সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলম্বো, নতুন দিল্লি : প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় প্রকৃতির প্রলয়ংকরী রূপে নেমে এসেছে আতঙ্ক ও ধ্বংস। গত এক সপ্তাহ ধরে বিরতিহীন বর্ষণে দেশটির বহু জেলা অচল হয়ে পড়ে। বৃষ্টির জেরে হঠাৎ হড়পা বান, নদীর জল বিপজ্জনক উচ্চতায় পৌঁছনো, পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধস, সব মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষ গৃহহারা। ভয়াবহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহা’ (Cyclone Ditwah)। সরকারি হিসেবে এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা অন্তত ৫৬, এবং ঘরছাড়া ২,০০০ জনেরও বেশি।দেশটির মৌসম দফতর জানিয়েছে, এই মুহূর্তে উত্তর-পূর্ব বর্ষার সময় শ্রীলঙ্কায় স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও ‘দিতওয়াহা’ -এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষত কলম্বো ও নিম্নভূমি এলাকায় জলস্তর দ্রুত বাড়তে থাকায় বিপদসঙ্কুল ঘোষণা করা হয়েছে কয়েকটি জোনকে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় আরও ২০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্কতা দিয়েছেন আবহবিদরা।
শুক্রবার সকাল থেকেই দেশজুড়ে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাড়ি-ঘর, চাষের জমি, রাস্তা, সবই তলিয়ে যায় বন্যার জলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব দেখা দিয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্কুল, সরকারি অফিস এবং বেশ কিছু জায়গায় রেল পরিষেবা। ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ি গ্রাম থেকে শহর সব জায়গাতেই বৃষ্টি ও বন্যার জল ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, ব্রীজ, দোকানপাট। শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বাদুল্লা (Badulla)। সেখানে ধারাবাহিক ভূমিধসে একদিনে ২১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নুওয়ারা এলিয়াতেও (Nuwara Eliya) মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪ জন। ইতিমধ্যেই ১,৮০০ -এর বেশি মানুষকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
দেশটির বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজে নেমেছে লঙ্কান আর্মি, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী। ২০ হাজারেরও বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা হচ্ছে। নৌবাহিনীর বোট নামানো হয়েছে বন্যাপ্রবাহিত অঞ্চলে। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) শোকবার্তা জানিয়ে বলেন, “শ্রীলঙ্কার মানুষের এই কঠিন সময়ে ভারত তাদের পাশে আছে। প্রার্থনা করছি, এই বিপর্যয় যেন আর গভীর ক্ষতি না ডেকে আনে।”
তিনি আরও জানান, যে-কোনও ধরনের জরুরি সহায়তা পৌঁছতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
উল্লেখ্য যে, ভারত ইতিমধ্যেই ‘অপারেশন সাগরবন্ধু’ (Operation Sagar Bandhu) চালু করেছে। ভারতীয় নৌসেনার অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরী INS Vikrant (বিক্রান্ত) রওনা দিয়েছে জরুরি রিলিফ সামগ্রী নিয়ে। পানীয় জল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাবার, তাঁবু, কম্বল-বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। নৌসেনা সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজন হলে আরও উদ্ধারকর্মী ও হেলিকপ্টার পাঠানো হবে। এদিকে ভারতের মৌসম দফতর জানিয়েছে, শ্রীলঙ্কা থেকে শক্তি সঞ্চয় করে সাইক্লোন দিতওয়াহা এবার উত্তর তামিলনাড়ু, পুদুচেরি ও অন্ধ্র উপকূলের দিকে এগোচ্ছে। ৩০ নভেম্বর ভোরের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগে আছড়ে পড়তে পারে। তাই আগাম সতর্কতা হিসেবে তামিলনাড়ু ও পুদুচেরি উপকূলে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যেতে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপকূল এলাকায় প্রশাসন ইতিমধ্যেই কন্ট্রোল রুম খোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বর্ষার মৌসুমি বাতাস মিলিয়ে অতিরিক্ত শক্তি পেয়েছে এই ঘূর্ণিঝড়। ফলে আগামী কয়েক ঘণ্টা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। শ্রীলঙ্কার উদ্ধারকারী এক কর্মকর্তা, জানাকা সিলভা (Janaka Silva) জানিয়েছেন,
“আমরা আগে কখনও এমন হড়পা বান ও ভূমিধস একসঙ্গে দেখিনি। এখনও বহু মানুষ আটকে রয়েছে। আমাদের সমস্ত বাহিনী উদ্ধারকাজে নিয়োজিত।”
আন্তর্জাতিক মহল ইতিমধ্যেই সাহায্যের হাত বাড়াতে শুরু করেছে। ভারত, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ জরুরি সহায়তা পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে যাতে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যায়। উল্লেখ্য যে, প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহা’ দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় দেশগুলোর ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখন সময়ই বলবে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রীলঙ্কার জন্য প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান আশা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপই কমিয়ে আনবে লঙ্কার দুর্দশা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Kisan Pension Yojana 2025 | কৃষকের বার্ধক্যে ভরসা : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘PM Kisan Pension Yojana 2025’ আনছে বিপ্লব




