সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ডুয়ার্সে (Dooars) ফের অশান্তি। বছরের শেষপ্রান্তে এসে আবারও বন্ধ হয়ে গেল একটি চা বাগান। বানারহাট (Banarhat) এলাকার মোগলকাটা চা বাগান (Mogolkata Tea Garden) শুক্রবার গভীর রাতে পরিত্যক্ত করে পালিয়ে গেল মালিকপক্ষ। শনিবার সকালে এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই চা বলয়ের শ্রমিক মহলে নেমে আসে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ। এক ধাক্কায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ১,০৭৬ জন চা শ্রমিক। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে তাঁরা।
শনিবার সকাল। প্রতিদিনের মতো কাজে যোগ দিতে বাগানে পৌঁছন শ্রমিকরা। কিন্তু ঢুকেই তাঁদের চোখ কপালে ওঠে। বাগানের ভেতরে নেই কোনও কর্তৃপক্ষ, নেই ব্যবস্থাপনার কেউ। এমনকি অফিস ঘর, কারখানা চত্বরেও কোনও গাড়ির অস্তিত্ব নেই। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে যায়, রাতের অন্ধকারে মালিকপক্ষ বাগান ছেড়ে পালিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই শত শত শ্রমিক জড়ো হন বাগানের কারখানার গেটের সামনে। শুরু হয় বিক্ষোভ, উত্তেজনা ছড়ায় গোটা এলাকায়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, এই বন্ধ হঠাৎ করে নয়, দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল বেতন-বোনাসের অনিশ্চয়তা। নিয়মিত মজুরি দেওয়া হচ্ছিল না, কখনও এক সপ্তাহ অন্তর, কখনও আরও দেরিতে সামান্য টাকা দিয়ে দায় সারা হচ্ছিল। পুজোর বোনাস (Pujo Bonus) এখনও পর্যন্ত মেলেনি। একাধিকবার মালিকপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদন করেও কোনও স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত কোনওরকম পাওনা মেটানো ছাড়াই শুক্রবার রাতে গোপনে বাগান ছেড়ে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে মালিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।বিক্ষোভরত এক মহিলা শ্রমিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের বোনাস দেয়নি। মাইনে বাকি। এক সপ্তাহ ছেড়ে ছেড়ে টাকা দিত। কোম্পানির কথা বিশ্বাস করেছি। কিন্তু শেষে আমাদের সঙ্গে এমন করল।” তাঁর কথায় স্পষ্ট, শ্রমিকদের আস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। অনেকের বাড়িতে চাল নেই, স্কুলপড়ুয়া সন্তানের পড়াশোনার খরচ অনিশ্চিত।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছন প্রাক্তন নাগরাকাটা বিধায়ক সুখমইত ওঁরাও (Sukhmay Orao) এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেতা জন বার্লা (John Barla)। তাঁরা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপের আশ্বাস দেন। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া শোনার পর তাঁরা জানান, অবিলম্বে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে মালিকপক্ষকে খুঁজে বের করা এবং বাগান চালুর ব্যবস্থা করা হবে। তবে শ্রমিকদের মধ্যে সন্দেহ, আগেও এমন আশ্বাস মিলেছে, বাস্তব ফল খুব কমই এসেছে। মোগলকাটা চা বাগানের বন্ধ হওয়া শুধু একটি বাগানের সমস্যা নয়, গোটা ডুয়ার্সের চা শিল্পের (Tea Industry) গভীর সংকটের প্রতিফলন। অতীতে একের পর এক চা বাগান বন্ধ হওয়ার জেরে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বন্ধ বাগান মানেই শুধু কর্মহীনতা নয়, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা সবকিছুই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। চা বাগান নির্ভর জনপদের অর্থনীতি কার্যত থমকে যায়।
শ্রমিক সংগঠনগুলির অভিযোগ, মালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই শ্রম আইন (Labour Law) মানছে না। বকেয়া মজুরি, পিএফ (PF), গ্র্যাচুইটি (Gratuity) এবং বোনাস, সবই অনিয়মের মধ্যে পড়ছে। প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল থাকায় মালিকরা সুযোগ নিয়ে রাতারাতি উধাও হয়ে যেতে পারছেন। এর ফলে সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন শ্রমিকরাই।বিক্ষোভরত শ্রমিকদের স্পষ্ট দাবি, প্রশাসন অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করুক। মালিক কর্তৃপক্ষকে খুঁজে এনে সমস্ত বকেয়া মজুরি ও বোনাস পরিশোধ করানো হোক। বাগান পুনরায় চালু করার লিখিত আশ্বাস না মিললে আন্দোলন আরও তীব্র হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। প্রয়োজনে জাতীয় সড়ক অবরোধ, বৃহত্তর আন্দোলনের পথেও হাঁটার কথা জানিয়েছেন শ্রমিকদের একাংশ।জেলা প্রশাসনের তরফে জানা গিয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে এবং শ্রম দফতরের (Labour Department) মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের প্রশ্ন, এই চেষ্টা কবে বাস্তবে রূপ নেবে? ততদিনে তাঁদের পরিবার চলবে কীভাবে?
ডুয়ার্সের চা বলয়ে এই ঘটনা ফের প্রমাণ করল, শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা মিলেই তৈরি হচ্ছে গভীর সামাজিক সংকট। মোগলকাটা চা বাগানের ১,০৭৬ জন শ্রমিক আজ শুধু কর্মহীন নন, তাঁরা অনিশ্চিত আগামী দিনের সামনে দাঁড়িয়ে। এখন দেখার, প্রশাসনিক তৎপরতা কত দ্রুত বাস্তব ফল দেয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : From Gaon to Global: The Kunj Unveiled as India’s First Integrated Crafts Complex




