সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: দেশের ১২ রাজ্যে শুরু হচ্ছে ‘SIR’ বা (Summary Intensive Revision of Electoral Rolls) ভোটার তালিকার নিবিড় পর্যালোচনা প্রক্রিয়া। আজ মঙ্গলবার থেকেই শুরু হচ্ছে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যা চলবে একটানা এক মাস ধরে। নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) তরফে জানানো হয়েছে, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ পাবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। এদিন সাংবাদিক বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমার (Jhanesh Kumar) বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করলেন, কারা পাবেন নতুন ভোটার কার্ড (EPIC Number) এবং কাদের ক্ষেত্রে পুরনো নম্বরই বহাল থাকবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “যাঁদের আবেদনপত্রে পরিবর্তন রয়েছে, বিশেষ করে ঠিকানা বদল বা পোলিং স্টেশন পরিবর্তন হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই নতুন ইলেকটোরাল ফটো আইডেন্টিটি কার্ড বা EPIC নম্বর পাবেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “বিহারের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর হয়েছে। সারা দেশেই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।” এই বক্তব্যের পর ভোটারদের মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে যায়। নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ সূত্রে খবর, এবারের SIR প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক ভোটার ঠিকানা পরিবর্তনের আবেদন জমা দিয়েছেন। সেই সমস্ত আবেদন যাচাইয়ের পর যাঁদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন কার্যকর বলে ধরা হবে, তাঁদের নতুন EPIC নম্বর দেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনের মতে, প্রতি বছরই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ নিয়মিতভাবে করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়, মৃত বা অনুপযুক্ত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয় এবং পুরনো তথ্য সংশোধন করা হয়। এবারের বিশেষত্ব হলো, SIR 2025 -এর তথ্য সরাসরি সংযুক্ত করা হবে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির সঙ্গে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, “আমরা চাইছি রাজ্যগুলির বিধানসভা ভোট এই SIR-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী করা হোক। যেমন বিহারে করা হচ্ছে।” অর্থাৎ, এই তালিকাই হবে ভোটার চিহ্নিতকরণের ভিত্তি।
কমিশনের তরফে আরও জানানো হয়েছে, যাঁদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে, তাঁদের আবার নতুন করে কোনও নথি জমা দিতে হবে না। পুরনো তালিকায় তাঁদের নাম দেখাতে পারলেই বর্তমান SIR প্রক্রিয়ায় তাঁদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তবে নতুন ভোটারদের ক্ষেত্রে বা তথ্য সংশোধনের জন্য ১১টি নির্দিষ্ট নথির তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এগুলির মধ্যে অন্যতম আধার কার্ড (Aadhaar Card), যা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছে, আধার কার্ডকে ভোটার পরিচয়পত্র হিসাবে গ্রহণ করা যাবে। ফলে এবারের SIR প্রক্রিয়ায় আধার হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। নির্বাচন কমিশনের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানান, “এবারের SIR-এ আধার কার্ড সংযুক্তির প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, প্রতিটি রাজ্যে ডিজিটাল যাচাই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করা।”
বাংলা সহ দেশের অন্যান্য রাজ্যেও একই সঙ্গে চলছে এই প্রক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গে জেলা প্রশাসন ও ব্লক পর্যায়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে মাঠপর্যায়ের কাজ। বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO) ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের তথ্য যাচাই করছেন। জেলা নির্বাচন আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনও বৈধ ভোটারের নাম যেন বাদ না যায় এবং একইসঙ্গে ভুয়ো বা মৃত ভোটারের নাম যেন দ্রুত মুছে ফেলা হয়। নির্বাচন কমিশনের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “আমরা চাইছি ভোটার তালিকা হালনাগাদ হোক এমনভাবে যাতে আগামী নির্বাচনে কোনও অভিযোগ বা বিভ্রান্তি না থাকে। নাগরিকের ভোটাধিকার রক্ষাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, SIR প্রক্রিয়া শুধুমাত্র প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। কারণ, ভোটার তালিকা যত সঠিক হবে, নির্বাচনী প্রক্রিয়াও তত স্বচ্ছ হবে। রাজনীতি বিশ্লেষক অমিতাভ সেনগুপ্ত (Amitava Sengupta) বলেন, “SIR প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে ভোটারদের আস্থা অনেক বাড়বে। জাল ভোটিং বা নামের বিভ্রান্তি অনেকটাই কমবে।”
দেশের ১২টি রাজ্যে একযোগে চলা এই SIR প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড়, রাজস্থান, ওড়িশা, তামিলনাড়ু, গুজরাট, কেরল, ত্রিপুরা ও হরিয়ানা। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রতিটি রাজ্যে জেলা নির্বাচন আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়মিত ভার্চুয়াল পর্যালোচনা বৈঠক হবে, যাতে কোনও ভুলচুক না থাকে। উল্লেখ্য, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন এবং ভবিষ্যতের লোকসভা ভোটের আগে এই SIR 2025 হয়ে উঠছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। নতুন ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি, পুরনো নাম সংশোধন, এবং ঠিকানা পরিবর্তনের ভিত্তিতে নতুন EPIC কার্ড সবই মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে আরও নিখুঁত, আরও আধুনিক ভোটার তালিকা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ কুড়ি-তম কিস্তি)




