সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পূর্ব মেদিনীপুর : বাংলার উপকূলজুড়ে একটা সময় চিংড়ি চাষ (Prawn Farming) ছিল অর্থনীতির প্রাণ। হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করত এই ব্যবসার ওপর। কিন্তু সম্প্রতি ৬০০ কোটি টাকার এক ভয়াবহ প্রতারণা কাণ্ডে সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের তিন প্রধান জেলা উত্তর ২৪ পরগনা (North 24 Parganas), দক্ষিণ ২৪ পরগনা (South 24 Parganas) ও পূর্ব মেদিনীপুর (Purba Medinipur) -এর চিংড়ি চাষ ও রফতানির কাজ এখন গভীর সঙ্কটে। অভিযোগ উঠেছে, একাধিক বড় রফতানিকারক (Exporter) সংস্থা ও ব্যবসায়ী চাষিদের কোটি কোটি টাকা মেরে দিচ্ছেন।
‘অ্যাকওয়া ফার্মার্স অ্যান্ড ফিশারমেন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ (Aqua Farmers and Fishermen Welfare Trust)-এর দাবি, এই প্রতারণার জেরে রাজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ চাষী ইতিমধ্যেই চিংড়ি চাষ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। ট্রাস্টের সহ-সভাপতি বলেন, “আমাদের সদস্যদের মধ্যে অনেকেই প্রতারিত হয়েছেন। কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কেউ কেউ আত্মহত্যার কথা ভাবছেন। আমরা একাধিকবার মৎস্যমন্ত্রী বিপ্লব রায় চৌধুরী (Biplab Roy Chowdhury) এবং সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি দিয়েছি, কিন্তু কোনও পদক্ষেপ হয়নি।” জানা যাচ্ছে, এই প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়েছেন ছোট বড় প্রায় সব স্তরের চাষী ও এজেন্ট। কেউ কেউ তাঁদের প্রাপ্য টাকার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করছেন, কেউ বা একেবারে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দকুমারের বনভেড়া (Banbhira) অঞ্চলের চাষি শঙ্করকুমার মাইতি জানান, “আমরা চিংড়ি চাষ করি প্রাণ দিয়ে। রফতানিকারক সংস্থা মাছ নিয়ে গেলেও টাকা দেয়নি। প্রায় তিন কোটি টাকার প্রতারণা হয়েছে। আমরা অভিযোগ করেছি জেলা প্রশাসন থেকে মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত। কিন্তু কোনও সুরাহা পাইনি।”
এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব সরাসরি পড়েছে কর্মসংস্থানে। ‘অ্যাকওয়া ট্রাস্ট’ -এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক লক্ষের বেশি শ্রমিক, মাছ সংগ্রাহক ও পরিবহণকর্মী বেকার হয়ে পড়েছেন। রাজ্যের অন্যতম অর্থনৈতিক খাত চিংড়ি চাষ এভাবে ভেঙে পড়ায়, পুরো উপকূলবর্তী অর্থনীতি একরকম বিপর্যস্ত। প্রসঙ্গত, কয়েক বছর আগেও পূর্ব মেদিনীপুরের বাগদা (Bagda) ও ভেনামি (Vannamei) প্রজাতির চিংড়ি চাষ ছিল এক লাভজনক পেশা। প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে ৫৫ হাজারেরও বেশি চাষি যুক্ত ছিলেন এই কাজে। কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। ভর্তুকিহীন বিদ্যুৎ, নিম্নমানের ফিড, ওষুধের গুণগত মানের অভাব -এর সঙ্গে যুক্ত হয় রফতানিকারকদের প্রতারণা। চাষিদের অভিযোগ, একাধিক সংস্থা মাছ নেওয়ার পর প্রাপ্য টাকা দিচ্ছে না, বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রাখছে না। চিংডি চাষী হরিদাস মণ্ডল বলেন, “আগে চিংড়ি চাষে ভাল রোজগার হত। এখন শুধু ক্ষতি। কেউ কেউ বাড়ি বিক্রি করেছেন, কেউ ঋণে ডুবে গিয়েছেন। সরকার যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এই শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।”
অন্যদিকে, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাস্টের অভিযোগ, মৎস্য দফতরের (Fisheries Department) ডিরেক্টর থেকে জেলা শাসক পর্যন্ত সকলকেই বিষয়টি জানানো হলেও তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন শুধু তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে, বাস্তবে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যের এই সংকট শুধু চাষীদেরই নয়, তা রফতানি অর্থনীতিরও বড় ধাক্কা। পশ্চিমবঙ্গের চিংড়ি প্রতিবছর প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা আয় করে দেয়। সেই খাতেই আজ অচলাবস্থা। অর্থনীতিবিদ দেবাশিস মল্লিক বলেন, “চিংড়ি চাষ রাজ্যের অন্যতম রফতানিযোগ্য সম্পদ। এখানে আর্থিক প্রতারণা হলে তা সরাসরি রাজ্যের রাজস্বে প্রভাব ফেলবে।” এদিকে, সরকারিভাবে মৎস্য দফতর জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে এবং দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চাষীরা এখনও আশাবাদী নন। তাঁদের বক্তব্য, “আমরা আর প্রতিশ্রুতি চাই না, চাই টাকার সুরাহা।” চিংড়ি চাষী সংগঠনগুলির দাবি, রাজ্য সরকার যদি জরুরি আর্থিক সহায়তা ও প্রতারণার তদন্ত না করে, তাহলে আগামী মরসুমে চিংড়ি চাষ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন উপকূলীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে। উল্লেখ্য যে, বাংলার ‘সোনার মাছ’ এখন দুঃখের চিহ্নে পরিণত হয়েছে। চিংড়ি চাষ শুধু একটি শিল্প নয়, হাজার পরিবারের রুটি-রুজির উৎস। তাই এই সংকট থেকে চাষিদের রক্ষা করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : লালকেল্লা বিস্ফোরণ, Delhi Car Blast News: লালকেল্লার সামনে গাড়ি বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রাজধানী, গোটা দেশ জুড়ে হাই অ্যালার্ট!




