, India reaction on Bangladesh minorities | ঢাকায় হিন্দু যুবক দীপু দাস খুন, কড়া বার্তা দিল ভারত: সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগে দিল্লি




