সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে গত সোমবার রাতের ভয়াবহ গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছে দিল্লি। আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন, আহত হয়েছেন বহু সাধারণ মানুষ। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক এখনও কাটেনি রাজধানীবাসীর মন থেকে। কিন্তু ঘটনার পরই নতুন করে চর্চায় উঠে এসেছেন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasreen), তাঁর মন্তব্যে ফের দানা বাঁধছে বিতর্ক, বিশেষত ধর্ম, শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে তাঁর স্পষ্ট অবস্থানকে কেন্দ্র করে।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, বিস্ফোরণের দিনই আটক হয়েছেন কয়েকজন চিকিৎসক, যাদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে বেআইনি বিস্ফোরক। তদন্তে জানা গিয়েছে, এই চিকিৎসকরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন একাধিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে। অভিযোগ উঠেছে আল ফালাহ কলেজ (Al Falah College) নামের এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও জঙ্গি আঁতাতে জড়িত থাকার। এই ঘটনার পর গোটা দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে “শিক্ষিত কিন্তু অন্ধবিশ্বাসী” সমাজের প্রশ্ন। এই প্রসঙ্গেই ফেসবুকে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasreen)। তিনি লিখেছেন, “যুক্তিবাদ বা বিজ্ঞানমনস্কতা জন্ম নেয় প্রশ্ন করার সাহস থেকে। যখন মানুষ প্রচলিত বিশ্বাসকে পরীক্ষা করে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলে, তখনই সভ্যতার বিকাশ ঘটে।”
তিনি আরও লিখেছেন, “শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকলেই মানুষ প্রগতিশীল হয় না। যাঁরা দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, বিবর্তন তত্ত্ব, ইতিহাস বা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন, তাঁরাই যুক্তি ও মানবতার সংমিশ্রণে সত্যিকারের সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে পারেন।” তসলিমার এই বক্তব্যে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাঁর মতে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা কেবল পেশাদার তৈরি করছে, মানবিক বোধ বা স্বাধীন চিন্তা গড়ে তুলতে পারছে না। তিনি সতর্ক করেছেন, “যে শিক্ষা চিন্তার স্বাধীনতায় বাধা দেয়, সেটি সমাজের অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দেয়।”
তাঁর পোস্টে উঠে এসেছে আরও এক গভীর দার্শনিক বার্তা, “শিক্ষা যদি কৌতূহল জাগাতে না পারে, তাহলে তা কেবল যান্ত্রিক জ্ঞান হয়ে থাকে।” এই বক্তব্যে তিনি পরোক্ষে প্রশ্ন তুলেছেন, আমরা কি এমন এক সমাজ তৈরি করছি যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ হয়ে উঠছে? তসলিমা ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে বলেছেন, ইউরোপের আলোকিত যুগে গির্জার কর্তৃত্বকে যারা প্রশ্ন করেছিলেন, তারাই আধুনিক সভ্যতার ভিত গড়েছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও মুক্তচিন্তকরা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যুক্তির লড়াই চালিয়েছেন, সেই ধারাই এখনও প্রাসঙ্গিক। “আজও যুক্তিবাদী মানুষরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকারের বিরুদ্ধে,” লিখেছেন তিনি।তিনি আরও সতর্ক করেন৷ “আজ পৃথিবী কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা আর অপবিজ্ঞানে আক্রান্ত। তাই বিজ্ঞানমনস্কতার বিকাশ এখন শুধু প্রয়োজন নয়, এটি এক নৈতিক কর্তব্য।” তাঁর মতে, শিক্ষার কাজ কেবল পেশাজীবী তৈরি করা নয়, বরং এমন মানুষ গড়ে তোলা, যারা প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে পারে, সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে পারে।
তসলিমার বার্তায় একদিকে যেমন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সমালোচনা, তেমনই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যুক্তির অস্ত্র তুলে নেওয়ার আহ্বানও রয়েছে। তিনি লিখেছেন, “যে সমাজ প্রশ্নকে স্তব্ধ করে দেয়, সে সমাজ অগ্রগতিকেও স্তব্ধ করে দেয়।” সামাজিক মাধ্যমে তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, তসলিমা আবারও সাহসিকতার সঙ্গে সত্য বলার চেষ্টা করেছেন, আবার কেউ অভিযোগ তুলছেন, সংবেদনশীল সময়ে এমন বক্তব্য আরও বিভাজন বাড়াতে পারে। কিন্তু তসলিমার অনুসারীদের মতে, তাঁর এই বার্তা বর্তমান সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক এক সতর্কতা। তিনি আরও লেখেন, “জ্ঞান যখন উদারতার সঙ্গে মেলে, যুক্তি যখন সাহসের সঙ্গে হাত মেলায়, তখনই মানবতা সত্যিকারের মুক্তি পায়।” রাজধানী যখন বিস্ফোরণের ভয়াবহতায় স্তব্ধ, তখন তসলিমার এই যুক্তিবাদী কণ্ঠ যেন অন্ধকার সময়েও এক আলোর প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত




