বসুধা চৌধুরী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিশ্বজুড়ে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় মেরুদণ্ডের যত্ন প্রায়ই উপেক্ষিত হয়ে পড়ে। প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মেরুদণ্ড দিবস (World Spine Day), একটি দিন যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পিঠ ও মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্য রক্ষা শুধু ব্যথা এড়ানোর বিষয় নয়, সার্বিক সুস্থতার চাবিকাঠি। এ বছরের শ্লোগান, “Invest in Your Spine”, অর্থাৎ “আপনার মেরুদণ্ডে বিনিয়োগ করুন”। মানুষকে তাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট অভ্যাসগুলির প্রতি সচেতন হতে আহ্বান জানায়, যেগুলি নিঃশব্দে মেরুদণ্ডের ক্ষতি করে।

ভারতসহ বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের কোনও না কোনও সময় পিঠের ব্যথায় ভোগেন বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা। ডাঃ অরবিন্দ মেনন, একজন খ্যাতনামা নিউরোসার্জন, তিনি জানানা, “মেরুদণ্ড হল শরীরের কাঠামোর ভিত্তি। আমরা যদি প্রতিদিনের অঙ্গভঙ্গি, বসা-দাঁড়ানো ও ঘুমের অভ্যাসে সচেতন না হই, তাহলে অজান্তেই আমরা এর ক্ষতি করি।” বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় পিঠের সমস্যা হঠাৎ করে আসে না, তা বছর বছর ধরে তৈরি হয় খারাপ অভ্যাসের ফলাফল হিসেবে। নিচে নিউরোসার্জনরা উল্লেখ করেছেন এমন ছয়টি সাধারণ দৈনন্দিন অভ্যাস, যা নীরবে আপনার মেরুদণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে-
১. দীর্ঘ সময় খারাপ ভঙ্গিতে বসে থাকা। অফিসে বা বাসায় ল্যাপটপে কাজ করার সময় অনেকেই ঘাড় ও পিঠ বাঁকিয়ে বসেন। এই অভ্যাসটি মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ ফেলে এবং কোমর ও ঘাড়ের পেশিতে টান তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর উঠে হাঁটুন এবং চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন। ২. ভুলভাবে মোবাইল ব্যবহার। সারাক্ষণ নিচু করে ফোন দেখা বা ‘টেক্সট নেক’ (Text Neck) সিন্ড্রোম বর্তমানে এক ভয়াবহ প্রবণতা। এটি ঘাড়ের মেরুদণ্ডে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে। নিউরোসার্জন ডাঃ রমেশ চন্দ্রন বলেছেন, “প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা মাথা নিচু করে মোবাইল দেখা মানে প্রতিবারই ঘাড়ে ২০ কেজি ওজনের চাপ দেওয়া।”
আরও পড়ুন : pornography addiction brain effects | পর্ন আসক্তি: মস্তিষ্কের অদৃশ্য বিধ্বংসী প্রকোপ
৩. অতিরিক্ত ওজন বা ভুলভাবে ভার বহন। অনেকেই এক কাঁধে ভারী ব্যাগ ঝুলিয়ে চলেন বা হঠাৎ করে ওজন তোলেন, যা মেরুদণ্ডের ডিস্কে (spinal disc) চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ভার তুলতে গেলে হাঁটু ভাঁজ করুন, পিঠ নয়। ৪. ব্যায়ামের অভাব। নিয়মিত হাঁটা, যোগব্যায়াম বা স্ট্রেচিং না করলে মেরুদণ্ডের আশেপাশের পেশি দুর্বল হয়ে যায়। ফলে, পিঠ সামান্য চাপেই ব্যথা শুরু করে। ডাঃ সোনালী নায়ার বলেন, “দিনে ২০ মিনিটের সহজ যোগব্যায়াম পিঠের স্বাস্থ্যের জন্য আশ্চর্যজনক কাজ করে।”
৫. খারাপ ঘুমের ভঙ্গি। অত্যধিক নরম বা পুরনো ম্যাট্রেসে ঘুমানো মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁক নষ্ট করে। ঘুমানোর সময় সঠিক বালিশ ও ম্যাট্রেস ব্যবহার করা উচিত যাতে পিঠ সোজা থাকে। ৬. অবিরাম মানসিক চাপ (Stress)। মানসিক চাপের প্রভাব শুধু মনেই নয়, শরীরেও পড়ে। উদ্বেগ ও টেনশনের সময় ঘাড় ও কাঁধের পেশি শক্ত হয়ে যায়, যা পিঠের ব্যথাকে বাড়িয়ে তোলে। তাই মানসিক প্রশান্তির জন্য মেডিটেশন বা গভীর শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন খুবই কার্যকর।

ভুলভাবে জিনিসপত্র তোলা
হাঁটুর পরিবর্তে কোমরে বাঁকানোর ফলে পিঠের নিচের অংশে চাপ পড়ে এবং হঠাৎ আঘাত লাগতে পারে।
নরম বা ঝুলে পড়া গদিতে ঘুমানো : নরম গদি মেরুদণ্ডের সারিবদ্ধতা নষ্ট করে, যার ফলে সকালের শক্ততা এবং অস্বস্তি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনযাত্রার এই ছোট ছোট পরিবর্তন, যেমন প্রতিদিন সোজা হয়ে বসা, পর্যাপ্ত জল পান করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিটের শারীরিক নড়াচড়া, দীর্ঘমেয়াদে মেরুদণ্ডকে রক্ষা করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, পিঠের ব্যথা এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান অক্ষমতার কারণ। তাই ২০২৫ সালের বিশ্ব মেরুদণ্ড দিবসে বিশেষজ্ঞরা আহ্বান জানাচ্ছেন, প্রযুক্তির যুগে ব্যস্ত জীবনযাত্রায়ও নিজের শরীরের মূল কাঠামোর যত্ন নিতে ভুলবেন না।ডাঃ মেননের ভাষায়, “আজ যদি আমরা মেরুদণ্ডে বিনিয়োগ করি, আগামীকাল আমাদের শরীর সেই বিনিয়োগের সুফল দেবে।”
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত



