সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পটনা, ২৪ অক্টোবর ২০২৫: বিহারের রাজনীতিতে ফের নতুন বিতর্ক। লালু প্রসাদ যাদবের জ্যেষ্ঠ পুত্র তেজ প্রতাপ যাদব (Tej Pratap Yadav) ফের একবার রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটালেন তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্যে। জনশক্তি জনতা দলের (Jan Shakti Janata Dal) প্রার্থী হিসেবে মহুয়া (Mahua) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “মরেও আমি ইন্ডি জোটে ফিরব না।” এই মন্তব্যের পর থেকেই বিহারের রাজনীতিতে উত্তেজনা তুঙ্গে। রাজনৈতিক মহল বলছে, লালু পরিবারের অন্দরেই যেন তৈরি হচ্ছে নতুন এক রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত।
তেজ প্রতাপ যাদব বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, “না, আমি মরেও সেই দলে ফিরে যাব না। আমাদের নিজস্ব দল আছে, জনশক্তি জনতা দল। আমরা সেটাকেই এগিয়ে নিয়ে যাব। আমার কোনও পদলোভ নেই। যারা পদ ও ক্ষমতার লোভে পড়েছে, তারা গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রী হোক।” তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট আভাস মিলেছে যে, তিনি এখন সম্পূর্ণ আলাদা পথে হাঁটতে চান, ভাই তেজস্বী যাদব (Tejashwi Yadav)-এর নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় জনতা দল (RJD) -এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে।বিহারের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, তেজ প্রতাপের এই মন্তব্য শুধুমাত্র দলবদলের বার্তা নয়, এটা তার নতুন রাজনৈতিক অবস্থান। রাজনীতিতে বরাবরই স্পষ্টভাষী হিসেবে পরিচিত এই নেতা বলেন, “আমি আমার নিজের পথেই হাঁটব। জনশক্তি জনতা দল শুধু একটা রাজনৈতিক দল নয়, এটা যুব সমাজের আন্দোলন। আমরা রাজনীতিকে সাফ করব। লোভ ও দুর্নীতিতে যারা ডুবে আছে, তাদের আমরা মানুষের আদালতে হাজির করব।”

রাজনৈতিক মহলে আগে থেকেই জল্পনা চলছিল, জনশক্তি জনতা দল সম্ভবত ইন্ডিয়া জোটে (INDIA Bloc) যোগ দিতে পারে, যাতে বিজেপির (BJP) বিরুদ্ধে একটি একতাবদ্ধ ফ্রন্ট তৈরি হয়। কিন্তু তেজ প্রতাপের এই তীব্র মন্তব্যে সেই সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর বক্তব্যে যে “পদলোভী মুখ্যমন্ত্রী” মন্তব্য ছিল, সেটি স্পষ্টতই ভাই তেজস্বী যাদবকেই উদ্দেশ্য করে করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “তেজ প্রতাপ যাদব এখন তাঁর নিজের রাজনৈতিক ব্র্যান্ড তৈরি করতে চাইছেন। তিনি বুঝে গিয়েছেন যে, RJD বা ইন্ডি জোটের ছত্রছায়ায় থেকে তাঁর পরিচয় আলাদা করা সম্ভব নয়। তাই তিনি এখন একক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।”
RJD এবং জেডিইউ (JDU) -এর পক্ষ থেকে যদিও এই বিষয়ে কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তেজ প্রতাপের বক্তব্যে স্পষ্ট অস্বস্তি তৈরি হয়েছে RJD শিবিরে। বিশেষ করে ভোটের আগে এই ধরনের মন্তব্য দলের ভাবমূর্তি ও ঐক্য দুই-ই নষ্ট করতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তেজ প্রতাপ যাদব আরও বলেন, “আজকের রাজনীতিতে সততা হারিয়ে গিয়েছে। মানুষদের লোভ ও সুযোগসন্ধান এখন রাজনীতি নির্ধারণ করছে। আমি সেই পথে হাঁটব না। আমার রাজনীতি মানুষের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়।” তিনি যোগ করেন, “আমাদের দলে যে আসবে, সে জনসেবার মানসিকতা নিয়ে আসবে। মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রী হওয়ার লোভ নয়, মানুষের সমস্যার সমাধানই আমাদের লক্ষ্য।”
বিহারের বিজেপি শিবির অবশ্য এই মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে। রাজ্যের বিজেপি মুখপাত্র বলেন, “তেজ প্রতাপ যাদব অবশেষে বুঝতে পেরেছেন, ইন্ডি জোট কেবল ক্ষমতার লোভে গঠিত এক জোট। তাঁর বক্তব্য বাস্তবের প্রতিফলন।” এই মন্তব্যে বিজেপি-এর রাজনৈতিক সুবিধা আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিকভাবে তেজ প্রতাপের বক্তব্য বিহারের আসন্ন নির্বাচনের সমীকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর জনশক্তি জনতা দল ভোটে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখন রাজনৈতিক মহলের নজরে। অনেকেই বলছেন, তেজ প্রতাপ যাদবের এই অবস্থান ভবিষ্যতে বিহারের রাজনীতিতে “তৃতীয় শক্তি”-এর উত্থান ঘটাতে পারে, যদিও আপাতত সেটি সময়ই বলবে।
এক প্রবীণ সাংবাদিকের ভাষায়, “তেজ প্রতাপ যাদব তাঁর বাবার ক্যারিশমা নিয়ে জন্মেছেন, কিন্তু তাঁর রাজনীতির পথ অনেকটাই একলা। তিনি এখন নিজের জায়গা তৈরি করতে চাইছেন, যেখানে রাজনীতি হবে মূল্যবোধ আর যুব সমাজের স্বপ্নের ভিত্তিতে।” অন্যদিকে, তেজ প্রতাপ যাদবের “মরেও ফিরব না” মন্তব্য শুধু একটা রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, তা বিহারের ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যেখানে ব্যক্তিগত মতাদর্শ, পারিবারিক সংঘাত এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে মিশেছে।
ছবি: সংগৃহীত




