সোমনাথ আচার্য, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ধুনো জ্বালানো ঐতিহ্য, আর তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা। বহু পরিবার সন্ধেবেলা ধুনো জ্বালিয়ে ঘরকে পবিত্র করে তোলেন; পাশাপাশি অনেকের বিশ্বাস যে ধুনো কুনজর বা নেতিবাচক দৃষ্টিকে দূর করতে সাহায্য করে। বাস্তুশাস্ত্রে (Vastu Shastra) এমন কিছু সহজ উপায় আছে যা ঘরে ধুনো দেওয়ার সময় প্রয়োগ করলে শত্রুর কুনজর কমে আসে এবং সংসারে শান্তি ফিরে আসে, এমনটাই বলে প্রচলিত অভিজ্ঞতা ও লোকবিশ্বাস। স্থানীয় প্রথা ও বাস্তুশাস্ত্রের আদলে ধুনোতে যে পাঁচ উপাদান যোগ করতে বলা হয়, সেগুলো হল, শস্যের তুষ বা চালের খোসা (paddy husk), শুকনো নিমপাতা (neem leaves), সর্ষে (mustard seeds), কর্পূর (camphor) এবং লোবান বা গুগগুল (frankincense)। বাস্তুশাস্ত্রের প্রচলিত ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই উপাদানগুলো একত্রে নেতিবাচক শক্তিকে শোষণ ও দূর করে এবং ঘরকে শুভ শক্তিতে পরিপূর্ণ করে। “ধুনোতে নিমপাতা ও কর্পূর মিশালে কুনজর দূর হয়,” অনেক প্রবীণ বাস্তুবিশারদের মুখেই শোনা যায় এই কথা।
প্রথমত, শস্যের তুষ বা চালের খোসা (paddy husk)। গ্রাম্য ও শহুরে অনেকে বলেন, শস্যের তুষে এমন এক ধরণের ‘শোষণ ক্ষমতা’ আছে যা ঘরে ঢুকা অশুভ দৃষ্টিকে টেনে নেয় এবং ধীরে ধীরে তুষ তা শোষণ করে। তাই সন্ধেবেলায় ধুনো দেওয়ার সময় অল্প পরিমাণ শস্যের তুষ মিশিয়ে দিলে ঘরের পরিবেশে পরিবর্তন দেখা দেয়। বাস্তবভাবে এই তত্ত্বকে বৈজ্ঞানিক আলোকে প্রমাণ করা না গেলেও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসে তুষকে শক্তি-বিজ্ঞান ধরে নেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, শুকনো নিমপাতা (neem leaves)। নিম প্রাচীনকাল থেকেই জীবাণুনাশক ও শুভ গুণে সমৃদ্ধ হিসেবে পরিচিত। বাস্তুশাস্ত্রে নিমপাতাকে অত্যন্ত শুভ ধরা হয়, নিমপাতার ধোঁয়া বাজে শক্তিকে দূর করে বলে মনে করা হয়। অনেক পরিবার সন্ধেবেলায় ধুনো জ্বালানোর সময় কিছু নিমপাতা মিশিয়ে রাখেন, তাতে ঘরের বাতাবরণ হালকা ও পরিষ্কার মনে হয়। স্থানীয়রা বলেন, “নিমের ধোঁয়া মানসিকভাবে শান্তি আনে এবং অচেনা নেতিবাচকতার প্রভাব কমায়।”
তৃতীয়ত, সর্ষে (mustard seeds)। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী সর্ষে ভেতরে এমন এক প্রকার রক্ষণাবেক্ষণ শক্তি বহন করে যা কুনজরকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। বাস্তুশাস্ত্রে সর্ষে ধুনোর সঙ্গে মিশালে শুভ শক্তি আকর্ষিত হয়, অল্প পরিমাণ সর্ষে বা সর্ষের দানা ধুনোর সঙ্গে মিশিয়ে রাখার নিয়ম প্রচলিত। অনেকের অনুশীলনে সকালে বা সন্ধ্যায় সর্ষে মিশিয়ে ধুনো দেওয়াটাই নিয়ম হয়ে আছে।
চতুর্থত, কর্পূর (camphor)। কর্পূর ধুনোর মধ্যে দিলে তা দ্রুত গন্ধ ছড়িয়ে দেয় এবং আধ্যাত্মিক ভাবনা জাগায়। প্রচলিত ধারণা, যদি সংসারে সত্যিই কুনজর থাকে, তাহলে কর্পূর তা দূর করতে বিশেষভাবে কার্যকর। তাই সন্ধেবেলায় ধুনো দেওয়ার সময় অল্প পরিমাণ কর্পূর দেন তাঁরা; এতে ঘরের নেতিবাচকতা কমে এবং আত্মিক উচ্ছ্বাস আসে। অনেক বাড়িতে কর্পূর জ্বালিয়েই শুরু করা হয় সন্ধেবেলার পূজা-অনুষ্ঠান।
পঞ্চমত, লোবান বা গুগগুল (frankincense)। লোবানকে ঘ্রাণশোভা ও পবিত্রতাকে বাড়ানোতে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। বাস্তুশাস্ত্রে লোবানকে নেতিবাচক শক্তি দূর করার ক্ষমতা আছে, বলা হয়ে থাকে, লোবান ধোঁয়া নেমে এলে অশুভ প্রভাব নীরব হয়। তাই সন্ধেবেলায় ধুনো দেওয়ার সময় লোবানের অল্পটুকু ব্যবহার অনেক পরিবারের রীতিতে বিরাজমান। উল্লেখ্য, বাস্তুশাস্ত্রের অনুশাসনে ধুনো দেওয়ার এই উপকরণগুলো ব্যবহার করার সময় কিছু সতর্কতা মেনেই চলা উচিত, প্রথমত, কোনও উপাদানই সরাসরি শত্রুকে মোকাবিলার অস্ত্র নয়; এগুলো কেবল আধ্যাত্মিক ও মানসিক সান্ত্বনা প্রদান করে। দ্বিতীয়ত, কর্পূর ও লোবান আগুনের কাছে রাখার সময় নিরাপদ ব্যবস্থার কথা মাথায় রাখতে হবে; ছোটদের নাগালে রাখবেন না। তৃতীয়ত, যদি পরিবারের কোনও সদস্যের শ্বাসকষ্ট বা অ্যালার্জি থাকে, তাহলে ধোঁয়া কমানোর অথবা বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করার পরামর্শ জেনে নেবেন।
প্রবীণদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বহু পরিবার এই প্রথা মেনে নিজের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখেছেন,অর্থাৎ তারা মানসিকভাবে শান্তি ও ঘরের পরিবেশে স্থিরতা পেয়েছেন। এক প্রবীণ সংসারিক বলেন, “ধুনো দিলে কাজের চাপ, বিতর্ক সব কিছুর ওপর একটা বলয় পড়ে, শব্দে বোঝাবার মতো নয়, কিন্তু মনের কাছে শান্তি আসে।”
কীভাবে ধুনোটি দেবেন?
সন্ধেবেলা ঘরের প্রধান ঘরে জল-বাতাস চলমান রাখবেন; ধুনোর পাত্রটি নিরাপদ স্থানে রাখবেন; এবং প্রত্যেকটি উপাদান অতি সামান্য পরিমাণে ব্যবহার করবেন। নিয়মিতভাবে ইতিবাচক কাজ ও নৈতিক নিয়ম মেনে চলায় বাস্তুশাস্ত্রের ধারণা অনুযায়ী কুনজর দূর হবে।
সার্বিকভাবে মনে রাখতে হবে, ধুনোর মধ্যে শস্যের তুষ (paddy husk), নিমপাতা (neem leaves), সর্ষে (mustard seeds), কর্পূর (camphor) এবং লোবান (frankincense) মিশিয়ে সন্ধেবেলা ধুনো দিলে বাস্তুশাস্ত্রীয় বিশ্বাস মতো ঘর থেকে কুনজর অর্থাৎ নেতিবাচক দৃষ্টিদোষ দূর করা সম্ভব। তবে সবকিছুতেই স্বচ্ছন্দ ও নিরাপত্তা বজায় রাখা জরুরি।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Arjun Chakraborty message, Rituparna Sengupta birthday news | ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর জন্মদিনে আবেগঘন চিঠিতে অর্জুন চক্রবর্তীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা



