সাশ্রয় নিউজ, নয়াদিল্লি, ১০ নভেম্বরঃ সোমবার সন্ধ্যা নামতেই রাজধানীর বুক কাঁপিয়ে দিল এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। ঐতিহাসিক লালকেল্লা (Red Fort) মেট্রো স্টেশনের এক নম্বর গেটের ঠিক সামনেই পার্ক করা গাড়িতে ঘটে আকস্মিক বিস্ফোরণ। মুহূর্তের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে, প্রথম বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাশে থাকা আরেকটি গাড়িতেও ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটে। হুড়মুড় করে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের তিনটি গাড়িতে। কেঁপে ওঠে চাঁদনি চক (Chandni Chowk) -এর আশপাশের পুরো এলাকা। দিল্লির ঐতিহাসিক পরিসরে এমন ভয়াবহ ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, এই বিস্ফোরণে অন্তত দশ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ১৪ জনেরও বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের দ্রুত স্থানান্তর করা হয়েছে লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ হাসপাতাল (Lok Nayak Jay Prakash Narayan Hospital) এবং রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালে (RML Hospital)। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আহতদের মধ্যে কয়েকজন দগ্ধ অবস্থায় ভর্তি, এবং কয়েকজনের অবস্থা “গুরুতর” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্ফোরণের মুহূর্তে মেট্রো স্টেশনে প্রচুর যাত্রী উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী রাকেশ গুপ্ত (Rakesh Gupta) জানান, “প্রথমে মনে হয়েছিল গ্যাস সিলিন্ডার ফেটেছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরপর দুটি গাড়ি বিস্ফোরিত হয়। আমরা চারদিকে ধোঁয়া আর আগুনের মধ্যে পড়ে যাই। সবাই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছিল।” আতঙ্কে থমকে রাজধানী।

দিল্লি দমকল বিভাগ (Delhi Fire Service) জানিয়েছে, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাতটি ফায়ার ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় চল্লিশ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। আগুনের তীব্রতায় পাশের দোকানগুলির কিছু অংশও পুড়ে গেছে বলে জানা গিয়েছে। দমকলের এক আধিকারিক বলেন, “ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি আগুন ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক গাড়িতে। প্রথম বিস্ফোরণ থেকেই বোঝা যাচ্ছিল এটি কোনও সাধারণ দুর্ঘটনা নয়। পরে আরও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।”
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান: নাশকতার ছক
দিল্লি পুলিশের বিশেষ সেল (Special Cell of Delhi Police) ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল ঘিরে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশের এক সিনিয়র আধিকারিক জানিয়েছেন, “আমরা নিশ্চিত হয়েছি এটি দুর্ঘটনা নয়। এখানে পরিকল্পিতভাবে বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া ধাতব টুকরো, সার্কিট বোর্ড এবং ওয়্যারিং দেখে বোঝা যাচ্ছে, IED (Improvised Explosive Device) ব্যবহার করা হয়েছে।” ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গিয়েছে, বিস্ফোরণে ব্যবহৃত ডিভাইসে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, টাইমার সার্কিট এবং রিমোট কন্ট্রোলের ইঙ্গিত মিলেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বিস্ফোরক সাধারণত জঙ্গি হামলায় ব্যবহার হয়।
সন্দেহভাজন জঙ্গি গ্রেফতার। ঘটনার কিছু ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লি পুলিশ এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করেছে। তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। সূত্রের খবর, প্রাথমিক জেরায় সে জানিয়েছে, এই হামলার পরিকল্পনা আগেই করা হয়েছিল, এবং মূল উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহাসিক স্থানের কাছে ভয় সৃষ্টি করা। পুলিশের সন্দেহ, এই হামলার সঙ্গে জইশ-ই-মোহাম্মদ (Jaish-e-Mohammed) এবং আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ (Ansar Ghazwat-ul-Hind) –এর একটি সক্রিয় মডিউলের যোগ থাকতে পারে। দিল্লি পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, “এই হামলার পেছনে একটি সংগঠিত জঙ্গি চক্রের হাত থাকতে পারে। আমরা NIA (National Investigation Agency) ও NSG (National Security Guard)-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি।”
কেন্দ্রের নজরে বিস্ফোরণ
ঘটনার পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) গোটা ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট চান। প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল (Ajit Doval) ব্যক্তিগতভাবে তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সূত্রের খবর, সোমবার রাতেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন যাতে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ নজরদারি বাড়ানো যায়।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন , “লালকেল্লার সামনে বিস্ফোরণের ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছি। দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।”
রাজধানী থেকে মুম্বই পর্যন্ত হাই অ্যালার্ট
ঘটনার পর শুধু দিল্লিই নয়, মুম্বই (Mumbai), লখনউ (Lucknow) এবং কলকাতা সহ (Kolkata) একাধিক বড় শহরে জারি করা হয়েছে হাই অ্যালার্ট। অযোধ্যার (Ayodhya) রামমন্দির এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। রেলস্টেশন, মেট্রো, বিমানবন্দর ও পর্যটনস্থলগুলিতে কঠোর তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পুলিশ সূত্রে খবর, দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা একযোগে কাজ করছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে চেকিং বেড়ে গিয়েছে, এবং প্রতিটি গাড়ি ও যাত্রীকে বিশেষভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ফরিদাবাদে উদ্ধার বিপুল বিস্ফোরক
এদিকে বিস্ফোরণের ঠিক পরদিন ফরিদাবাদে (Faridabad) এক অভিযানে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ যৌথভাবে প্রায় ৩৬০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে। উদ্ধার হয়েছে ২০টি টাইমার, ওয়াকিটকি এবং রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইস। তদন্তকারীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিমধ্যেই ২৯০০ কেজি বিস্ফোরক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, যা বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, “আমরা আশঙ্কা করছি, রাজধানীতে হওয়া বিস্ফোরণ এবং ফরিদাবাদ থেকে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের মধ্যে কোনও সংযোগ থাকতে পারে। তদন্ত সেই দিকেই এগোচ্ছে।”
সাধারণ মানুষের আতঙ্ক ও উদ্বেগ। লালকেল্লার আশপাশে দোকান ও বাজারগুলি মঙ্গলবার সকাল থেকে বন্ধ। এলাকাবাসী আতঙ্কে ঘর থেকে কম বের হচ্ছেন। এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রতিদিন এখানে দোকান চালাই। এমন ঘটনার পর এখন মনে হচ্ছে, যেকোনও সময় বিপদ ঘটতে পারে।”

ট্র্যাফিক পুলিশও ওই এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। মেট্রো পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত। দিল্লির নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে হলেও শহরজুড়ে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক উন্মোচিত। রাজধানীর বুকের মধ্যে এমন একটি ঐতিহাসিক স্থানের কাছে বিস্ফোরণ ঘটানো নিঃসন্দেহে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ব্যর্থতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, “এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, রাজধানীতে এখনও নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরেও দুর্বলতা আছে।” এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, “লালকেল্লা ভারতের অন্যতম সংবেদনশীল এলাকা। সেখানে যদি এমনভাবে বিস্ফোরক পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে আরও সক্রিয় হতে হবে।”
গোটা দেশজুড়ে নির্বাচনের আগে সতর্কতা
এই ঘটনার সময়েই বিহার বিধানসভার দ্বিতীয় দফার ভোটের আগের দিন দেশজুড়ে চলছিল নির্বাচন প্রস্তুতি। মগধ রাজ্যের (Magadh Region) ১২২ আসনে ভোটের আগে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ বৈঠক করে। কেন্দ্রীয় সূত্রে খবর, বিস্ফোরণের পর থেকেই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই বিস্ফোরণ শুধু দিল্লিকেই নয়, পুরো দেশকেই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এক বিজেপি নেতা বলেন, “দেশের নির্বাচনী সময়ে এই ধরনের ঘটনা একেবারেই কাম্য নয়। এটা স্পষ্টভাবে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা।”
গোয়েন্দা সংস্থার নজর। NIA এবং NSG ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা শুরু করেছে। বিস্ফোরণের টাইমলাইন, গাড়ির মালিকদের নাম, পার্কিং রেকর্ড- সব কিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানায়, একটি সাদা SUV গাড়িতে মূল বিস্ফোরণ হয়, এবং সেই গাড়িটি ভুয়ো নম্বর প্লেটে চলছিল। সাইবার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আশপাশের দোকান ও রাস্তার অন্তত ৫০টি ক্যামেরার ভিডিও পরীক্ষা করছে তদন্তকারী দল।
আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ
দিল্লির এই বিস্ফোরণের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও স্থান পেয়েছে। একাধিক বিদেশি সংবাদ সংস্থা বলছে, ভারতের রাজধানীতে ঐতিহাসিক স্থানের এত কাছে জঙ্গি হামলা দেশের নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
লালকেল্লার এই বিস্ফোরণ শুধু রাজধানী নয়, পুরো দেশকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। জনগণের মনে এখন একটাই প্রশ্ন- ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত? কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা তদন্তে যুক্ত হলেও এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।দিল্লির প্রতিটি রাস্তা এখন পুলিশি নজরদারিতে। সরকার আশ্বাস দিয়েছে, দোষীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা হবে। তবে এই ভয়াবহ ঘটনার অভিঘাত এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
ছবি : সংগৃহীত




