সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শ্রীনগর : জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যসভা নির্বাচনে (Jammu & Kashmir Rajya Sabha Election) বিজেপির (BJP) বড় জয় ঘিরে উল্লাসে মেতে উঠেছে দলীয় কর্মীরা। আর্টিকেল ৩৭০ (Article 370) প্রত্যাহারের পর প্রথমবারের মতো হওয়া এই নির্বাচনে বিজেপি রাজ্য রাজনীতিতে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেছে। রাজ্যের বিজেপি সভাপতি সতপাল শর্মা (Satpal Sharma) চতুর্থ আসনে জয়ী হয়ে ন্যাশনাল কনফারেন্সের (National Conference) প্রার্থী ইমরান নবী দারকে (Imran Nabi Dar, পরিচিত ইমরান নিসার নামে) ২২ ভোটে হারিয়ে রাজ্যসভায় প্রবেশ করেছেন। তিনি মোট ৩২ ভোট পেয়েছেন, যা বিজেপির ভোটব্যাঙ্কের দৃঢ়তা এবং কৌশলগত সংগঠনের ফল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই নয়, তা জম্মু-কাশ্মীরের (Jammu and Kashmir) রাজনৈতিক ভবিষ্যতের স্পষ্ট রূপও বটে। বিজেপির কর্মীরা বলছেন, এই জয় “ওমর আবদুল্লার (Omar Abdullah) দলের বিরুদ্ধে জনতার রায়”। শ্রীনগর থেকে জম্মু পর্যন্ত জয় উদযাপনে মিষ্টি বিলি, আতশবাজি আর শোভাযাত্রায় মেতে উঠেছে পার্টির সমর্থকেরা। বিজেপি নেতা সুনিল শর্মা (Sunil Sharma) বলেন, “এই জয় শুধু সতপাল শর্মার নয়, এটা জম্মু-কাশ্মীরের উন্নয়নের পক্ষে জনতার রায়। মানুষ বিভেদের রাজনীতি নয়, উন্নয়নের রাজনীতি বেছে নিয়েছে।” সতপাল শর্মা, যিনি বিজেপির বর্তমান রাজ্য সভাপতি এবং প্রাক্তন মন্ত্রী, নির্বাচনী প্রচারে স্থানীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং শান্তির বার্তা নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রচারে বিজেপির ২৮ জন বিধায়কের পাশাপাশি কয়েকজন স্বতন্ত্র এবং অন্যান্য ছোট দলের সমর্থনও মিলেছিল। অন্যদিকে, ন্যাশনাল কনফারেন্স (NC) এবং কংগ্রেস (Congress) জোটের প্রার্থী ইমরান নবী দার শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হন।
উল্লেখ্য, এই নির্বাচনে মোট চারটি আসনের জন্য ভোট হয়েছিল, যা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে খালি পড়ে ছিল। ২০২৪ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত লিজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি নির্বাচনের পর এবার ৯০ সদস্যের অ্যাসেম্বলিতে (যার মধ্যে ২টি আসন খালি) ৮৮ জন বিধায়ক ভোট দেন। এনসি-কংগ্রেস জোটের ৫৪ জন বিধায়কের বিপরীতে বিজেপির ছিল ২৮ জন।নির্বাচনের প্রথম তিনটি আসনে এনসি এগিয়ে ছিল। চৌধুরী মোহাম্মদ রমজান (Chaudhary Mohammad Ramzan), সাজ্জাদ কিচলু (Sajjad Kichloo) এবং শামী ওবেরই (Shami Oberoi / G.S. Oberoi) তাঁদের আসন ধরে রাখেন। কিন্তু চতুর্থ আসনে বিজেপির অপ্রত্যাশিত উত্থান এনসির ঘাঁটিতে ধাক্কা দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পিডিপি (PDP) এবং কংগ্রেসের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও এনসি পরাজিত হয় মূলত পিপলস কনফারেন্সের (People’s Conference) সাজ্জাদ গনি লোন (Sajjad Gani Lone) দলের নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে। লোনের দল ভোটদানে বিরত থাকায় বিজেপির পথ অনেকটাই সহজ হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, একটি আসন জিততে ৪৫ ভোট প্রয়োজন ছিল, তবে চতুর্থ আসনে ভোটের কৌশলগত বিন্যাসে বিজেপি সংখ্যায় কম থাকলেও সঠিক গণনা ও ক্রস ভোটিংয়ের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নেয়।
বিজেপির সতপাল শর্মা বলেন, “এই জয় জনতার বিশ্বাসের প্রতিফলন। জম্মু-কাশ্মীর আর পিছিয়ে থাকবে না, উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রমাণ করেছি যে, বিজেপি শুধু জম্মু নয়, গোটা উপত্যকায় জনসমর্থন পাচ্ছে।” অন্যদিকে, এনসি নেতা ওমর আবদুল্লাহ বলেছেন, “আমরা তিনটি আসন জিতেছি, সেটা আমাদের শক্তির প্রমাণ। তবে চতুর্থ আসনের ফলাফল অবশ্যই একটি আঘাত। আমরা পর্যালোচনা করব কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হল।” ইমরান নবী দার তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “ভোটারদের সিদ্ধান্তকে আমরা সম্মান করি। লড়াই শেষ হয়নি, এটি কেবল শুরু।” রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ফলাফল কেন্দ্রশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। বিজেপির এই সাফল্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০১৯ সালে আর্টিকেল ৩৭০ বিলুপ্তির পর বিজেপির দাবি ছিল, “নতুন জম্মু-কাশ্মীর উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে।” এই জয় সেই দাবির রাজনৈতিক মান্যতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এনসি-কংগ্রেস জোটের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা এবং পিডিপির জনপ্রিয়তা হ্রাস বিজেপিকে রাজ্য রাজনীতিতে আরও প্রভাবশালী করে তুলছে। স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি এখন দৃশ্যমান। জম্মু বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Jammu) রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর রমেশ কৌল বলেন, “এই নির্বাচনটি প্রতীকী হলেও এর প্রভাব গভীর। সতপাল শর্মার জয় বিজেপির জন্য শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক জয়।”
ছবি : প্রতীকী




