সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতীয় নারী ক্রিকেটে এক নতুন ইতিহাস লিখলেন প্রতিকা রাওয়াল (Pratika Rawal)। বয়সের দিক থেকে একটু দেরিতেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করলেও, সুযোগ পেয়েই নিজের মেধা ও পরিশ্রমে প্রমাণ করে দিচ্ছেন তিনি যে তিনি ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ভরযোগ্য ওপেনার। বৃহস্পতিবার নিউ জিল্যান্ড (New Zealand) -এর বিরুদ্ধে তাঁর ১৩৪ বলে ১২২ রানের দুরন্ত ইনিংস ভারতের নারী ক্রিকেট ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করেছে। সেই ইনিংসেই ভারত পৌঁছে গেল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। ম্যাচের পর প্রতিকা জানালেন তাঁর সাফল্যের রহস্য, আর মেয়ের সাফল্যে গর্বে উজ্জ্বল বাবা প্রদীপ রাওয়াল বললেন, “এটাই কেবল শুরু, আরও শতরান চাই আমার মেয়ের কাছ থেকে।” এই শতরান যেন কেবল প্রতিকার একার জয় নয়, পরিবারের স্বপ্নপূরণও। ছোটবেলা থেকে প্রতিকার হাতে ব্যাট তুলে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা প্রদীপ। তাঁর স্বপ্ন ছিল, একদিন নিজের মেয়েকে ভারতের জার্সি গায়ে মাঠে দেখার। সেই স্বপ্ন সত্যি হয়ে গিয়েছে।
বৃহস্পতিবার হ্যামিলটনে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ভারতের ওপেনার প্রতিকা রাওয়াল ও স্মৃতি মন্ধানা (Smriti Mandhana) জুটিতে গড়েন ২১২ রানের অবিশ্বাস্য পার্টনারশিপ। এই জুটি ভরসায় ভারত গড়ে বিশাল রান। পরে জেমাইমা রদ্রিগেস (Jemimah Rodrigues) -এর সঙ্গে ৭৬ রানের দারুণ জুটি গড়ে প্রতিকা নিজের প্রথম বিশ্বকাপ শতরান সম্পূর্ণ করেন। ম্যাচে তাঁর প্রতিটি শটেই ছিল আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য ও পরিকল্পনার ছাপ। ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি বিবেচনা করে খেলার ক্ষমতাই তাঁকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে বলে জানালেন তিনি নিজেই। প্রতিকা বলেন, “নিজের উপর বিশ্বাস রাখো, এই কথাটা আমাদের দলে অনেক দিন ধরে চলছে। আমরা প্রতিদিন নিজেদের আরও ভালো করে তৈরি করছি। আমরা জানি, যে কোনও ম্যাচে জেতার ক্ষমতা আমাদের আছে। আজ সব কিছু একসঙ্গে কাজ করেছে। এই জয় শুধুমাত্র আমার নয়, পুরো দলের।” তিনি আরও বলেন, “এই শতরানের জন্য আমি প্রচুর পরিশ্রম করেছি। অসংখ্য দিন প্র্যাকটিস করেছি, কোচদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেছি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সব কিছু সহজ। কিন্তু ক্রিজে নামলে বোঝা যায় কতটা কঠিন প্রতিটি বল খেলা। তবুও এই চ্যালেঞ্জই আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়। আমি খুশি যে আমার পরিশ্রম মাঠে ফল দিয়েছে।”

মাত্র তিন বছর বয়সে প্রতিকার হাতে ব্যাট তুলে দেন তাঁর বাবা প্রদীপ। প্রথম দিকে প্রতিকা বাস্কেটবলও খেলেছিলেন। কিছুটা সময় অ্যাথলেটিকসেও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটই হয়ে ওঠে জীবনের ধ্যানজ্ঞান। বাবা প্রদীপ নিজেও একসময় বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ক্রিকেট খেলতেন এবং পরে আম্পায়ারিং কোর্স পাশ করেন। মেয়েকে ক্রিকেটে আগ্রহী করে তোলার পিছনে তাঁর অবদান অপরিসীম। প্রদীপ রাওয়াল বললেন, “আমি অনেক দিন ধরে এই দিনের অপেক্ষা করছিলাম। প্রতিকার জন্মের সময়ই ঠিক করেছিলাম, ওকে ক্রিকেটার বানাব। আমি নিজে আম্পায়ারিং করতাম, ও- তখন ছোট্ট। ম্যাচে নিয়ে যেতাম। ক্রিকেট মাঠের গন্ধ, আবহ, উত্তেজনা, সব কিছু ওর মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “আমি ছোটবেলায় পরিবার থেকে সমর্থন পাইনি। তাই সব সময় চেয়েছি, মেয়ের পাশে যেন আমি থাকি। ওর প্রতিটি সাফল্য আমার গর্বের। তবে এখনই থেমে যাওয়া নয়, আরও শতরান চাই আমি প্রতিকার কাছ থেকে। অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারবে একমাত্র ভারতই, আমি বিশ্বাস করি।”
মেয়ের শতরান দেখার জন্য প্রদীপ বিশেষ ব্যানার নিয়ে মাঠে হাজির ছিলেন। প্রতিকার শতরান করার সঙ্গে সঙ্গেই সেই ব্যানার টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে : ‘Proud of you, my girl!’ লেখা সেই ব্যানার যেন প্রতিটি বাবার গর্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। ভারতের অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur) প্রতিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন, “এই জয় দলের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। কিন্তু শুরুটা যে ভাবে প্রতিকা আর স্মৃতি করল, সেটা সত্যিই অসাধারণ। তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় শুরু থেকেই। ২০০ রানের ওপেনিং জুটি যেভাবে গড়েছে, তাতে দলের ভিত মজবুত হয়ে গিয়েছিল। তাদের শান্ত মস্তিষ্ক এবং পরিকল্পিত খেলা এই জয় এনে দিয়েছে।” দলের কোচ ম্যাচের পর বলেন, “প্রতিকা এখনও ক্রিকেটের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু মানসিক দৃঢ়তা ও শৃঙ্খলার দিক থেকে সে অনেক সিনিয়র ক্রিকেটারকেও টপকে গেছে। ও-নিজের ইনিংসটা গড়ে তুলেছিল এমনভাবে, যেন একটা গল্প বলছে। বলের মুভমেন্ট বুঝে যেভাবে খেলে গিয়েছে, সেটা নিখুঁত। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, তাহলে ভারতীয় নারী ক্রিকেট আরও এক বড় তারকা পেতে চলেছে।”

প্রতিকা এখন ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদের নতুন প্রেরণা। তাঁর সাফল্যের গল্প শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত অনুপ্রেরণার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। ছোট শহরের মেয়ে হয়েও প্রতিকা দেখিয়ে দিয়েছেন, প্রতিভা থাকলে সুযোগ আসবেই, শুধু দরকার পরিশ্রম ও বিশ্বাসের। ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিকার খেলার ধরন অনেকটা ইংল্যান্ডের প্রাক্তন তারকা শার্লট এডওয়ার্ডস (Charlotte Edwards) -এর মতো। টেকনিক্যালি নিখুঁত, স্ট্রোক প্লে-এ ভরপুর এবং পরিস্থিতি বুঝে নিজের ইনিংস তৈরি করার অদ্ভুত দক্ষতা রয়েছে তাঁর মধ্যে। আগামী দিনে ভারতের নারী ক্রিকেটের ওপেনিং জুটিতে স্মৃতি-প্রতিকা জুটি আরও অনেক রেকর্ড গড়বে বলেই আশা বিশেষজ্ঞদের। অন্যদিকে, এই শতরান শুধু প্রতিকার কেরিয়ারের নয়, ভারতের নারী ক্রিকেটেরও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ভারতীয় দলের ড্রেসিং রুমে উচ্ছ্বাস, আত্মবিশ্বাস আর আশার বাতাস বইছে। সামনেই সেমিফাইনাল, যেখানে প্রতিকার থেকে আরও একবার বড় ইনিংসের প্রত্যাশা করছে গোটা দেশ। প্রতিকা নিজেও বলেন, “প্রথম শতরানটা সব সময় বিশেষ। কিন্তু এখন সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বকাপ জেতাই আমাদের লক্ষ্য। আমার ব্যাট থেকে যত বেশি রান বেরোবে, ততই দলের জন্য ভালো।” তিনি আরও হাসতে হাসতে বলেন, “বাবা তো এখন বলছেন, আরও তিনটে শতরান চাই! তাই এখন থেকে চাপ বেড়ে গেল (হাসি)। তবে বাবা সব সময় পাশে ছিলেন, তাই আমার সাহসও বেড়েছে।”
ভারতীয় নারী ক্রিকেটে এখন নতুন সূর্যোদয়ের সময়। প্রতিকার ব্যাটে যে সুর বাজছে, তা দেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর কানে বাজছে গর্বের সুরে। হয়ত, একদিন তাঁর নামও উঠে আসবে ভারতের সেরা ক্রিকেটারদের তালিকায়, ঠিক যেমন মিতালি রাজ (Mithali Raj) বা ঝুলন গোস্বামী (Jhulan Goswami) -এর নাম জ্বলজ্বল করছে। এ মুহূর্তে প্রতিকা রাওয়াল কেবল একজন ক্রিকেটার নন, তিনি প্রতিটি মেয়ের আদর্শ, যাদের স্বপ্ন আছে, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার সাহসও আছে।
ছবি : সংগৃহীত




