সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি, ২৭ অক্টোবর: কেন্দ্রীয় সরকারের আপত্তি খারিজ করে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে বড় জয় এনে দিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। ১০০ দিনের কাজ (MGNREGA) নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) রায়ই বহাল রাখল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সোমবার বিচারপতি বিক্রম নাথ (Justice Vikram Nath) ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতা (Justice Sandeep Mehta) -এর বেঞ্চ জানিয়ে দিল, কেন্দ্রের আরজি কোনও ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে হাইকোর্টের ১৮ জুনের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী দিনে বাংলায় ফের চালু হবে ১০০ দিনের কাজ প্রকল্প। এই রায়ের ফলে রাজ্যে বহু মানুষের মুখে স্বস্তির হাসি ফিরে আসবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
প্রায় দুই বছর ধরে বাংলায় স্থগিত ছিল ১০০ দিনের কাজের অর্থপ্রদানের প্রক্রিয়া। ২০২২ সালের মার্চ মাসে মনরেগা আইনের (MNREGA Act) ২৭ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে রাজ্যের অর্থ ছাড় বন্ধ করে দেয় কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি ছিল, প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে স্বচ্ছতা রক্ষার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজ্য সরকার একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলেই অভিহিত করে আসছিল। হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, “১০০ দিনের কাজের মতো জনস্বার্থমূলক প্রকল্পকে চিরতরে ঠাণ্ডাঘরে পাঠানো যায় না। জনগণের কল্যাণে এই প্রকল্প পুনরায় শুরু করা আবশ্যক।” সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই সুপ্রিম কোর্টে যায় কেন্দ্র। কিন্তু সোমবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতে কেন্দ্রের যুক্তি খারিজ হয়ে যায়।
বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ মন্তব্য করে, “এই প্রকল্প সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত একটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। কেবল প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রশ্ন তুলে জনগণের অধিকারকে অস্বীকার করা যায় না।” ফলে কলকাতা হাইকোর্টের রায়ই বহাল থাকছে, অর্থাৎ বাংলায় ১ আগস্ট থেকে ফের চালু হবে ১০০ দিনের কাজ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধুমাত্র একটি রাজ্যের নয়, তা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। সংবিধানের সপ্তম তফসিল অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচি যৌথভাবে কেন্দ্র ও রাজ্যের দায়িত্ব। সেই ভিত্তিতেই আদালতের এই রায়কে ‘ব্যালেন্সড অ্যান্ড কনস্টিটিউশনালি সাউন্ড’ বলছেন বিশ্লেষকরা।অন্যদিকে, এই রায় ঘোষণার পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “চলবে না অন্যায়, টিকবে না ফন্দি, জনগণের আদালতে হতে হবে বন্দি! জয় বাংলা।” যদিও সরাসরি কারও নাম নেননি, তবু তাঁর পোস্টে লক্ষ্য যে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপিকেই (BJP) করা হয়েছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। উল্লেখ্য যে, রাজ্যের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হয়েছিল, কেন্দ্র রাজনৈতিক কারণেই টাকা বন্ধ রেখেছে। রাজ্য সরকারের তরফে কেন্দ্রকে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হয় বকেয়া অর্থ মুক্তির জন্য। রাজ্য প্রশাসন জানায়, কেন্দ্রের পর্যবেক্ষক দল যে ২৩টি প্রশ্ন তুলেছিল, তার সবগুলিরই জবাব হিসেবে পাঠানো হয়েছে ২৩টি ‘অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট’ (Action Taken Report)। কেন্দ্রীয় সরকারের শর্তও মানা হয়েছিল, তবুও অর্থ ছাড়েনি কেন্দ্র। এর আগেই কলকাতা হাইকোর্টের বেঞ্চ সেই আচরণে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। রায়ে বলা হয়েছিল, “মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষা করে প্রশাসনিক জটিলতায় সাধারণ মানুষের জীবিকা রুদ্ধ করা গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণ হতে পারে না।” সোমবার সেই রায়কেই সমর্থন জানাল সুপ্রিম কোর্ট।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়ের মাধ্যমে রাজ্যে নতুন করে কেন্দ্র-রাজ্য টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। কারণ, কেন্দ্রের অবস্থান ছিল, রাজ্যের ‘কার্যকরী জবাবদিহিতার অভাব’। অন্যদিকে, তৃণমূলের দাবি, আদালত প্রমাণ করল যে কেন্দ্র রাজনৈতিক কারণে বাংলার গরিব মানুষের প্রাপ্য অর্থ আটকে রেখেছিল।
আইনজীবী ও সংবিধান বিশারদ আনন্দ চট্টোপাধ্যায় (Anand Chattopadhyay) বলেন, “এই রায় প্রমাণ করল যে, সংবিধানিক অধিকার ও প্রশাসনিক ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। কেন্দ্র চাইলে তদন্ত চালাতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার বন্ধ রাখতে পারে না।” রাজ্য সরকার সূত্রে খবর, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরপরই রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন দপ্তর (Rural Development Department) কাজের প্রস্তুতি শুরু করেছে। এক আধিকারিক জানান, “আমরা প্রস্তুত। রায় অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করা হবে। গ্রামীণ শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করাও অগ্রাধিকার।”
রাজনৈতিক মহল বলছে, এই রায় রাজ্য সরকারের জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি কেন্দ্রের জন্য বড় অস্বস্তি। কারণ, এই রায়ের ফলে কেবল টাকা ছাড়ার বাধ্যবাধকতাই নয়, কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠল। একজন প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “এটা শুধু আইনি জয় নয়, মানুষের জয়। কারণ, এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি মানুষ আবারও কাজের সুযোগ পাবেন।”
অন্যদিকে, বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের তরফে দাবি, এই রায় ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’। তাঁদের বক্তব্য, কেন্দ্রের অর্থ পাঠানোর আগে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে কেন্দ্র কতটা দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার। প্রসঙ্গত, বাংলায় ১০০ দিনের কাজ প্রকল্প চালু হওয়ার ফলে রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি ফিরবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে এই রায় তৃণমূলের রাজনৈতিকভাবে বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : SIR 2025 | নতুন ভোটার কার্ড মিলবে, কারা পাবেন? স্পষ্ট জানালেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার




