সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পরিমার্জন বা এসআইআর (SIR) ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াল। খসড়া তালিকা প্রকাশের পর থেকেই একদিকে যেমন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) নিজের বাসভবনে জরুরি বৈঠকে ব্যস্ত, তেমনই অন্যদিকে বিরোধী শিবির আক্রমণ শানাচ্ছে। এই আবহেই বড় মন্তব্য করে বসলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তাঁর দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ার পরে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে ভোটের ব্যবধান আর নেই বললেই চলে।
নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়ক তথা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী জানান, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে যে ভোটের ব্যবধান ছিল, তা কার্যত ঘুচে গিয়েছে। শুভেন্দু বলেন, ‘২০২৪-এর লোকসভা ভোটে বিজেপি পেয়েছিল প্রায় ২ কোটি ৩৩ লক্ষ ২৭ হাজার ভোট। তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ছিল আনুমানিক ২ কোটি ৭৫ লক্ষ। অর্থাৎ, মোটামুটি ৪১ লক্ষ ভোটের পার্থক্য দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সরাসরি তৃণমূল বনাম বিজেপির লড়াইয়ে সেই ফারাক দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২১ লক্ষের মতো।’ শুভেন্দুর ব্যাখ্যায় উঠে আসে আরও একটি রাজনৈতিক অঙ্ক। তাঁর দাবি, রাজ্যে সিপিএম ও কংগ্রেসের মতো দলগুলি ভোট কেটে নেওয়ার ভূমিকা নেয়। ফলে প্রকৃত লড়াই হয় মূলত তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে। সেই হিসাবে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যেকার ব্যবধান ২১ লক্ষ ভোটের কাছাকাছি ছিল বলে তাঁর বক্তব্য। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিরোধী দলনেতার কথায়, ‘এই ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার মধ্যে দিয়েই প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে যে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে এখন আর কোনও ভোটের ব্যবধান নেই। ১৪ ফেব্রুয়ারি যখন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে, তখন আরও নাম বাদ যেতে পারে। তখন ছবিটা আরও স্পষ্ট হবে।’ শুভেন্দুর এই মন্তব্য ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকার এই পরিবর্তন রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই এসআইআর প্রক্রিয়াকে বিজেপি নিজেদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখছে। বিজেপি নেতৃত্বের একাংশের মতে, ভুয়ো বা অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়লে প্রকৃত ভোটারদের ইচ্ছার প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হবে।
শুভেন্দুর এই দাবি মানতে নারাজ তৃণমূল কংগ্রেস। শাসক দলের পক্ষ থেকে পাল্টা কটাক্ষ করতে পিছপা হননি নেতা অরূপ চক্রবর্তী (Arup Chakraborty)। তাঁর বক্তব্য, ‘ডিসেম্বর এলেই শুভেন্দু অধিকারীর অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার শুরু হয়। ২০২৩ সালে তো তিনি প্রতি সপ্তাহে সরকার ফেলে দিতেন।’ অরূপ আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘১ কোটি ২০ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তাহলে সেই মুসলমান বা রোহিঙ্গারা কোথায় গেল, যাদের নিয়ে এতদিন এত কথা বলা হচ্ছিল?’ তৃণমূলের দাবি, এসআইআর একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্ক কষে বিভ্রান্তি ছড়ানো ঠিক নয়। শাসক দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, খসড়া তালিকায় যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের অনেকেই মৃত, স্থানান্তরিত বা দ্বৈত ভোটার হিসেবে চিহ্নিত। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকছে বলেও তারা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক সমালোচকদের একাংশের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য মূলত রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল। ভোটার তালিকা সংশোধন একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার চূড়ান্ত ফলাফল না দেখে এই ধরনের বড় দাবি করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করছেন তাঁরা। তবে এটাও সত্যি যে, বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার খবরে রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলি নতুন করে সংগঠন মজবুত করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালীঘাটের বাড়িতে ডাকা জরুরি বৈঠকে এসআইআর সংক্রান্ত বিষয়গুলি খতিয়ে দেখছেন বলে সূত্রের খবর। কাদের নাম বাদ পড়েছে, কেন বাদ পড়েছে এবং কীভাবে সেই ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, এই সব বিষয় নিয়েই আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, ভবানীপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলিতে ভোটার তালিকার পরিবর্তন তৃণমূলকে বাড়তি সতর্ক করেছে। উল্লেখ্য, এসআইআর-এর খসড়া তালিকা প্রকাশের পর রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর ‘ভোট ব্যবধান নেই’ মন্তব্য এবং তৃণমূলের পাল্টা আক্রমণ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আগামী দিনে ভোটার তালিকা ইস্যু রাজ্যের রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে চলেছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর এই অঙ্ক কতটা বদলায়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari statement, Bengal law and order debate | বিরোধী দলনেতার বিস্ফোরক অভিযোগ! ‘মন্ত্রী–সভা চোরদের আখড়া’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগড়ে শুভেন্দু অধিকারী




