সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের ভোটবন্দোবস্ত ঘিরে আবারও উত্তেজনা। এসআইআর (SIR) ফর্ম জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া যখন শেষ পর্যায়ে, তখনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) দফতরে হাজির হলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তাঁর দাবি, মাত্র তিন দিনে ২৬, ২৭ ও ২৮ নভেম্বর যেভাবে বিপুল হারে ডেটা এন্ট্রি হয়েছে, তা স্বাভাবিক নয়, বরং ‘গোটা প্রক্রিয়াকেই সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা।’
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই সময়সীমা বাড়িয়ে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফর্ম জমা নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এই সময়সীমা চলাকালীন হঠাৎই শুভেন্দুর অভিযোগ, রাতারাতি ১ কোটি ২৫ লক্ষ এন্ট্রি করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটা কোনও সাধারণ ভুল নয়, এটা একটা স্ক্যাম।’ তিনি দাবি করেন, এই হঠাৎ এন্ট্রির পেছনে যুক্ত রয়েছেন বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনী আধিকারিকরা- এইআরও (AERO), ইআরও (ERO) সহ ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)। এদিন সিইও দফতরে প্রবেশ করার আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘যে তিনদিনে এই বিপুল ডেটা এন্ট্রি দেখানো হচ্ছে, সেগুলোর প্রত্যেকটি এন্ট্রি স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের দিয়ে অডিট করাতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অডিট না করলে মানুষের বিশ্বাস ফিরে পাবে না। রাতারাতি ১ কোটি ২৫ লক্ষ এন্ট্রি স্বাভাবিক নয়।” তাঁর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া ‘পরিকল্পিত অনিয়ম’ ছাড়া আর কিছুই নয়। শুভেন্দুর দাবি, দেশের অন্যান্য রাজ্যে এসডিও-রাই সাধারণত ইআরওর দায়িত্বে থাকেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ল্যান্ড অফিসারের হাতে ইআরওর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা তাঁর মতে নিয়মবিরুদ্ধ। বিরোধী নেতার দাবি, ‘এটা করা যায় না। আইন পরিষ্কার- এসডিও র্যাঙ্কের আধিকারিকই ইআরও হতে পারেন। এখানে নিয়ম বদলে ফেলা হয়েছে বিশেষ স্বার্থে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে। তাঁর কথায়, ‘এসআইআরের ডেটা এন্ট্রির কাজে আইপ্যাককে লাগানো হয়েছে। এটা কিভাবে সম্ভব? নির্বাচন কমিশনের কাজ কোনও বেসরকারি সংস্থা করতে পারে না। এটা সরাসরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপমান।’ শুভেন্দুর দাবি, শুধু আইপ্যাক নয়, কিছু প্রশাসনিক আধিকারিকও নাকি এতে জড়িত।
বিরোধী দলনেতা আরও এক বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন,নতুন এন্ট্রিতে নাকি বহুসংখ্যক মৃত মানুষ এবং বাংলাদেশি মুসলমানদের নামও যুক্ত করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘একটা পার্টিকুলার ভোটব্যাঙ্ক টার্গেট করে নাম ঢোকানো হয়েছে। এটা তদন্ত না করলে নির্বাচন নির্ভেজাল হবে না। বিসিএস (BCS), আইএএস (IAS) অফিসারদের দিয়েই ইআরওর কাজ করাতে হবে, এটাই নিয়ম।’
এদিন শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে রাজ্যের বিজেপি বিধায়কদের একটি প্রতিনিধি দল সিইও দফতরে লিখিত ডেপুটেশন জমা দেয়। ডেপুটেশনের দাবি : ৩ দিনের সমস্ত এন্ট্রি অবিলম্বে অডিট করতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া জনসমক্ষে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। প্রমাণসহ দাবি জানানো হয়েছে যে এই এন্ট্রির মাধ্যমে রাজ্যের ভোটার তালিকা বিকৃত করার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, সিইও দফতরের বাইরে পুরো পরিস্থিতি সকাল থেকেই ছিল উত্তপ্ত। তৃণমূলপন্থী বিএলও (BLO) কর্মীদের বিক্ষোভ ক্রমে চরম আকার নেয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, বিজেপির নেতৃত্ব উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্বাচনী কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ তুলে পরিবেশ নোংরা করছে। পাল্টা স্লোগান, পাল্টা উত্তেজনায় বারবার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েকবার পুলিশকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নামতে হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত কয়েকমাস ধরে রাজ্যে ভোটার তালিকা নিয়ে নানা রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে। একদিকে বিরোধীরা অভিযোগ করছে ভোটার তালিকা ভরাটে ব্যাপক অনিয়ম, অন্যদিকে শাসকদল বলছে, এগুলো সবই রাজনৈতিক নাটক। কিন্তু শুভেন্দুর এই নতুন অভিযোগে রাজনৈতিক অন্দরমহলে আবারও বিস্তর চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কিন্তু, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু এদিনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। কমিশনের তরফে যদিও এখনও কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া মেলেনি, তবে সূত্রদের মতে, অভিযোগগুলি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হতে পারে। উল্লেখ্য, রাজ্যজুড়ে যখন উৎসবের মরসুম, তখন রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভোটের ডেটা এন্ট্রি নিয়ে। আগামী দিনে এই অভিযোগ কতদূর গড়ায়, তার দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের। শুভেন্দুর দাবি ও পাল্টা বিক্ষোভ ঘিরে রাজ্যে আগাম নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়ে গেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ছবি : সংগৃহীত



